–মকবুলের কাছ থেকে।
–মকবুল কে?
–আমার বন্ধু। আগেরবার যাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু সে আমার সঙ্গে আর ফিরতে পারে নি। হিংস্র মোরানদের হাতে মারা গেছে।
–ও। কিন্তু এটা কি সত্যিই হীরের খণ্ড? হেনরীর সন্দেহ তবু যেতে চায় না।
–গুহার মুখে হীরেটা নিয়ে আসুন, তা হলেই বুঝতে পারবেন।
–বেশ। হেনরী তার সৈন্যদের ইঙ্গিত করল। তারা সবাই কাছিটা ধরে টেনে হীরের গুহার মুখের কাছে নিয়ে এল। যেটুকু সূর্যের আলো তেরচা হয়ে পড়ল, তাতেই হীরেটা জ্বলজ্বল করে উঠল। বিচিত্র রঙের ছাট বেরোতে লাগল হীরেটার গা থেকে। হেনরী চোখ দুটো লোভে চকচক করে উঠল। সে সঙ্গে-সঙ্গে তার সৈন্যদের হুকুম দিল–কাছিটা ধরে আস্তে-আস্তে হীরেটা পাহাড়ের নীচে নামিয়ে দাও।
ফ্রান্সিস তাড়াতাড়ি হাত তুলে সৈন্যদের ইঙ্গিত করে হেনরীর কাছে এগিয়ে এসে বলল–এই হীরেটা কি আপনি নিয়ে যেতে চান?
–অবশ্যই–হেনরী হাসল–নইলে এত কষ্ট করে আপনাদের পিছু এলাম কেন? ফ্রান্সিস গম্ভীর স্বরে বলল–দেখুন, আপনারা একদিন আমার প্রাণ বাঁচিয়ে ছিলেন। সেই কৃতজ্ঞতাবোধ থেকেই আপনাকে আমি সব কথা বলেছি, কিছুই গোপন করি নি। আমি যদি না বলতাম, তাহলে একটা এবড়োখেবড়ো পাথরের খণ্ড ভেবে আপনারা চলে যেতেন।
–তা কি বলা যায়। সমুদ্র পেরিয়ে এতদূর থেকে আপনারা এসেছেন কার্পেট বিক্রী করতে, তাও সঙ্গে আপনাদের কার্পেট নেই। একটা গাড়ী এনেছেন, তার আবার মাথা খোলা। এই সবকিছুই আমার মনে সন্দেহের উদ্বেগ উঠেছিল। যে পাথরটা আপনারা তোলার আয়োজন করেছিলেন, সেটা দামী কিছু, এ বিষয়ে আমার মনে কোন সন্দেহ ছিল না। কিন্তু সেটা যে একটা আস্ত হীরে, এটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।
–তাহলে আর একটা কথা অপনাকে জানাই। এই হীরেটা একটা খণ্ডমাত্র।
–বলেন কি?
–হ্যাঁ, এটা আমার অনুমান। পাহাড়ে যখন ধ্বস নেমেছিল, তখন আস্ত হীরেটা দু’খণ্ড হয়ে যে গহ্বরের সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে পড়ে যায়। এই খণ্ডটা আমি পেয়েছি গহ্বরটার একটা খাঁজে। অন্য খণ্ডটা গহ্বরের তলদেশে কোথাও পড়েছে।
–তাই নাকি। হেনরী খুশীতে লাফিয়ে উঠল।
–আমার কথা এখনও শেষ হয়নি। ফ্রান্সিস গম্ভীরস্বরে বলল–সেই অন্য হীরের খণ্ডটার জন্যে আমি আবার গহ্বরে নামব। যদি সেই খণ্ডটা পাই, তাহলে আপনারা এটা নিয়ে যাবেন, আমাদের কোন আপত্তি নেই।
–আপত্তি থাকলেই বা শুনছে কে?
–তাহলে লড়ে নিতে হবে।
হেনরী হো-হো করে হেসে উঠল–একমাত্র আপনার কোমরেই তরোয়াল আছে–ওটা আর নিইনি। আপনার দলের বাদবাকী সকলের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং গুহার মুখ থেকে নীচে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এর পরেও লড়তে চান?
