গয়াপতি বহুদিন বাদে এই প্রথম একটু হাসলেন। বললেন, “আপনি কি ঘনাদার কেউ হন?”
গোয়েন্দা বরদাচরণ ঘনাদার গল্প পড়েননি। আসলে গোয়েন্দাগিরি করে পড়াশুনোর সময়ও পান না। তবু ভাবলেন, ঘনাদা বোধহয় একজন কেওকেটা হবে। তাই পিছপা না হয়ে বললেন, “দূর সম্পর্কের মাসতুতো ভাই।”
যাই হোক, এরপর গয়াপতি আর বরদাচরণের মধ্যে খুব বন্ধুত্ব হয়ে গেল। দুজনে গোপনে নানারকম পরামর্শ আঁটতে লাগলেন।
কিছুদিনের মধ্যে খবর রটে গেল যে, দারোগা গয়াপতি নিখোঁজ হয়েছেন। ওদিকে চাটুজ্যে-বাড়ির সোনার হংসেশ্বরী মূর্তি পাহারা দেওয়ার জন্য শহর থেকে যে গোয়েন্দাকে আনানো হয়েছিল, সেও বেপাত্তা। ফলে চারদিকে খুব হৈ-চৈ পড়ে গেল। সবাই বুঝল, এ হচ্ছে ঝালুরামের কাজ। স্বয়ং ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পর্যন্ত ভাবনায় পড়ে গেলেন।
ওদিকে ভাবনায় পড়েছে স্বয়ং ঝালুরামও। এতকাল এ এলাকায় সে-ই ছিল এক ডাকাত-সম্রাট। কিন্তু দিন সাতেক হল সে এমন তিন চারটে ডাকাতির খবর পেয়েছে, যেগুলো তার দলের কাজ নয়। ঝালুরামের এলাকায় তার অনুমতি না নিয়ে ডাকাতি করবে, এত সাহস কার! ঝালুরামের খাওয়া কমে গেছে, ঘুম ছুটে গেছে। চারদিকে তার চোরেরা নতুন ডাকাতদের খোঁজ নিচ্ছে।
মনসাপোতার গভীর জঙ্গলের ভিতর এক ভাঙা মন্দিরে ঝালুরামের আস্তানায় এক রাত্রে দুজন লোককে ধরে আনা হল। একজন মোটাসোটা, থলথলে। অন্যজন বেশ লম্বা-চওড়া। ঝালুরাম মশালের আলোয় চোখ দিয়ে দুজনকে ভাল করে মেপে দেখল। তারপর হুংকার দিয়ে বলে উঠল, “তোরাই ডাকাত?”
ঝালুরাম দেখতে রোগা। ল্যকপ্যাক সিং। মাথায় তেমন উঁচুও নয়। কিন্তু তার হুংকার শুনলে মালুম হয়, যন্ত্রটা ছোট হলেও বিপজ্জনক।
লোক দুটো কেঁপে কেঁপে বলল, “আজ্ঞে।”
ঝালুরাম অট্টহাসি হেসে ওঠে। লম্বা লোকটা ভয়েভয়ে বলে, “হুজুর, আমাদের কেউ দলে নেয়নি বলে দুজনে মিলে ছোটোখাটো কাজ করি। কিন্তু আপনার মতো মহান ডাকাত যদি আমাদের দলে ভর্তি করে নেন, তবে আমরা আলাদা কাজ কারবার ছেড়ে দেব।”
ঝালুরাম অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে বলে, “আমার দলে ডাকাতি করবি? দেখি তোদের এলাম! দুজনে পঞ্চাশটা করে ডিগবাজি খা।”
ডিগবাজি খেতে খেতে লোকদুটো হেদিয়ে জিভ বার করে হ্যাঁ-হ্যাঁ করে হাঁফাতে লাগল। ঝালুরাম হেসে লুটোপুটি, সেই সঙ্গে তার পঞ্চাশজন স্যাঙাতও।
এরপর ঝালুরাম হুকুম দেয়, “রণপায়ে চড়ে পাঁচ ক্রোশ পথ হেঁটে আয়…দু মাইল দৌড় দে…স্রোতের নদী সাঁতরে পার হ…সুপুরি গাছ বেয়ে ওঠ…বিশ হাত ওপর থেকে নীচে লাফিয়ে পড়…লাঠি তরোয়াল আর রাম-দা চালিয়ে দেখা…বন্দুকের নিশানা দেখা…অমাবস্যার রাতে একলা শ্মশানে মড়ার খুলি কোলে নিয়ে বসে থাক্..”
