বিনয় হালদারের ছেলের নাম গঙ্গাপ্রসাদ। শ্যামাচরণ মাথাটা নামিয়ে জায়গাটা পার হয়ে যায়।
বাজারের মুখে বুড়ো নীলমণি দাসের সঙ্গে দেখা। নীলমণি লোকটা খুব আদর্শবাদী, স্বদেশী করত, একবার এম.এল.এ.-ও হয়েছিল, শ্যামাচরণ হাকিম থাকবার সময় থেকে ভাব।
নীলমণি দাঁড়িয়ে পড়ে বলল-শ্যামা যে! কোন দিকে?
–বাড়িই যাই।
–সে যাবে। বাড়ি পালাবে না, কথা আছে।
শ্যামাচরণ কথা শুনতে উৎসাহ পায় না আজকাল। ভাল কথা তো কেউ বলে না। তাই নিরাসক্ত গলায় বলে–কিসের কথা?
নীলমণি গলা নামিয়ে বলে–আজও ওদের দেখলাম। ভটভটিয়ায় জোড়া বেঁধে কুঠিঘাটের দিকে যাচ্ছে। এই একটু আগে। ওদের যে কারো পরোয়া নেই দেখায়।
ওরা বলতে কারা তা শ্যামাচরণ জানে। তাই উদাসভাবে নীল আকাশের দিকে চেয়ে বলে–তা তো দেখছই। আমার আর কী করার আছে বলো? চাও তো বলো, গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ি একদিন।
–আরে রাম রাম! তুমি ঝুলবে কেন? কিন্তু বিহিতের কথা ভেবেছো কিছু?
–আমার মাথায় আজকাল কিছু আসে না।
–আমি বিয়ের কথাও ভেবে দেখেছি বুঝলে? কিন্তু তোমার মেয়ে তো বয়সেও ছোঁড়াটার চেয়ে বড়। তাছাড়া হালদারমশাই তো ক্ষেপে আগুন হয়ে আছেই।
শ্যামাচরণ শ্বাস ফেলে বলে–সবই অদৃষ্ট। অকালে জামাইটা যে কেন–
বলেই শ্যামাচরণ ফের চমকে ওঠে। মনে পড়ে, লাশের মুখে সেই আঁচিলটা ছিল না। কথাটা আজও বলা হয়নি গৌরীকে। না বলাটা ঠিক হচ্ছে না।
কবে মরেটরে যাবে শ্যামাচরণ, একটা সত্য কথা তার সঙ্গেই হাপিস হয়ে যাবে তাহলে।
নীলমণি কথা বলতে বলতে খানিক এগিয়ে দিল। সাবধানে রেল লাইন পার হয়ে শ্যামাচরণ বাড়িমুখো হাঁটতে থাকে। বগলে ভাজকরা খবরের কাগজটা, বেশ কী একটা বলি বলি করে। কিন্তু কোনোদিনই বলে না, দুপুরে খাওয়ার পর আজ আবার খবরের কাগজটা তন্ন তন্ন করে খুঁজবে শ্যামাচরণ। খবরটা থাকার কথা।
বাড়ি ফিরে স্নান খাওয়া সারতে বেলা চলে গেল। মেয়েটা এখন বাড়ি ফেরেনি। নাতি-নাতনি দুটো স্কুল থেকে আসবে এখন। বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে শ্যামাচরণ। বৌ ক্ষমা এঁটোকাটা সেরে এসে বিছানার একপাশে বসে বলে–আর তো মুখ দেখানো যাচ্ছে না।
ক্ষমার বয়স হয়েছে, সাধ-আহ্লাদ বড় একটা করেনি জীবনে। সংসারে জান বেটে দিচ্ছে বিয়ের পর থেকে। আজকাল শ্যামাচরণের বড় মায়া হয়।
ঘড়ি দেখে শ্যামাচরণ উঠে বসে বলে–হরিদ্বার যাবে?
–যাহোক কোথাও চলে যাই। তোমার আদরের মেয়ে সুখে থাক।
–কে দেখবে ওকে?
–আহা! দেখার ভাবনা! কাড়ি কাড়ি টাকা আছে ওর। জামাই মরে গিয়েও তো টাকা হাতে এসেছে।
–তা বটে। বলেই ফের সেই লাশের ভাঙাচোরা বিকৃত মুখ মনে পড়ে। আঁচিলটা ছিল না সেই মুখে। তবে কি?
অনেক রাতে গৌরী পাশ ফিরতে গিয়ে জেগে ওঠে। কে যেন চাপাস্বরে ডাকল।
–কে?
