এই বলে লোকটা হাসতে হাসতে বাতাসে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দাদামশাইয়ের বাবা আর গন্ধের কথা বলতেন না! একটু গম্ভীর হয়ে থাকতেন ঠিকই, ভূতের অপমানটা তার প্রেস্টিজে খুব লেগেছিল। একটা ভূত তার গা এঁকে ঐ কথা বলে গেছে ভাবা যায়!
গয়াপতির বিপদ
দারোগা গয়াপতির ভারী ফ্যাসাদ। কিছুতেই তিনি ডাকাত ঝালুরামকে ধরতে পারছেন না। ধরা দূরে থাকুক, ঝালুরামের চেহারাটা কেমন, সে কালো না ফর্সা, লম্বা না বেঁটে, হাসিখুশি না গোমড়ামুখো, তাও তিনি জানেন না। অথচ সরকার জোর তাগাদা দিচ্ছেন, ঝালুরামকে ধরতে না পারলে গয়াপতির বদলি অবধারিত।
তা ঝলুরামকে ধরাও সোজা কথা নয়। তার বন্দুক-পিস্তল আছে, হাতি-ঘোড়া-মোটরগাড়ি আছে, ছদ্মবেশ ধরতেও সে খুব ওস্তাদ লোক। যাদের বাড়িতে ঝালুরাম ডাকাতি করেছে, তারা কেউ সঠিকভাবে ঝালুরামের চেহারার বর্ণনা দিতে পারে না। কেউ বলে লম্বা, কারো মতে বেঁটে, কেউ বলে ফর্সা, কারো দাবি কালো। এ পর্যন্ত পনেরোজন ঝালুরামের বিবরণ পাওয়া গেছে। কিন্তু গয়াপতি জানেন, ঝালুরাম এক এবং অদ্বিতীয়। গত দুবছর ধরে এই শান্তির এলাকাকে ঝালুরাম ভারী সমস্যাসংকুল করে তুলেছে। বাড়ি লুটছে, দোকান লুটছে, আড়ত সাফ করে নিয়ে যাচ্ছে, রাস্তায়-ঘাটে লোকের সর্বস্ব কেড়ে নিচ্ছে। এখন ঝালুরামের নাম শুনলে কেউ অজ্ঞান হয়ে পড়ে, কেউ চোখ বুজে ফেলে, কেউ ঘামতে থাকে, কেউ বা ঠাণ্ডা মেরে যায়।
ঝালুরামের আবির্ভাব হওয়ার আগে গয়াপতি সুখেই ছিলেন। মাছ দুধ-ফল-সবজি-মাংস-ডিমের অভাব হত না। খাওয়া-দাওয়াটা বেশ হত। রাতে ঘুমোতেন, দিনে ঘুমোতেন, প্রায় সারাক্ষণই একটা ঘুম-ঘুম ভাব লেগে থাকত তার মনটা খুব প্রশান্ত থাকত, চারদিকটা ভারী শান্তিময় ও সুন্দর ছিল। গয়াপতির বেশ একটা বড়সড় ভুড়ি হয়েছে, গায়ে-গতরে থলথল করছে চর্বি। ওঠা, হাঁটা কাজকর্ম করা বা খাটা-খাটুনির অভ্যাসটাই মরে গেছে। ঠিক এই সময়ে একদিন দুম করে দুর্দান্ত ঝালুরাম তার এলাকায় ঝাঁপিয়ে পড়ে সব তছনছ করে দিল। প্রতিদিন কোথাও-না কোথাও ঝালুরাম কিছুনা-কিছু করছেই। দুবছরে মোট সাতশ ত্রিশ দিনে সে এগারো শো বাহান্ন রকমের লুটপাট, ছিনতাই, জখম ইত্যাদি করেছে।
গয়াপতির খিদে ক্রমশ কমে আসছে। রাতে একটু আধটু ঘুম এখনো হয় বটে, কিন্তু দিনের ঘুমটা আর আসতে চায় না আজকাল। ঘুম-ঘুম ভাবটাও আর নেই। গয়াপতির বুড়ি মা আজকাল প্রায়ই দুঃখ করে বলেন, “বড্ড রোগা হয়ে গেছিস গয়া। চোখের তলায় কালি পড়েছে, হাঁটার সময় তোর পেটটা আর আগের মতো দোল খায় না, জুতোর শব্দটাও তেমন দুমদাম করে হয় না।”
গয়াপতির গিন্নি আগে মোটা-মোটা সোনার বালা, চুড়ি, এগারো ভরির বিছে-হার পরে থাকতেন সবসময়। একদিন গয়াপতি দেখলেন, তার গিন্নি সব গয়না খুলে রেখে শুধু দু গাছি করে সরু চুড়ি আর সুতোর মতো সরু হার পরে আছেন। গয়াপতি হুংকার দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “গয়না খুলে ফেলেছ যে?”।
গিন্নি আমতা-আমতা করে বললেন, “সবাই বলছে চারদিকে খুব চোর ডাকাতের উপদ্রব, গয়না দেখানোটা নাকি ঠিক নয়।”
শুনে গয়াপতি গুম মেরে গেলেন। দারোগার বউ চোরডাকাতের ভয় খাচ্ছে। তার মানে, গয়াপতির যোগ্যতায় তার নিজের বউয়েরও বিশ্বাস নেই!
