ছুটলেন গয়াপতি। গরুটার ওপর অনেক খোঁচাখুঁচি চলল। শেষে পাশের গাঁ হরবল্লভপুরের রহমত খবর পেয়ে ধেয়ে এসে গয়াপতির পায়ে পড়ে বলল, “হুজুর, ওটা ঝালুরাম নয়, নির্য গরুই বটে। ও হল আমার দুলালি। শ্রীপতিদার কেলে গাই আমার গোয়ালে বাঁধা রয়েছে।”
গয়াপতি দমে গিয়ে বললেন, “হুম!”
ঝালুরামের পিছনে দৌড়ঝাঁপ করতে-করতে গয়াপতি বাস্তবিকই টসকে গেছেন। জীপগাড়িতে চড়ে তাঁর গায়ে-গতরে প্রচণ্ড ব্যথা। ইদানীং দুর্গম জায়গায় যেতে হয় বলে ঘোড়াতেও চড়তে হচ্ছে। তার ফলে মাজায় বিষফোঁড়ার যন্ত্রণা। ঝালুরামের কথা ভাবতে ভাবতে সবসময়ে এমন দাঁত কিড়মিড় করেন যে, দুটো বুড়ো দাঁত নড়ে গেল। আজকাল এমন সন্দেহবাই হয়েছে যে, থানার সেপাই, বাড়ির চাকর, এমন কী নিজের মা বা বউকে পর্যন্ত বিশ্বাস করেন না। এরা যে-কেউই ঝালুরাম হতে পারে বলে আজকাল তার সন্দেহ হয়। হাতে সবসময়ে খোলা রিভলভার। খেতে, শুতে, মান করতে বা বাথরুমে যেতেও হাতে সেটা থাকে। ফলে কেউ ভয়ে তার কাছে ঘেঁষে না।
কাণ্ড দেখে গয়াপতির মা ঝালুরামকে উদ্দেশ করে শাপশাপান্ত করতে লাগলেন, “কেন রে খ্যাংরাফো, পালিয়ে বেড়াচ্ছিস? তোকে সাপে বাঘে খায় না রে? না খায় তো আমার সুমুখে একবার আয় দেখি বুক চিতিয়ে, ঝাটা দিয়ে তোর বিষ ঝেড়ে দিই। বদমাশ কোথাকার, আমার বাছা খুঁজে-খুঁজে হেদিয়ে পড়ল, আর কোন্ আকেলে তুই তার চোখে ধুলো দিয়ে বেড়াচ্ছিস? বাছা আমার যেমন না-খেয়ে না-ঘুমিয়ে রোগা হয়ে গেল, তোরও তাই হোক। শুকিয়ে আমসি হয়ে যা, না খেয়ে উপোসি থেকে তোর পেট-পিঠের চামড়ায় ঘষাঘষি হোক।”
গয়াপতির গিন্নি গিয়ে হেকমতপুরের জাগ্রত কালীবাড়িতে জোড়া পাঠা মানত করে এলেন। শুনে গয়াপতির মা বললেন, “জোড়া পাঁঠা কি গো, ঝালুরাম ধরা পড়লে আমি জোড়া মোষ দেব। তাতেও না হলে জোড়া হাতি দেব, এই বলে রাখলাম।”
গয়াপতি সবই শুনেছেন এবং বুঝেছেন। তিনি যে ঝালুরামকে ধরতে পারবেন এ বিশ্বাস কারো নেই। সেটা বুঝতে পেরে তিনি আরও গুম হয়ে যান। রিভলভারটা বাগিয়ে ধরে গভীরভাবে ভাবতে থাকেন।
একদিন সকালে থানায় নিজের অফিসঘরে বসে যখন এমনি ভাবেই ভাবছিলেন, তখন হঠাৎ একটা লম্বা-চওড়া লোক ঘরে ঢুকেই তার বুকের দিকে পিস্তল বাগিয়ে ধরে বলল, “হাত তুলুন।”
গয়াপতি রিভলভার সুষ্ঠু হাত ওপরে তুলে সভয়ে বললেন, “মেরো না বাবা ঝালুরাম!”
