গয়াপতি প্রচণ্ড রেগে গিয়ে বলেন, “একটা প্রাইভেট গুলবাজ টিকটিকির এত বড় আস্পদ্দা! কালই তোমাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে এই এলাকা থেকে বের করে দেব।”
বরদাচরণ সমান তেজে বলেন, “বেশি চালাকি করো না হে গয়াপতি, বাইরে ঝালুরাম মোতায়েন আছে। যদি বলে দিই যে, তুমি আসলে অপদার্থ দারোগা গয়াপতি, তবে সে হেঁসো দিয়ে তোমার পেট ফাসাবে।”
ঝালুরামের উল্লেখে গয়াপতি কিছু মিইয়ে গেলেন। সত্যি বটে, ঝালুরামের দল এখন ঘিরে আছে চারদিক। গড়বড় করলে বিপদ হতে পারে।
গয়াপতি শ্বাস ছেড়ে বলেন, “ঝালুরামকে আমিও বলে দেব যে তুমি প্রাইভেট গোয়েন্দা বরদাচরণ। তোমারও গর্দান যাবে।”
এইভাবে দুজনের মধ্যে একটা ঝগড়া পাকিয়ে উঠল। হঠাৎ চাটুজ্যে বাড়ির বড় ঘড়িতে একটা বাজার টং শব্দ হতেই দুজনে সচেতন হলেন। সময় বেশি নেই। ঝালুরাম মোটে আধঘণ্টা সময় দিয়েছে।
বরদাচরণ বললেন, “ঝগড়াটা এখন মুলতুবি থাক গয়াবাবু। হাতে কাজ রয়েছে, বাইরে ঝালুরাম।”
গয়াপতিও মাথা নেড়ে বলেন, “থাকল। কিন্তু আপনাকে এই বলে রাখলাম, এসব ঝামেলা মিটে গেলে একদিন আপনার সঙ্গে আমার কুস্তি হবে। দেখব তখন কার কত ক্ষমতা!”
“আমিও দেখব। আমি জুডোর ব্ল্যাক বেল্ট।”
“বেল্ট আমারও আছে।” বরদাচরণ হেসে বলেন, “সে বেল্ট তো ঝোলা ভুঁড়ি বাঁধার জন্যে। জুডোর ব্ল্যাক বেল্ট তা নয়। অনেক প্যাঁচ পয়জার শেখার পর ব্ল্যাক ব্লেট দেওয়া হয়। ওটা একটা মস্ত সম্মান।”
“রাখো রাখো। সম্মান দেখিও না। এলাকায় আমি রাস্তায় বেরোলে লোকে পথ ছেড়ে দেয় জানো?”
“জানি। পাছে তোমার ছায়া মাড়াতে হয় সেই ঘেন্নায় লোকে পথ ছেড়ে দাঁড়ায়।” বরদাচরণ বলেন।
ঝগড়াটা ফের পাকিয়ে উঠেছিল, কিন্তু বাইরে ঝালুরামের একটা হুংকার শোনা গেল এই সময়ে, ‘কই রে! হল তোদের?”
কেঁপে উঠে দুজনে দুজনকে জড়িয়ে ধরল।
গয়াপতি বলেন, “বরদাবাবু! আর দেরি নয়।”
বরদাবাবুও বলেন, “না। আর দেরি করা মোটেই ঠিক নয়।” কঁপতে কাঁপতে গয়াপতি চলেন, তার দু-পা আগে বরদাচরণ। বরদাচরণ কঁপছেন
বটে, কিন্তু একটু ঘামছেন। বাগান পার হয়ে সদর দরজায় পৌঁছে দুজনে মুশকিলে পড়লেন। সদর দরজা বন্ধ। কী করে বন্ধ দরজা বাইরে থেকে খুলতে হয় তা ঝালুরাম তাদের শিখিয়ে দেয়নি।
“এখন উপায়?” গয়াপতি বলেন।
“তাই তো!” বরদাচরণও ভাবিত হলেন। তারপর একটু হেসে বললেন, “আরে দূর! খুব সোজা ব্যাপার। আমি তো গোয়েন্দা বরদাচরণ। চাটুজ্যে বাড়ির সবাই আমাকে জানে।”
“আমাকেও।” গয়াপতি হার মানেন না।
“তাহলে আর মুশকিল কিসের? পরিচয় দিলেই দরজা খুলে দেবে।”
তাই হল। ধুতির খুঁটে মুখের কালি মুছে, ছদ্মবেশের পরচুলা, নকল গোঁফ, লম্বা জুলপি খুলে ফেললেন দুজনে। গয়াপতি একটা নকল আঁচিল গালে লাগিয়েছিলেন, সেটা খুঁটে তুলে ফেললেন। বরদাচরণ খানিকটা প্লাস্টার দিয়ে নিজের নাকটাকে বড় বানিয়েছিলেন, প্লাস্টারটুকু তিনিও টান মেরে খুলে ফেললেন। তারপর দুজনে দরজায় ধাক্কা দিয়ে ডাকাডাকি করে নিজেদের পরিচয় দিতে লাগলেন। তাঁদের গলার স্বর কারো অচেনা নয়। খানিক বাদে নরনাথ চাটুজ্যে দরজা খুলে দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বললেন, “যাক, আপনারা এসে গেছেন তাহলে?”
