গুহাটার ভিতরটা অন্ধকার। সন্তর্পণে কিছুটা এগোতেই ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল, একটা বিরাট গহ্বর নীচের দিকে নেমে গেছে। ওকে দাঁড়িয়ে পড়তেই দেখে পিছন থেকে একজন জিজ্ঞেস করল কী হল ফ্রান্সিস?
ফ্রান্সিস বলল–আর এগোনো যাবে না–সামনেই একটা গহ্বর।
সঙ্গীদের একজন জিজ্ঞেস করল–মকবুল কি তোমাকে এই গহ্বরের কথা বলেছিল?
–না।
–তাহলে?
একটু ভেবে ফ্রান্সিস বলল–মনে হচ্ছে, পাহাড়টায় ধ্বস নামার সময় হীরেটা বোধহয় এই গহ্বরেই পড়ে গেছে।
–এটা তো তোমার অনুমান–একজন সঙ্গী বলল।
–পরীক্ষা করলেই অনুমানটা সত্যি কিনা বোঝা যাবে।
–কী ভাবে পরীক্ষা করবে?
–আমি গহ্বরের মধ্যে নামব।
ফ্রান্সিসের সঙ্গীদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। তারা কেউই ফ্রান্সিসকে একা ছাড়তে রাজী–নয়। তারা বলল–তোমার সঙ্গে আমরাও নামবো।
ফ্রান্সিস বলল–সে হয় না। আমাদের সবাইকে সঙ্গে বিপদে পড়া চলবে না।
–কিন্তু তোমার একারও তো বিপদ ঘটতে পারে।
–একটা বিপদ তো কাল রাত্তিরে শেষ করেছি। বড় জোর আর একটা অজগর থাকতে পারে। ভয়ের কিছু নেই। তোমার কাছিটার একটা দিক পাথরের সঙ্গে বেঁধে দাও।
কাছিটা বাঁধা হল ফ্রান্সিস কাছিটা ধরে ঝুলে পড়ল। হাতে একটা মশাল জ্বেলে আস্তে-আস্তে গহ্বরের মধ্যে নামতে লাগল। চারিদিকে পাথরের চাই, তারই মধ্যে দিয়ে গহ্বরটা সুড়ঙ্গের মত নেমে গেছে।
বেশ কিছুটা নামবার পর পায়ের নীচে একটা পাথরের মতো কি যেন ঠেকল। জিনিসটার গা এবড়োখেবড়ো। ওটার ওপর দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিস মশালটা নীচে নামিয়ে আনল। আশ্চর্য! সেই অমসৃণ জিনিসটায় মশালের আলো পড়তে আলো ঠিকরে পড়ল। তাহলে এটাই মকবুলের হীরে। ফ্রান্সিস মশালটা এদিক-ওদিক ঘোরালো। ঠিকরে পড়া আলোর দ্যুতিও অন্ধকারে এদিক-ওদিক নড়তে লাগল। ফ্রান্সিস আনন্দে চীৎকার করে উঠল। সমস্ত গহ্বরটা সেই চীৎকারে প্রতিধ্বনিত হল। গহ্বরের মুখে দাঁড়ানো ফ্রান্সিসের বন্ধুরা চীৎকার করে সাড়া দিল।
এবার আসল কাজ। ফ্রান্সিস হীরেটার ওপর বসে একটু জিরিয়ে নিল। তারপর কাছিটা দিয়ে হীরেটাকে চারদিক থেকে বাঁধল। এই বাঁধার সময় ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল গহ্বরটা এখানেই শেষ হয়নি। হীরেটা আটকে আছে খাঁজের মত জায়গায়। তার পাশেই গহ্বরটা নেমে গেছে আরো নীচে। মশাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আন্দাজ করে দেখল মকবুল যত বড় হীরের কথা বলেছিল, এই হীরেটা ততো বড় নয়। তখনই ফ্রান্সিসের মনে হলো পাহাড়ের ধ্বস নামার সময় নিশ্চয়ই হীরেটা দু’টুকরো হয়ে গিয়েছিল। একটা টুকরো এখানকার খাঁজে আটকে আছে, অন্যটা এই গহ্বরের আরো নীচে পড়ে আছে। গহ্বরের জমাট অন্ধকারে নীচে আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না।