–হ্যাঁ, আমি একাই লড়বো।
–কেন মিছিমিছি বেঘোরে প্রাণটা দেবেন।
ফ্রান্সিস তরোয়ালের হাতলে হাত রাখল। হেনরী তাই দেখে বলে উঠল–উঁহু, উঁহু খুন-খারাপি আমি দু’চোখে দেখতে পারি না। তার চেয়ে আমাদের একজন লোক গহ্বরে নামুক। খোঁজ করে দেখুক, আর একটা হীরের খণ্ড পায় কিনা।
–আগে বলুন সেটা পেলে কে নেবে?
–বেশ। আর একটা হীরের খণ্ড পেলে আপনারা নেবেন।
–খুব ভালো কথা।
হেনরীর ইশারায় সৈন্যদল থেকে একজন এগিয়ে এল। আবার গহ্বরের মধ্যে কাছি ফেলা হল। লোকটি কাছি ধরে নামতে লাগল। এক হাতে মশাল ধরে লোকটি অনেকটা নেমে গেল। একটু পরেইহঠাৎ লোকটির আর্তনাদ শোনা গেল। সেই আর্তনাদ গহ্বরের মধ্যে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল। সবাই ছুটে গহ্বরের কাছে গেল। কাছি টেনে দেখা গেল, লোকটা। কাছি ছেড়ে গহ্বরের নীচে পড়ে গেছে। কি কারণে এমনটা হলো, কেউই ভেবে পেল না। হেনরী কি করবে বুঝে উঠতে পারল না। চোখের সামনে এরকম মৃত্যু দেখে কেউই আর গহ্বরে নামতে সাহস পেল না।
এবার ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসের বন্ধুরা তাকে নানাভাবে নিবৃত্ত করতে চাইল। কিন্তু পারল না। ফ্রান্সিস বলল, আমার জন্যে কাউকে ভাবতে হবে না। আমি এখন যা বলি মন দিয়ে শোন। যারা কাছি ধরে ছিল তাদের বলল–আমি কাছি ধরে দুবার ঝাঁকুনি দিলেই কাছি ছাড়তে থাকবে, যতক্ষণ না আমি গহ্বরের একেবারে শেষে নেমে কাছিটায় আমার দুটো ঝাঁকুনি না দিই। যদি হীরের খণ্ডটা পাই, তাহলে সেটাকে কাছি দিয়ে বেঁধে কাছিটাতে আবার দুটো ঝাঁকুনি দেব। তখন তোমার কাছি টেনে তুলবে।
ফ্রান্সিস এক হাতে জ্বলন্ত মশাল নিয়ে কাছি বেয়ে নীচে নামতে লাগল। কিছুদূর নামতেই সেই গহ্বরের খাঁজটার কাছে এল। মশালের আলো পড়তে দেখল দুটো বিষধর সাপ সেই খাঁজটায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। এবার ফ্রান্সিস বুঝতে পারল। আগের লোকটা নিশ্চয়ই বিশ্রাম নিতে এখানে দাঁড়িয়েছিল। তখনই সাপ কামড়েছে। আর লোকটাও এই অতর্কিত আক্রমণে হকচকিয়ে নীচে পড়ে গেছে। ফ্রান্সিস হাতের মশালটা সেইখাঁজের ধুলোবালির মধ্যে পুঁতে দিল। এবার সাপ দুটোকে স্পষ্ট দেখা গেল। ফ্রান্সিস পা দুটো দিয়ে কাছিটা জড়িয়ে ধরল। কোমর থেকে তরোয়াল খুলল। তারপর একটা সাপের মাথার দিকে লক্ষ্য রেখে সজোরে তরোয়াল চালাল, সেই সাপের মাথাটা কেটে ছিটকে পড়ল। সাপের শরীরটা বারকয়েক নড়ে উঠল। তারপর আর নড়ল না। এবার আর একটা সাপ। সেই সাপটা কিন্তু বিপদ বুঝে পাহাড়ের ফাটলটার মধ্যে ঢুকে পড়ল। আর সাপটাকে দেখা গেল না। ফ্রান্সিস আবার কাছিটাতে দু’বার ঝাঁকুনি দিল, ওপর থেকে যারা কাছি ধরেছিল, তারা কাছি ছাড়তে লাগল। ফ্রান্সিস মশালটা ধুলোবালি থেকে তুলে নিয়ে আবার নামতে লাগল।