গয়াপতি সঙ্গে-সঙ্গে চাটুজ্যের বুকে বল্লম ধরেন। আর বরদাচরণ চাটুজ্যেকে বেঁধে ফেলেন চটপট। চাটুজ্যে শুধু করুণ চোখে চেয়ে বললেন, “কাউকে বিশ্বাস করতে নেই। আমার ঠাকুর্দা কথাটা বলতেন।”
এরপর লুটতরাজ খুবই সহজ হয়ে গেল। বাধা দেওয়ার কেউই ছিল না। যে যার প্রাণভয়ে ব্যস্ত। আধণ্টার মাথায় বমাল সমেত গয়াপতি আর বরদাচরণ হাসতে হাসতে বেরিয়ে এলেন। বেরোবার আগে দুজনেই অবশ্য তাদের ছদ্মবেশ পরে নিয়েছেন।
বরদাচরণের হাতে সোনার মূর্তিটা দেখে ঝালুরাম তার পিঠ চাপড়ে বলে, “সাবাস!”
গয়াপতি একটু তেতো গলায় বলেন, “হুঁঃ! ও ওটা আনতে পারত নাকি? মূর্তিটা শানের ভিতে গাঁথা ছিল। আমি টেনে হিঁচড়ে না নড়ালে ওর একার সাধ্য ছিল না।”
ঝালুরাম গয়াপতিরও পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলল, “তোরও এলেম কম নয়। কতগুলো সোনার গয়না এনেছিস?”
শুনে বরদাচরণ বললেন, “গয়না খুঁজে বের করার মতো বুদ্ধি যদি ওর পেটে থাকত! ডাকাত পড়ার খবর পেয়েই মেয়েরা সব কচুবনে গয়না ফেলে দিয়েছিল। আমিই বুদ্ধি করে বের করি।”
ঝালুরাম তখন আবার বরদাচরণের পিঠ চাপড়ায়। তাতে গয়াপতি ফুঁসে উঠে বলেন, “চাটুজ্যের বুকে বল্লম ধরেছিল কে শুনি! তোমার সাহস হত?”
বরদাচরণ বলেন, “আর চাটুজ্যেকে বাঁধল কে? সেটাও জোর গলায় বলো।”
এইভাবেই দুজনে প্রচণ্ড ঝগড়ায় লেগে পড়েন। ডাকাতরা চারদিকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে দুজনের ঝগড়া দেখে। ঝালুরাম দুজনেরই পিঠ চাপড়ে একবার একে আর একবার ওকে সাবাস দিতে থাকে। কিন্তু ঝগড়া তাতে বাড়ে বই কমে না। একে সাবাস দিলেও চটে ওঠে, ওকে দিলে এ ফুঁসে ওঠে। চেঁচানির চোটেসারা গঞ্জের ঘুম ছুটে যায়। আর কখন যে ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব পুলিস নিয়ে এসে গোটা দলটাকে ঘিরে ফেলেছেন তাও ডাকাতরা ভালমতো টের পায় না।
গয়াপতির মা দু-দুটো মানত করেছিলেন। ঝালুরাম ধরা পড়লে জোড়া হাতি দেবেন, আর নিরুদ্দেশ গয়াপতি ফিরে এলে জোড়া উট।
কিন্তু সস্তায় হাতি বা উট পাওয়া যাচ্ছে না কিছুতেই।
গুপ্তধন
ভূতনাথবাবু অনেক ধার-দেনা করে, কষ্টে জমানো যা-কিছু টাকা-পয়সা ছিল সব দিয়ে যে পুরোনো বাড়িখানা কিনলেন তা তার বাড়ির কারোর পছন্দ হল না। পছন্দ হওয়ার মতো বাড়িও নয়, তিন-চারখানা ঘর আছে বটে কিন্তু সেগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ। দেয়ালে শ্যাওলা, অশ্বথের চারা জন্মেছে। দেয়ালের চাপড়া বেশির ভাগই খসে পড়েছে, ছাদে বিস্তর ফুটো-টুটো। মেঝের অবস্থাও ভালো নয়, অজস্র ফাটল। ভূতনাথবাবুর গিন্নি নাক সিঁটকে বলেই ফেললেন, ‘এ তো মানুষের বাসযোগ্য নয়। ভূতনাথবাবুর দুই ছেলে আর তিন মেয়েরও মুখ বেশ ভার-ভার। ভূতনাথবাবু সবই বুঝলেন। দুঃখ করে বললেন, আমার সামান্য মাস্টারির চাকরি থেকে যা আয় হয় তাতে তো এটাই আমার তাজমহল। তাও গঙ্গারামবাবুর ছেলেকে প্রাইভেট পড়াই বলে তিনি দাম একটু কম করেই নিলেন। পঁয়ত্রিশ হাজার টাকায় এ বাজারে কি বাড়ি কেনা যায়। তবে তোমরা যতটা খারাপ ভাবছ ততটা হয়তো নয়। এ বাড়িতে বহুদিন ধরে কেউ বাস করত না বলে অযত্নে এরকম দুরবস্থা, টুকটাক মেরামত করে নিলে খারাপ হবে না। শত হলেও নিজেদের বাড়ি।