লোকটা গম্ভীর হয়ে বলল, “আমি ঝালুরাম নই, আর আপনাকে মারার ইচ্ছেও নেই। তবে আমি শুনেছি যে, আজকাল আপনি সবসময়ে রিভলভার বাগিয়ে থাকেন আর সবাইকে সন্দেহ করেন। তাই প্রাণের ভয়ে একটু ভয় দেখাতে হল। এখন আপনি যদি আপনার রিভলভারটা খাপে ভরেন, আমিও পকেটে পুরব।”
গয়াপতি হাঁফ ছেড়ে রিভলভার খাপে ঢোকালেন। লোকটাও কথামতো কাজ করল। তারপর বসে এক গাল হেসে বলল, “ আমি গোয়েন্দা বরদাচরণ। নরনাথ চাটুজ্যে আমাকে ভাড়া করে এনেছেন তাদের বাড়ির সোনার হংসেশ্বরীর মূর্তি পাহারা দেওয়ার জন্য। তাদের ভয়, ডাকাত ঝালুরাম মূর্তিটা লুট করবে।”
গয়াপতি নাক সিঁটকোলেন। প্রাইভেট গোয়েন্দা বরদাচরণের নাম তিনি শুনেছেন। লোকটা লাউঁচুরি বা বড় জোর ছেলেচুরির কেস করে। তাই গয়াপতি খুবতাচ্ছিল্যের সঙ্গে বললেন, “ঝালুরামের ব্যবস্থা আমিই করব। আর কারো এখানে নাক গলাতে হবে না।”
বরদাচরণ মৃদু হেসে বললেন, “আপনি কী ভাবছেন তা আমি জানি। তবে এটুকু বলতে পারি, আমি আজকাল লাউঁচুরি, গরুচুরির মতো ছোটোখাটো কেস নিই না। মাত্র দু মাস আগে আমি একটা পুকুরচুরি ধরেছি।”
গয়াপতি চমকে গিয়ে বললেন, “বটে?”
“তবে আর বলছি কী? গয়েরকাটার রাম সিংয়ের বাড়ির ঈশান কোণের মস্ত পুকুর রাতারাতি চুরি হয়ে গেল। রাতেও টলটলে জল ছিল তাতে। সকালে দেখা গেল বিশাল গর্ত পড়ে আছে। জল তো নেই-ই, অন্তত বিশ মন মাছও সেই সঙ্গে উধাও। তিন দিনের মধ্যে ধরে ফেললাম, রাম সিংয়ের এক জ্ঞাতি ভাই রাবণ সিং বাড়ির সবাইকে সিদ্ধির সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ায় তারপর রাতে ডিজেল পাম্প চালিয়ে পুকুরের সব জল নিজের একটা মজা দিঘিতে চালান করে এবং বিশ মন মাছ নিয়ে গিয়ে শহরে বেচে দেয়। আরো শুনবেন? মাত্র একমাস আগে আমি দুটো আন্তর্জাতিক চোরাই চালানের দলকে ধরি। আমেরিকার বড়লোকেরা বায়না ধরেছে তাজমহল এবং এভারেস্ট চাই। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দেবে তার জন্য। মাসখানেক আগে এক অমাবস্যার রাত্রে চারটে লোক আমেরিকায় চালান দেওয়ার জন্য তাজমহলের ভিত খুঁড়ছিল। তক্কেতক্কে আমি গিয়ে পালের গোদাকে চেপে ধরি। বাকি তিনজন পালায় বটে, কিন্তু হাতের ছাপ সহ শাবল ফেলে যায়। সেবারের মতো তাজমহল আমেরিকায় চালান হওয়ার হাত থেকে বেঁচে যায় এবং পুরো দলটাই ধরা পড়ে। তার কিছুদিনের মধ্যেই নেপাল গভরমেণ্টের ডাকে নেপালে গিয়ে আমি এভারেস্ট চুরিও আটকাই। চোরেরা এভারেস্ট শৃঙ্গ ভেঙে টুকরো করে সাধারণ পাথর হিসেবে আমেরিকায় চালান দিচ্ছিল। আমেরিকায় পাথরের চালান যাচ্ছে শুনেই আমার সন্দেহ হয়। আমেরিকায় তো পাথরের অভাব নেই। তাই চালানের পাথর পরীক্ষা করেই আমি বুঝতে পারলাম, এ সাধারণ পাথর নয়। সেগুলোর গায়ে তখনো বরফ লেগে আছে। অনুসন্ধানে পুরো দলটাই ধরা পড়ল। নেপাল গভরমেন্ট গোপনে জাপান থেকে ইনজিনীয়ার আনিয়ে টুকরো পাথর সিমেন্টে জুড়ে ফের এভারেস্ট শৃঙ্গ রাতারাতি মেরামত করে ফেলল। সুতরাং…”