শ্যামাচরণ জানলার বাইরে জ্যোৎস্নায় দাঁড়িয়ে। চাপা গলায় বলল আমি তোর বাবা। শোন।
–বাবা! অবাক হয়ে বিছানা ছেড়ে গৌরী উঠে আসে, ওমা, তুমি বাইরে কেন? কী হয়েছে?
শ্যামাচরণের মুখচোখ জ্যোৎস্নায় অন্যরকম দেখায়। চোখের বসা কোল বাটির মতো, তাতে টুপটুপে ভরা অন্ধকার। চোখের তারা থেকে জ্যোৎস্নার প্রতিবিম্ব ঝিকমিক করে।
শ্যামাচরণ বলে–তার মুখে সেই আঁচিলটা ছিল না।
–কে? কার কথা বলছো?
শ্যামাচরণ বলে, বহুকাল ধরে চেপে রাখা গোপন কথাটা বুক থেকে বেরিয়ে যায়।
গৌরী জানলার শিকটা চেপে ধরে। তারপর আস্তে আস্তে পাথর হয়ে যায়।
পরদিন শ্যামাচরণ আবার গন্ধবণিকের দোকানে গিয়ে বসে। বিশাল নদীর ওপর ফুরফুর করে নীল আকাশ। নৌকা আসে, নৌকা যায়। ব্যাপারীদের হট্টরোল ওঠে চারধারে।
শ্যামাচরণ খবরের কাগজ খুলে তন্ন তন্ন করে খবরটা খোজো পায় না। ব্যাপারীরা এসে গল্প রাঙিয়ে তোলে। হাওয়া দেয়। চায়ের গন্ধের সঙ্গে নদীর আঁশটে গন্ধ গুলিয়ে ওঠে।
আজ সারাদিন গৌরী বেরোয়নি। কারো সঙ্গে দেখা করে নি। কথা বলেনি। সারাদিন শুধু ঘরে বসে কেঁদেছে।
দুপুরে বাড়ি ফিরে শ্যামাচরণ একই খবর পেল। গৌরী নিজের ঘরে শুয়ে কাঁদছে।
শ্যামাচরণ কাউকে কিছু বলল না। ক্ষমা প্রশ্ন করে বসে হাঁপিয়ে যায়।
খেয়ে উঠে শ্যামাচরণ খবরের কাগজটা গৌরীর ঘরের জানালা গলিয়ে ভিতরে ফেলে দিয়ে চাপা গলায় বলে–সব খবর তো কাগজেই থাকে। রোজ দেখিস তো।
গৌরী প্রথমে কথা বলে না। কিন্তু অনেকক্ষণ বাদে উঠে চোখ মুছে খবরের কাগজটা পড়তে থাকে। কেন পড়ে তা বুঝতে পারে না। জগৎটা সম্পর্কে আবার তার ভীষণ আগ্রহ জেগেছে।
শ্যামাচরণ বিকেলে ঘুম থেকে উঠে ক্ষমাকে বলে-কাল থেকে একটা ইংরিজি খবরের কাগজও দিতে বোলো তো কাগজের ছেলেটাকে। কত খবর থাকে। একটা কাগজে সব পাওয়া যায় না।
গগন চাকি ও পবন দূত
কুখ্যাত ডাকাত গগন চাকিকে তাড়া করেছে বিখ্যাত পুলিশের গোয়েন্দা সুবল দত্ত। ধরো ধরো অবস্থা। গগনকে ধরতে পারলেই পেল্লায় পুরস্কার, কারণ এযাবৎ গগনকে শত চেষ্টাতেও ধরা যায়নি। তার কারণ গগন চাকিরও আবার একটি গগন চাকি আছে। অর্থাৎ কিনা গগনের গগাড়ি। যেটা এত জোরে ছোটে যে তার সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার সাধ্যি পুলিশের কোনও গাড়ির নেই। গগন শুধু ডাকাতই নয় মস্ত বৈজ্ঞানিকও। গোটা নেপচুন গ্রহটা দখল করে সে বিশাল গবেষণাগার বানিয়েছে মাটির তলায়। কেউ এটার ধারে কাছে যেতে পারে না, এমন এক রশ্মিবর্ম দিয়ে তার চারধারে বলয় তৈরি করা হয়েছে। সরকারি সব রকম চেষ্টা ব্যর্থ করে গগন সুযোগ বুঝে পৃথিবীতে হানা দেয় এবং ইচ্ছেমতো ডাকাতি করে পালিয়ে যায়। টাকাপয়সা অবশ্য সে ছোঁয়ও না, সে ডাকাতি করে রাসায়নিক অতিযন্ত্র বা নতুন কোনও গবেষণালব্ধ জিনিস। সর্বত্র তার চর আছে। তারাই খবর দেয় গগনকে।