সেইদিন থেকে গয়াপতি মরিয়া হয়ে উঠলেন। ঝালুরামের যে-কোনো খবর পেলেই ছুটে যান। কিন্তু কিছুতেই শেষ পর্যন্ত হদিশ করে উঠতে পারেন না। সবাই আড়ালে দুয়ো দেয়।
সেবার সোনাগড়ের হাটের কাছে ঝালুরাম তার স্যাঙাতদের নিয়ে জড়ো হয়েছে বলে এক আড়কাঠির কাছে খবর পেয়ে গয়াপতি সদলবলে ছুটলেন। গিয়ে দেখেন নির্দিষ্ট জায়গায় এক খুনখুনে বুড়ি ঘরের মাটির দেয়ালে খুঁটে দিচ্ছে। আড়কাঠি মাথা চুলকে বলল, “এই বুড়িটাই ঝালুরাম। ছদ্মবেশে রয়েছে বোধহয়।”
গয়াপতি সন্দেহের শেষ রাখলেন না। বুড়িকে ধরে তুলে নিয়ে এলেন থানায়। বুড়ি পরিত্রাহি শাপশাপান্ত করতে থাকে। খবর পেয়ে শহর থেকে ম্যাজিস্ট্রেট এসে কাণ্ড দেখে হাসির ছররায় গয়াপতিকে ঘায়েল করে চলে গেলেন।
আবার আর-এক চরের কাছে খবর পেয়ে গয়াপতি চুপিসাড়ে কলসিপোতা গায়ের চাকলাদারদের নারকোলবাগানে হাজির হলেন! খবর ছিল, মরা নারকোলগাছের নীচে ঝালুরাম সাধু সেজে বসে আছে। গয়াপতি সাধুর লেংটিরও সন্ধান পেলেন না, তবে সেখানে ধুনির ছাই খানিকটা ছিল বটে। যে লোকটা খবর এনেছিল, সে বলল, “এই নারকোলগাছটাই আজ্ঞে ঝালুরাম। এটাকে গ্রেফতার করুন।”
শুনে গয়াপতির মাথায় রক্ত চড়ে গেল। লোকটাকে কান ধরে কয়েকটা চড়-চাপড় দিলেন। পরে কিন্তু খবর পেয়েছিলেন যে, লোকটা মিথ্যে বলেনি। মরা নারকোলগাছের ফাঁপা খোলের মধ্যেই নাকি ঝালুরাম গা ঢাকা দিয়েছিল। কদিন বাদে গিয়ে দেখলেন, বাস্তবিকই নারকোলগাছের গায়ে একটা চৌকো দরজা। সেটা খুললে ভিতরে দিব্যি একজন সেঁধোতে পারে। ফলে গয়াপতির এক গাল মাছি।
হরগঞ্জের শ্রীপতি হাজরা এসে একদিন বলল, “হুজুর, আমার কেলে গরুটা পাচ্ছি না। তার জায়গায় গোয়ালে একটা রাঙা গাই কে বেঁধে রেখে গেছে। বড় সন্দেহ হয়, রাঙা গাইটার ভাবগতিক দেখে। গরুর মতো ডাকে না, খোল ভুষি ঘাস এসব খেতে চায় না। ভাত দিলে খায়। মনে হচ্ছে গরুর ছদ্মবেশেই না আবার ঝালুরাম এসে ঘাপটি মেরে বসে থাকে।
