যখন মোক্ষদা-দিদিমাকে জেরা করছিলেন বরদাচরণ, তখনই হঠাৎ চাক্কু এসে চুপিচুপি কানে কানে খবর দিয়ে গেল, “মামা, মোক্ষদা দিদিমার ভঁড়ার ঘরে এক বস্তা নারকোলের ছোবড়া। আর ছ’টা খোসা-ছাড়ানো নারকোল।”
মাথাটা ঘুরে গেল বরদাচরণের। কেসগুলো খুবই জড়িয়ে যাচ্ছে, অসম্ভব জটিল হয়ে উঠছে। মোক্ষদা-দিদিমার বাড়িতে নারকোল গাছ নেই, তবে ছোবড়া বা নারকোল আসে কোত্থেকে? ওদিকে রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির চুরি-যাওয়া নারকোল অম্বুজাক্ষবাবুর বাড়িতেও পাওয়া যায়নি। নারকোলের সংখ্যাটাও আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যাচ্ছে।
ভাবতে ভাবতে বরদাচরণ উঠে পড়েন। পকেট থেকে পিস্তলটা বের করে দেখে নেন ছ’টা চেম্বারেই গুলি ভর্তি আছে কিনা। আছে।
রাস্তায় পা দিতেই একটা গাড়ি সামনে ঘাস করে থামল। গাড়ির ভিতরে এক সম্ভ্রান্ত ভদ্রলোক। তিনি হাতজোড় করে বললেন, “আসুন, বিখ্যাত গোয়েন্দাকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে ধন্য হই।”
বরদাচরণ উঠলেন। চাক্কু আর ডঙ্কিও উঠল সামনের সীটে। অচেনা ভদ্রলোক গলা নিচু করে বরদাচরণকে বললেন, একটা খুবই রহস্যময় কাণ্ড ঘটে গেছে। কাল আমার একটা বুড়ো কাকাতুয়া মারা গেছে। খুবই প্রিয় পাখি ছিল আমার। ঠিক করেছিলাম পাখিটার মৃতদেহ একটা ভাল জায়গায় কবর দিয়ে ওপরে একটা চমৎকার সমাধি তৈরি করে দেব। কিন্তু বিপদ হল, কাকাতুয়াটার মরদেহ একটা নাইলনের ব্যাগে ভরে বাইরের বারান্দায় রেখে গতকাল আমি ড্রাইভারকে গাড়ি বের করার কথা বলতে গিয়ে ফিরে এসে দেখি, ব্যাগটা নেই। কী সাংঘাতিক কাণ্ড বলুন! কেটা যদি আপনি নেন!”
বরদাচরণ সবই টুকে নেন ডায়েরিতে। গম্ভীরভাবে বলেন, “হু, কাকাতুয়ার কেস দুটো হল তা হলে! আশ্চর্য!”
বলে দুশ্চিন্তিত বরদাচরণ বাড়ির সামনে নেমে গেলেন।
দুপুরে খুবই অন্যমনস্কভাবে খেতে বসেছেন বরদাচরণ। কী খাচ্ছেন তা বুঝতেই পারছেন না। লাউ, কাকাতুয়া, নারকোল, সব জট পাকিয়ে আছে মাথায়। তার মা বললেন, “ও বরদা, লাউঘণ্ট দিয়ে আর দুটো ভাত মাখ।”
লাউঘণ্ট কথাটা বরদাচরণের মাথার মধ্যে দু-একবার টংটং শব্দ করল। প্রায়ই তিনি লাউঘণ্ট খান, কাজেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।
হঠাৎ বরদাচরণ চমকে উঠে বললেন, ‘লাউঘণ্ট! লাউ এল কোথা থেকে? আমি তো আজ বাজার থেকে লাউ আনিনি!”
