গগন পার্কের এক কোণে তার ছোট্ট একখানা ভাসমান বাড়ি আছে। হরিহর একাই থাকে। রান্নাবান্না করে, খায় ঘুমোয়। মজা হলো গগন পার্কে সূর্য অস্ত যায় না। পৃথিবীর মতো এখানে দিন রাত নেই। সারাক্ষণ কটকটে আলো। সারাদিনই বাচ্চাদের গাড়ি লেগে থাকে। কারণ ভারতে বিকেল ফুরোলে ইউরোপে বিকেল হয়, তারপর আমেরিকায় হয়। সুতরাং একদল বাচ্চা ফিরে যেতে না যেতেই আর একদল এসে হাজির হয়। হরিহরের সুতরাং ছুটি নেই। তবে ওরই ফাঁকে ফাঁকে একটু করে ঘুমিয়ে নেওয়া, টুক করে রান্না চাপানো এবং এক ফাঁকে খেয়ে নেওয়া। আকাশে থাকার একটা সুবিধে, মেঘ বৃষ্টি নেই। সূর্যরশ্মি থেকেই রান্নাবান্না সব হয়। বিজলীর ব্যবস্থাও আছে। এই চাকরিটার আরও একজন উমেদার ছিল। তার নাম নিশিকান্ত। নিশিকান্তের বয়সও হরিহরের কাছাকাছি। হরিহরের এখন একশো আটান্ন চলছে, নিশিকান্তের একশো আটচল্লিশ। সরকারি দফতরখানায় চৌকিদারের কাজ করে। হরিহরকে সরিয়ে চাকরিটায় বহাল হওয়ার জন্য সে কম মেহনত করছে না। তাই হরিহর একটু ভয়ে ভয়েই থাকে। গগন পার্কের এত ভাল চাকরি ছেড়ে যেতে তার একটুও ইচ্ছে করে না। পৃথিবীতে নানা ভেজাল, নানা ঝঞ্ঝাট।
পার্কের কোণে নিজের ভাসন্ত জলচৌকিখানায় বসে নানা কথা ভাবতে ভাবতে হরিহর বাচ্চাদের ফুটবল খেলা দেখছিল। পৃথিবীর ফুটবলের চেয়ে ঢের অন্যরকম। ওপর দিয়ে নীচ দিয়ে বল নিয়ে যাওয়া, ডিগবাজি খাওয়া, কিন্তু পড়া নেই, চোট-টোটও কেউ পায় না। বেশ খেলা।
এই যে হরিহর! তা কেমন আছো ভায়া?
হরিহর চমকে চেয়ে দেখে, নিশিকান্ত। একখানা এয়ার ট্যাক্সি থেকে নেমে এলো। মুখে একটু হাসি।
হরিহর বলল, এই আছি আর কি, তা কী মনে করে?
তোমার কাছেই আসা, কথা ছিল।
এখানেই বসবে? নাকি ঘরে যাবে?
তা ঘরেই চলো।
কাছেই হরিহরের বাড়ি। দুখানা ঘর, রান্নাঘর, বাথরুম, সব আছে। নিশিকান্ত বসবার ঘরে বসে চারদিকে চেয়ে দেখে বলল, বেশ খাসা আছো কিন্তু। ভাবনা নেই, চিন্তা নেই।
ওরকম মনে হয়। কাজে বিস্তর খাটুনি।
খাটুনি হলেও এ চাকরির আরামটাও তো দেখবে, যাকগে যাক।
বলে কাঁধের শান্তিনিকেতনী থলি থেকে একটা থারমাল কৌটো বের করে নিশিকান্ত বলে, এখন পৃথিবীতে কোন্ ঋতু চলছে তা জানো?
হরিহর একটু লজ্জিত হয়ে বলে, না, ওসব আর কে হিসেব রাখে! এখানে তো ঋতুচক্র নেই!
সেই জন্যই জিজ্ঞেস করলাম। এখন আমাদের ভাদ্রমাস চলছে। গাছে ইয়া বড় বড় তাল হয়েছিল। আমার ছেলের বউ তালনবমীতে ঠাকুরকে তালের বড়া ভোগ দিয়েছে। তোমার জন্য নিয়ে এসেছি কয়েকটা, রেখে দাও সময় মতো খেও।
হরিহর সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল। হঠাৎ শত্রুপক্ষ এত খাতির করে কেন? মতলব নেই তো!
