নিউইয়র্কের বৈজ্ঞানিক রাসেল সাহেব এই তো মাত্র এক সপ্তাহ আগে একজোড়া হাওয়াই চটি আবিষ্কার করে সবাইকে স্তম্ভিত করে দিয়েছেন। হাওয়াই চটি শুনে নাক সিটকোবার কিছু নেই। এ চটি পরে ইচ্ছেমতো শূন্যে উঠে ঘুরে বেড়ানো যায়। দু আড়াই মিটার শূন্যে যে কোথাও মানুষকে তুলে রাখার ক্ষমতা আছে এই হাওয়াই চপ্পল জোড়ার, প্রায় পাঁচশ বছর ধরে রাসেল সাহেবের নিরলস সাধনার ফলে এই আবিষ্কার। গগন যে এটা চুরি করতে পারে সেই ভয়ে আগে থাকতেই ব্যবস্থা করা ছিল, চারদিকে রোবো পাহারা দিয়েও নানারকম যন্ত্র, রশ্মি, চোরদ্ধ রনিক মোতায়েন। ঘন্টাখানেক আগে এসব বাধাকে কঁকি দিয়ে গগন যে কিভাবে চপ্পল জোড়া বাগিয়ে নিয়ে চলে গেল সেইটেই রহস্য। রহস্য অবশ্য তেমন কিছু নয়। গগন এসেছিল তার গগন চাকিতে করে। এই গগন চাকির একটা অদ্ভুত ক্ষমতা হলো, যখন-তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। নিজের শরীরের পরমাণু প্রক্রিয়া বদল করে যে-কোনও মনিটরকে ফাঁকি দিতে পারে। আর গগন নিজেও চালাক কম নয়। সে হুবহু রাসেল সাহেবের রূপ ধরে এসে সবাইকে ফাঁকি দিয়ে নিউইয়র্কের ইয়র্ক টাওয়ারের দুশো একান্ন তলার স্ট্রং রুম থেকে জিনিসটা বের করে নিয়ে সেই হাওয়াই চপ্পল পায়ে দিয়েই আকাশে তিনশো গজ দূরে তার গগন চাকিতে চেপে পালাচ্ছিল। সুবল দত্ত তার পুলিশী গাড়ি পবনদুতে বসে পাহারা দিচ্ছিল মাত্র পাঁচশ গজ দূরে। একটা লোককে হন হন করে শূন্যে হাঁটতে দেখেই তার সন্দেহ হয়। চোখে ভেদক দূরবিন লাগাতেই সে রাসেলের ছদ্মবেশের আড়ালে গগনকে চিনতে পারে। তারপরই তাড়া।
কিন্তু তাড়া করলেও একটা বাধা আছে। গগন চাকি হলো মহাকাশযান। পৃথিবীর সীমানা ডিঙিয়ে দূর-দূরান্তে চলে যেতে পারে। পবনদূত ততদূর পারবে না। তবে এক-দেড় লক্ষ মাইল অবধি পবনদূত বড় সাঙ্ঘাতিক। নানা ক্ষেপণাস্ত্র ও রশ্মি তো আছেই, পবনের গতিও দুর্দান্ত, এটাও একটা নতুন আবিষ্কার, খুব সম্প্রতি তৈরি হয়েছে।
পবনদূত যে তাকে তাড়া করেছে এটা গগন টের পায়নি, সে নিশ্চিত মনে নেপচুনকে লক্ষ্য করে চড়ে যাচ্ছিল, সুবল দত্ত স্পষ্ট দেখতেও পাচ্ছিল গগনকে। কারণ গগন চাকির দুর্ভেদ্য শরীরকে ভেদ করছিল সুবলের দূরবিন ভেদক। সুবল দেখল গগন খই আর কলা খাচ্ছে, ডানহাতে ঘাড় চুলকোচ্ছে। খুব নিশ্চিন্ত।
আচমকাই সুবলের কানে ইয়ার ফোনটা একটা গম্ভীর আওয়াজে যেন ফেটে পড়ল, কে রে তুই? আঁ?
গগনের গলা, সুবল দত্ত দাঁতে দাঁত পিষে, তোমার যম!
