ওরা একটা ঘোড়ার পিঠে রুটির ঝুড়িটা রাখল। বিস্কো ঘোড়াটার পিঠে উঠে রুটির ঝুড়িটা ধরল। পেড্রো নিল জলের পীপেটা। ঘোড়ার পিঠে উঠে পীপেটা বাঁ হাতে চেপে ধরে ডানহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরে রইল। শাঙ্কো অন্য ঘোড়াটায় উঠল। রাঁধুনিকে ডাকল। রাঁধুনিদের একজন এলো। শাঙ্কো বলল-তরকারির কাঠের পাত্রটা তুলি দিতে। রাঁধুনি পাত্রটা শাঙ্কোর হাতে তুলে দিল।
তিনজনে খাবার আর জল নিয়ে অন্ধকারে সদর রাস্তা দিয়ে ঘোড়া চালিয়ে চলল।
কিছুক্ষণ চলার পর পেড্রো বলল–এভাবে চললে তো পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
–উপায় নেই। এর চেয়ে জোরে ঘোড়া ছোটালে সব ধাক্কা খেয়ে খেয়ে মাটিতে পড়ে যাবে। শাঙ্কো বলল।
–ঠিক আছে আস্তে আস্তেই চলা যাক। বিস্কো বলল।
ওরা ঘোড়ার গতি বাড়াল না। ঘোড়া চলল টুক টুক করে।
সেভিল্লা নগর শেষ হল। তখনই আকাশে চাঁদ দেখা গেল। জোছনা অনুজ্জ্বল। সামনেই টানা রাস্তা চলে গেছে। সবকিছুই অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
ওরা রাস্তা ধরে ঘোড়া চালাল। কিন্তু গতি বাড়াল ।
একটু দেরিই হল। শাঙ্কোরা সেই জঙ্গলের কাছে পৌঁছাল। ঘোড়া থেকে নামল। খাবার আর জলের পীপে নিয়ে ওরা বনে ডুল। খুব ঘন বন নয়। এখানে ওখানে অস্পষ্ট জোছনা পড়েছে।
হঠাৎ শাঙ্কো দাঁড়িয়ে পড়ল। বলল–নিঃশব্দে এগোলে বন্ধুরা আমাদের শত্রু ভাবতে পারে। কাজেই হ্যারির নাম ধরে ডেকে ডেকে এগোতে হবে।
তিনজন আবার চলল। শাঙ্কো গলা চড়িয়ে ডাকল–হ্যারি–হ্যারি। বিস্কোও ডাকল–হ্যারি। ডাকতে ডাকতে একটু পরেই হ্যারির ডাক শুনল-শাঙ্কো–তোমরা এদিকে এসো।
হ্যারির ডাক শুনে অন্ধকারে দিক আন্দাজ করে শাঙ্কোরা হ্যারিদের কাছে এলো। শাঙ্কো বলল–আগে সবাইকে জল খেতে দাও। জলের পীপেটা মাটিতে নামিয়ে কাঠের গ্লাসগুলো বিস্কো নিল। পীপের ছিপি খুলে গ্লাস গ্লাস জল সবাইকে দিতে লাগল। তৃষ্ণার্ত ভাইকিং বন্ধুরা জল খেয়ে যেন নতুন জীবন পেল। শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল–সবাই শুকনো পাতা নিয়ে এসো। পাতাগুলো একত্র করে থালার মতো বানাও। তারপর রুটি তরকারি নিয়ে খাও। সবাই জঙ্গলের এদিক-ওদিক গিয়ে শুকনো বড়োপাতা কুড়িয়ে আনল। লাইন দিয়ে বসল। হ্যারি বলল–শাঙ্কো তোমরাও খেতে বসো। আমি আর ফ্লেজার। তোমাদের খেতে দিচ্ছি। তোমরা এখন ক্লান্ত।
হ্যারি আর ফ্লেজার সবাইকে রুটি তরকারি দিতে লাগল। মারিয়া কিন্তু খেতে বসল না ক্ষুধার্ত ভাইকিং বন্ধুরা খেতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সকলের খাওয়া হয়ে গেল। রুটি তরকারি জল খেয়ে ভাইকিং বন্ধুরা তৃপ্ত হল। গায়ে নতুন শক্তি পেল যেন। এবার মারিয়া এগিয়ে এলো। বলল হ্যারি খেতে বসো। হ্যারি আর ফ্লেজার খেতে বসল। মারিয়া ওদের খাবার এগিয়ে দিল। দু’জন খেতে লাগল। দু’জনের খাওয়া হতে মারিয়া খেতে বসল।