নিশিকান্ত হেসে বলল, আরে নাও, নাও, বিষ মিশিয়ে দিইনি। খেও। আমার পুত্রবধূটি বড্ড ভাল রাঁধে। যাতে হাত দেয় তাই অমৃত।
হরিহর লজ্জিত হয়ে নিল কৌটোটা। হট বক্সে রেখে দিয়ে বলল, তা খাবোখন, তালের বড়া আমিও খুব ভালবাসি। এখানে তো ওসব মেলে না। সপ্তাহে একদিন বাজার ফেরি আসে, শাকসবজি দিয়ে যায়।
নিজেই রাঁধো?
আর কে আছে! সেদ্ধ পোড়া করে খেয়ে নিই। সময়ও হয় না।
নিশিকান্ত একখানা শ্বাস ফেলে বলল, তোমার আর ভয় নেই। তোমার চাকরি কেড়ে নেওয়ার জন্য আর আমি কলকাঠি নাড়ব না।
তাই নাকি?
কী হলো জানো! ছেলের বিয়ে দেওয়ার পর যখন বউমাটি এলেন তখন ভারী খাওয়ার মুখ হতে লাগল আমার। কত্তকাল এমন রান্না খাইনি। মুড়ি ঘন্ট, ছ্যাচড়া, চচ্চড়ি, পায়েস, ক্ষীর, সরভাজা–সে এলাহি কাণ্ড। খেতে বড় ভালবাসি আমি। হঠাৎ বুঝতে পারলুম গগন পার্কে চাকরি পেলে এরকম খাট আর হবে না। বউমা অভ্যাস খারাপ করে দিয়েছে। ক দিনই বা আর বাঁচব বলো! আর ধরো বড়ো জোর চার পাঁচশো বছর। তা এই কটা বছর একটু মনের সুখে খেয়ে নিই। কী বলো!
হরিহর তাকিয়ে রইল।
নিশিকান্ত একগাল হেসে বলল, সত্যিই বলছি হে। তোমার চাকরির ওপর আর আমার লোভ নেই। নিশ্চিন্তে থাকো, সেদ্ধ-পোড়া খেয়ে বেঁচে থাকা আমার পোষাবে না।
হরিহর একটা শ্বাস ছাড়ল। নিশ্চিন্তির না হতাশার তা সে নিজেও বুঝতে পারল না।
গন্ধটা সন্দেহজনক
সেবার আমার দিদিমা পড়লেন ভারী বিপদে।
দাদামশাই রেল কোম্পানিতে চাকরি করতেন, সে আজ পঞ্চাশ বছর আগেকার কথা। আমার মা তখনও ছোট্ট ইজের-পরা খুকী। তখন এত সব শহর নগর ছিল না, লোকজনও এত দেখা যেত না। চারধারে কিছু গাছগাছালি জঙ্গল টঙ্গল ছিল। সেই রকমই এক নির্জন জঙ্গুলে জায়গায় দাদামশাই বদলি হলেন। উত্তর বাংলার দোমোহানীতে। মালগাড়ির গার্ড ছিলেন, তাই প্রায় সময়েই তাকে বাড়ির বাইরে থাকতে হতো। কখনো একনাগাড়ে তিন চার কিম্বা সাতদিন। তারপর ফিরে এসে হয়তো একদিন মাত্র বাসায় থাকতেন, ফের মালগাড়ি করে চলে যেতেন। আমার মায়েরা পাঁচ বোন আর চার ভাই। দিদিমা এই মোট ন’জন ছেলেমেয়ে নিয়ে বাসায় থাকতেন। ছেলেমেয়েরা সবাই তখন ছোটোছোটো, কাজেই দিদিমার ঝামেলার অন্ত নেই।
এমনিতে দোমোহানী জায়গাটা ভারী সুন্দর আর নির্জন স্থান। বেঁটে বেঁটে লিচু গাছে ছাওয়া, পাথরকুচি ছড়ানো রাস্তা, সবুজ মাঠ, কিছু জঙ্গল ছিল। লোকজন বেশি নয়! একধারে রেলের সাহেবদের পাকা কোয়ার্টার, আর অন্যধারে রেলের বাবুদের জন্য আধপাকা কোয়ার্টার, একটা ইস্কুল ছিল ক্লাস এইট পর্যন্ত। একটা রেলের ইনস্টিটিউট ছিল, যেখানে প্রতি বছর দু তিনবার কেদার রায় বা টিপু সুলতান নাটক হতো। রেলের বাবুরা দল বেঁধে গ্রীষ্মকালে ফুটবল খেলতেন, শীতকালে ক্রিকেট। বড় সাহেবরা সে-খেলা দেখতে আসতেন। মাঝে মাঝে সবাই দল বেঁধে তিস্তা নদীর ধারে বা জয়ন্তিয়া পাহাড়ে চড়ুইভাতিতেও যাওয়া হতো। ছোটো আর নির্জন হলেও বেশ আমুদে জায়গা ছিল দোমোহানী।