হীরেটা ভালো করে বেঁধে ফ্রান্সিস কাছি ধরে ধরে ওপরে উঠতে লাগল। একসময় গহ্বরের মুখে এসে উঠে দাঁড়াল। আনন্দে উত্তেজনায় ফ্রান্সিস তখন কথা বলতে পারছে না। বন্ধুদের সুসংবাদটা দেখার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতে গেল, তখনই পিঠে কে যেন তরোয়ালের ডগা চেপে দাঁতচাপা স্বরে বলল, চুপ করে দাঁড়ান আপনাদের বন্ধুদের মত।
ফ্রান্সিস আস্তে-আস্তে ঘুরে দাঁড়ালো। দেখল, ওর পিঠে তরোয়াল ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুর্গাধক্ষ্য হেনরী। তার সঙ্গে একদল সৈন্য। ফ্রান্সিস অবাক হয়ে গেল। দেখল ওদের বন্ধুদের সব গুহার একপাশে আটকে রাখা হয়েছে। তাদের তরোয়াল কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দু’একজনকে আহতও মনে হল। হেনরী ঠাট্টার সুরে বলল–এখানে নিশ্চয়ই কার্পেট বিক্রী করতে আসেননি? ফ্রান্সিস কোন কথা বলল না।
–বোধহয় ভাবছেন আমরা এখানে এলাম কি করে? খুবই সোজা উত্তর। আপনারাই পথ দেখিয়ে এনেছেন।
–আমরা? ফ্রান্সিস বিস্ময় সুরে বলল।
–হ্যাঁ–আপনাদের গাইডকে বলাই ছিল, সে যেন পথে চিহ্ন রেখে আসে–ও তাই করেছিল সুতরাং আপনাদের খুঁজে পেতে কোন অসুবিধা হয় নি।
ফ্রান্সিস এবার বুঝল, কেন গাইডটি গাছের ডাল কেটে রাখত, মাটিতে দা দিয়ে হিজিবিজি দাগ কাটত। ফ্রান্সিস বেশ কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল–আমাদের পিছু ধাওয়া করার মানে কি?
আপনাদের যাওয়ার কথা ছিল ওঙ্গালির বাজারে–কিন্তু এখানে এলেন কেন?
–আমরা যেখানে খুশী যেতে পারি।
–তা পারবেন। কিন্তু এত কষ্ট করে এখানে আসার নিশ্চয়ই কোন কারণ আছে। কিছুক্ষণ আগে আপনি গহ্বর থেকে আনন্দে চীৎকার করে উঠেছিলেন। আপনার বন্ধুরাও তাতে সাড়া দিয়েছিল। আমরা তখন গুহার মুখে আড়ালে দাঁড়িয়েছিলাম। আপনার এত আনন্দিত হওয়ার কারণটা জিজ্ঞেস করতে পারি কি?
–বেশ দেখুন, ফ্রান্সিস বলল।
হেনরী তার সৈন্যদের হুকুম দিল কাছিটা ধরে টেনে তুলতে।
ফ্রান্সিসদের বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–আপনারাও একটু সাহায্য করুন। সকলে মিলে কাছিটা টানতে লাগল। আস্তে-আস্তে কাছি-বাঁধা হীরেটা উঠে আসতে লাগল। যখন গুহার ওপর হীরেটা রাখা হল, তখন হেনরী হেসে বলল–এই পাথরটার জন্যে আপনাদের এত উল্লাস?
জিনিসটা সামান্য নয়–ফ্রান্সিস শান্ত স্বরে বলল–এটা একটা হীরের খণ্ড।
–বলেন কি! হেনরীর চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
ধ্বস নামার আগে এই পাহাড়ের এই গুহার মুখেই আলোর বিচিত্র খেলা দেখা যেত।
–হ্যাঁ, শুনেছি একটা পাহাড় আছে, লোকে বলে মায়াপাহাড়।
–এই পাহাড়ই এই মায়াপাহাড়। আর গুহার মুখেই আলোর বর্ণচ্ছটা দেখা যেত। বিস্ময়ে হেনরীর চোখ বড়-বড় হয়ে গেল। সে হীরেটার কাছে ছুটে গেল। হীরের অমসৃণ গায়ে হাত বুলোতে লাগল। কিন্তু তার মানে সন্দেহ থেকেই যায়। সে বলল আপনি কি করে জানলেন এটা হীরে?