আর এই সব হুকুম তামিল করতে করতে লোক দুটোর জান কয়লা। প্রাণপাখি খাঁচা-ছাড়া হওয়ার উপক্রম। আড়ালে মোটা লোকটা রাগে দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে, ‘ইচ্ছে করে, দৌড়ে গিয়ে বেটার টুটি ধরি।” লম্বা লোকটা তখন তার হাত চেপে ধরে চুপি-চুপি বলে, “না গয়াবাবু, এখন নয়। সব প্ল্যান ভেস্তে যাবে। অপেক্ষা করুন।”
সব কিছুরই শেষ আছে। লোকদুটোর ট্রেনিংও একদিন শেষ হল। ঝালুরাম তাদের ডেকে বললে, “তোদের দিয়ে কোনরকমে কাজ চলতে পারে। আজ আমরা চাটুজ্যে-বাড়ির হংসেশ্বরীর সোনার মূর্তি লুট করতে যাচ্ছি। তোরাও থাকবি দলে। আজ তোদের পরীক্ষা।”
শুনে ছদ্মবেশী গয়াবাবু আবার দাঁত কিড়মিড় করতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু বরদাচরণ ঠিক সময়ে কনুইয়ের গুতো দিয়ে তাকে সতর্ক করে দিলেন।
নিশুত রাতে ঝালুরামের দল চাটুজ্যে-বাড়ি ঘিরে ফেলল। ‘রে রে’ করে চেঁচাচ্ছে ডাকাতরা। আর সে চেঁচানি এমন সাঙ্ঘাতিক যে, মাটি সুষ্ঠু কাঁপতে থাকে। চাটুজ্যে-বাড়ির ভিতরে ছেলে-বুড়ো-মেয়েরা মড়াকান্না জুড়ে দিয়েছে। ঝালুরাম নাক সিঁটকে বলল, “এ বড় ছোট ডাকাতি। ছোটলোকদের কাজ। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করা। নতুন দুটোকে ডাক তো।”
নতুন দুজন এগিয়ে এলে ঝালুরাম বলল, “আজ আর আমরা হাত লাগাচ্ছি না। আমার দলবল বাড়ি ঘিরে রইল। আমি ওদিকের বটগাছতলায় মাদুর পেতে ঘুমোতে যাচ্ছি। তোরা দুজনে বাড়িতে ঢুকে সব চেঁছে-পুঁছে নিয়ে আয় গে যা। মনে রাখিস, হংসেশ্বরীর মূর্তিটা আনতে যেন ভুল না হয়। আধঘণ্টার বেশি সময় দেব না কিন্তু। চটপট যা।”
হুকুম পেয়ে দুজনে গিয়ে পাঁচিল টপকে ভিতরে ঢুকল। ঢুকেই গয়াপতি বললেন, “বরদাবাবু! এখন উপায়?”
বরদাচরণ ভ্রূ কুঁচকে ভাবিত মুখে বললেন, “হুকুম-মতো কাজ করে যান। অন্য উপায় তো দেখছি না।”
“কিন্তু আমি যে কখনো সত্যিকারের ডাকাতি করিনি! বাধোবাধো ঠেকছে যে!”
বরদাচরণ দাঁত খিঁচিয়ে বললেন, “আর আমিই বুঝি করেছি!”
গয়াপতি বিরসমুখে বলেন, “তা সত্যি কথা বলতে কী, ডাকাতির ট্রেনিং নেওয়ার সময় আপনার ভাবগতিক দেখে মনে হচ্ছিল এ-ব্যাপারে আপনার কিছু পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে। আমার চেয়ে সব বিষয়েই আপনি বেশি কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। তার ওপর এখন আবার ডাকাতিতেও বেশ আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।”
বরদাচরণ শ্লেষের হাসি হেসে বলেন, “গয়াবাবু ডাকাতরা তো রাতে ডাকাতি করে, কিন্তু এখানকার লোক জানে যে, আপনি এখানে দিনে ডাকাতি করতেন। রোজ মাছ দুধ পাঠা মুর্গি ভেট নিতেন, প্রতি মাসে নগদ টাকায় নিয়মিত ঘুষ খেয়েছেন। কাজেই এই ছোটখাটো একটা ডাকাতিতে আপনার লজ্জার কারণ দেখছি না।”