খাবার ও জল খেয়ে পরিতৃপ্ত ভাইকিংরা ঘাসে ঢাকা মাটিতে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে সবাই ঘুমিয়ে পড়ল। শুধু হ্যারি জেগে রইল। ওর মন বলতে লাগল এখনও বিপদ কাটেনি। একজন সৈন্য পালিয়েছে। ও সেভিল্লা গিয়ে নিশ্চয়ই সেনাপতিকে সব কথা বলবে। সেনাপতি অনেক সৈন্য নিয়ে এই বনের ধারে চলে আসবে। দেখবে– দলপতি মারা গেছে আর দু’জন সৈন্য আহত হয়ে পড়ে আছে। সেনাপতি সবই বুঝবে। বনে ঢুকে ওদের তল্লাস করবে। ওদের পেলে সেনাপতি কোনো কথা শুনবে না। সঙ্গে সঙ্গে বন্দি করবে।
এসব ভাবতে ভাবতে হ্যারির একটু তন্দ্রা এসেছিল। তখনই বনের দক্ষিণ দিকে অনেক ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ পেল। জেগে থাকা হ্যারি চমকে উঠল। ডাকল–শাঙ্কো– বিস্কো। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় দেখল সবাই ঘুমিয়ে আছে।
শাঙ্কো বলল–আক্রমণ হবেই। ঘুম ভেঙে শাঙ্কো বিস্কো হ্যারির কাছে এলো। শাঙ্কো বলল–হ্যারি–আমি দক্ষিণদিকে যাচ্ছি। বনের আড়াল থেকে দেখে আসি– ঘোড়ায় চড়ে কারা আসছে।
-যাও–তবে খুব সাবধানে। হ্যারি বলল।
শাঙ্কো চলে গেল। হ্যারিদের কথাবার্তার শব্দে অনেকেরই ঘুম ভেঙে গেল। মারিয়া উঠে হ্যারির কাছে গেল। বলল–কী ব্যাপার হ্যারি?
কিছু অশ্বারোহী সৈন্য আসছে। এরা কারা জানি না। শাঙ্কো দেখতে গেছে। তবে আমার মনে হয় যে সৈন্যটি পালিয়ে গিয়েছিল সেই বোধহয় রাজার সেনাপতিকে সংবাদ দিয়েছে–আমরা লড়াইয়ে জিতেছি ওরা হেরে গেছে। আমাদের খোঁজে নিশ্চয়ই একদল অশ্বারোহী সৈন্য এসেছে।
–এখন কী করবে? মারিয়া বলল।
–দেখতে হবে–আমরা বনে আশ্রয় নিয়েছি এটা ওরা বুঝতে পেরেছে কিনা। হ্যারি বলল।
–যদি বুঝতে পারি? মারিয়া বলল।
–তাহলে আমরা টিলাটার মধ্যে যে গুহাটা আছে সেই গুহায় আশ্রয় নেব। গুহার মুখটা ছোটো। প্রায় হামা দিয়ে ঢুকতে হবে। তারপরে বেশ বড়ো। দাঁড়িয়ে থাকা যায়। হ্যারি বলল।
–তাহলে সেই গুহাতেই চলো। মারিয়া বলল।
–আগে শাঙ্কো ফিরে আসুক। ওর কাছে সবকিছু শুনি। তারপর গুহায় আশ্রয় নেবার কথা ভাববো। হ্যারি বলল।
ওদিকে গাছের আড়ালে আড়ালে চলে শাঙ্কো বনের দক্ষিণ দিকটায় এলো। ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ ঐ দিকেই শোনা যাচ্ছিল।
শাঙ্কো বনের গাছের আড়ালে দাঁড়াল। গাছের ফাঁকি লুকিয়ে দেখল কাছেই প্রায় পঞ্চাশ-ষাটজন ঘোড় সওয়ার সৈন্য ঘোড়া থেকে নামল।
অন্ধকারে কেটে যাচ্ছে। আকাশ সাদাটে হয়ে গেল। বনের গাছগাছালিতে পাখির ডাক শুরু হল।