গগন হাঃ হাঃ করে হেসে বলল, তাই নাকি? চোর চোর খেলছিস বুঝি? যা দুধের ছেলে, ঘরে ফিরে যা, নইলে কঠিন অবস্থায় পড়ে যাবি।
আমি ভয় খাই না, আজ তোমারই একদিন কি আমারই একদিন। বটে! বটে! তাহলে আয় তোকে একটু কায়দা দেখাই।
বলেই গগন চাকি একটু থেমে উল্টো দিকে ধেয়ে আসতে লাগল, সাঙ্ঘাতিক কাণ্ড, সোজা তার দিকেই আসছে যে। সুবল দত্ত দুটো ক্ষেপণাস্ত্র আর একটা রশ্মি ছুঁড়ল। গগন চাকি অদৃশ্য হয়ে গেল।
সুবল দত্ত নিশ্চিন্ত হলো না। আঁতিপাঁতি করে মনিটর খুঁজতে লাগল। পেল না। কিন্তু আচমকাই পেছন থেকে কি যেন তার পবনদূতকে প্রচণ্ড বেগে ঠেলতে শুরু করল।
সুবল চেঁচাল, এই এই! কী হচ্ছে?
গগন হাঃ হাঃ করে হেসে উঠে বলল, কেন খোকা ভয় পেলে? দুধের বাছা তুমি, গগনের সঙ্গে পাল্লা নিতে এসেছো?
সুবল দত্ত দেখল, সামনে ঘোর বিপদ। তার পবনদূতের পাল্লা মাত্র দেড় লক্ষ মাইল। তারা ইতিমধ্যেই এক লক্ষ পঁচিশ হাজার মাইল পেরিয়ে এসেছে, দেড় লক্ষ মাইল পেরিয়ে গেলে পবনদূত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলবে। তাকে ফিরিয়ে নেওয়াই হবে কঠিন।
সুবল নানা কায়দায় পবনদূতকে থামানোর চেষ্টা করল। কিন্তু থামা কি সহজ! পিছন থেকে গগন চাকির প্রবল ঠেলায় তাকে নিয়ন্ত্রণ সীমার বাইরে নিয়ে যাবেই। সুবল ঘামছে।
কী খোকা, কেমন লাগছে?
ছেড়ে দিন আমাকে।
কেন, আমাকে ধরবে না?
আজ্ঞে না।
ধরলে যে পেল্লায় পুরস্কার।
আমার পুরস্কার চাই না।
তবে প্রাণটা চাই তো?
যে আজ্ঞে।
হাঃ হাঃ। তবে কান ধরো।
ধরেছি।
বলো আর কখনও এরকম করব না।
বলছি।
হাঃ হাঃ।
পবনদূতের পিছন থেকে চাপটা অদৃশ্য হলো। সুবল দত্ত দেখতে পেল, গগন চাকি সামনে দূর-দূরান্তে মহাকাশে মিলিয়ে যাচ্ছে।
সুবল দত্ত পবনদূতের মুখ পৃথিবীর দিকে ফিরিয়ে কপালের ঘাম মুছে বলল, খুব বেঁচে গেছি বাপ।
গগন পার্ক
গগন পার্কে বাচ্চারা খেলা করছে আর বুড়ো মালি হরিহর বসে বসে দেখছে। মালি বলতে গাছপালার তদারককারী নয়। হরিহর গগন পার্কের সব কিছুই নজরে রাখে। গগন পার্কে তো গাছপালা নেই। তবে আছে কৃত্রিম উপগ্রহ, ভাসমান সুইমিং পুল, খাওয়ার জায়গা, বেলুন-বিহার, রকেট চরকি, হাওয়াই সার্কাস, কত কী! পৃথিবী থেকে বাচ্চারা দলে দলে আকাশে আসে বিকেলবেলাটা কাটিয়ে যেতে। বাচ্চাদের পরনে মহাকাশের আলাদা পোশাকের দরকার হয় না। গগন পার্ক আকাশের অনেকটা জায়গা জুড়ে চমৎকার একটা পৃথিবীর মতো আবহমণ্ডল তৈরি করেছে। বাচ্চারা শ্বাস নিতে পারে, আবহমণ্ডলের যথাযথ চাপও বজায় থাকে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। বাচ্চারা ইচ্ছেমতো আকাশে পরীর মতো উড়ে উড়ে খেলা করে। ফুটবল, বাস্কেটবল, ক্রিকেট ছাড়াও আকাশে আরও নানা নতুন ধরনের খেলা চালু হয়েছে। হরিহর ঘুরে ঘুরে সব দিকে নজর রাখে।