মা বলেন, “তুই আনবি কেন? কাল চাক্কু লাউটা হাতে করে এনেছে, ওর কোন্ বন্ধুর বাড়িতে নাকি অনেক লাউ হয়েছে, তারা দিল।”
নিজের পাতের দিকে ভাল করে চেয়ে দেখলেন বরদাচরণ। লাউঘণ্টের পাশে দুটো বড়া পড়ে আছে। উঠে গিয়ে আতসকাঁচ নিয়ে এসে বড়াটা নিবিষ্টভাবে দেখছেন, মা বললেন “দেখছিস কী! ও তো নারকোলের বড়া। ছটা নারকোল এনেছিল চাক্কু, কোন্ গাছ থেকে নাকি পড়ে গিয়েছিল বাতাসে। তার দুটো ভেঙে ঐ বড়া করেছি।”
বরদাচরণ বাকি সময়টা ভাত নিয়ে নাড়াচাড়া করে উঠে পড়লেন। চাক্কু অনেক আগেই খেয়ে-দেয়ে কোন্ মাস্টারমশাইয়ের বাড়িতে পড়া বুঝতে গেছে।
বরদাচরণ পিস্তল আর আতসকাঁচ নিয়ে ডঙ্কির শেকল ধরে ঘর থেকে বেরোলেন। তন্নতন্ন করে খুঁজতে লাগলেন চারদিক। অবশেষে ডঙ্কি ইংগিত বুঝতে পেরে তাঁকে গোয়ালঘরে টেনে আনল। সেখানে একটা সদ্য–কেনা দাঁড়ে জলজ্যান্ত একটা কাকাতুয়া বসে আছে। বরদাচরণকে দেখেই বলে উঠল “হরি বল, হরি বল ভাই, হরি ছাড়া গতি নাই।”
বরদাচরণ টেপ-রেকডার নিয়ে এসে পাখিটার কথা টেপ করতে লাগলেন।
তারপর সারা দুপুর আর সন্ধে, আর্কিমিডিস যেমন স্নানের চৌবাচ্চায় ডুব দিয়ে স্পেসিফিক গ্র্যাভিটির চিন্তা করেছিলেন, তেমনি এক চিন্তার চৌবাচ্চায় ডুবে থেকে বরদাচরণও লাউ, কাকাতুয়া আর নারকোলের রহস্যে মগ্ন রইলেন। তারপর আর্কিমিডিস যেমন ইউরেকা’ বলে লাফিয়ে উঠেছিলেন, ঠিক তেমনি তিনিও লাফিয়ে উঠলেন। সমস্ত রহস্যটাই তাঁর কাছে জল হয়ে গেছে।
বস্তুত তিনি এখন বুঝতে পেরেছেন, যে-লোকটা মোক্ষদা দিদিমার লাউ চুরি করেছে, সেই একই লোক গতকাল গাড়িওলা ভদ্রলোকের মৃত কাকাতুয়াটা হাতসাফাই করে অম্বুজাক্ষবাবুর জ্যান্ত কাকাতুয়ার দাঁড়ে ঝুলিয়ে রেখে হরিনামপরায়ণ জ্যান্ত কাকাতুয়াটাকে সরিয়ে ফেলে। আবার সেই লোকটাই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে রামভক্ত রামচন্দ্রবাবুর নারকোল গাছের ছটা নারকোলও গোপনে নামিয়ে নেয়। এবং ঐ একই অপরাধী প্রমাণ লোপের চেষ্টায় এবং তদন্তকে বিভ্রান্ত করার জন্য বরদাচরণকে রামচন্দ্রবাবুর বাড়ির পিছনে লাউয়ের খোসার সন্ধান দেয়, এবং মোক্ষদাদিদিমার বাড়িতে নারকোল-ছোবড়ার অস্তিত্বের কথা ফাঁস করে দেয়।
বেশ রাত হয়ে গেছে। সবাই গভীর ঘুমে। বরদাচরণ পিস্তল হাতে নিয়ে চুপিসাড়ে পাশের ঘরে এসে অন্ধকারে চেয়ে রইলেন। আবছা দেখা যাচ্ছে, দিদিমার বুক ঘেঁষে শুয়ে চাক্কু ঘুমোচ্ছে।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন গোয়েন্দা বরদাচরণ। না, এক্ষুনি তিনি কিছু করবেন না। অপরাধীকে তিনি সবসময়ে আরও সুযোগ দেন। তাতে অপরাধীকে যে সন্দেহ করা হচ্ছে, তা সে বুঝতে পারে না। এবং এইভাবেই সে একদিন নিজের অপরাধের জালে ধরা পড়ে যায়।
পিস্তল নামিয়ে গোয়েন্দা বরদাচরণ ফিরে এলেন নিজের ঘরে। তিনি এখন নিশ্চিন্তভাবে জেনে গেছেন, কে অপরাধী। অপরাধী আর কেউ নয়, অপরাধী হল…?
গ্রহান্তরে
জীবনের ওপর ঘেন্না ধরে গেছে বরুণবাবুর। সকাল থেকে গভীর রাত্রি অবধি খেটেখুটে যা আয় হয় তাতেও সংসারটা ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে।
