হ্যারিও বসল। শরীর ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে। হ্যারি হাত পা ছেড়ে শুয়ে পড়ল। এটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
তখনই হঠাৎ দেখল উত্তরদিকে কিছু গাছগাছালির পরেই একটা টিলামতো। হ্যারি উঠে পড়ল।ডাকল–ফ্লেজার। ফ্লেজার এগিয়ে এলো।হ্যারিবলল–দ্যাখো তোওটা কী? ফ্লেজারও অন্ধকারের মধ্যে উঁচু টিলামতো দেখল। বলল–মনে হচ্ছে টিলা। খুব বড়ো নয়।
–চলো তো–দেখে আসি। হ্যারি বলল।
–টিলা দেখে কী হবে। ফ্লেজার বলল।
ভুলে যেও না আমরা বন্দিদশা থেকে পালিয়েছি। এখনও আমাদের জীবন নিরাপদ নয়। প্রয়োজনে লুকিয়ে আশ্রয় নিতে পারি এমন জায়গা ওটা কিনা দেখতে হবে। চলো। হ্যারি বলল।
হ্যারি আর ফ্লেজার চলল টিলাটার দিকে। কাছে এসে অন্ধকারেও দেখল টিলাটা কালো ছায়ার মতো। ফ্লেজার দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টিলাটা দেখতে লাগল। হ্যারি টিলাটা চারদিক থেকে ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। পশ্চিম দিকে দেখল টিলাটার মধ্যে একটা ছোটোমুখ গুহার মতো। হ্যারি গুহামুখে এসে দাঁড়াল। দেখল ছোটো গুহামুখ দিয়ে একজন মানুষ হামা দিয়ে ঢুকতে পারে। কিন্তু কতদূর ঢুকে যেতে পারবে তা বোঝা যাচ্ছে না। হ্যারি বলল–ফ্লেজার-গুহার ভেতরে একটু যেতে পারবে?
–এটা না পারার কী আছে। ফ্লেজার বলল। তারপর এগিয়ে গেল গুহাটার দিকে। হামা দিয়ে গুহাটার ভেতরে ঢুকল। তখনই ঝটপট শব্দ তুলে একপাল চামচিকে গুহাটা থেকে বেরিয়ে এসে এদিক-ওদিক পালাতে লাগল। প্রথমে ফ্লেজার চমকে উঠল। পরক্ষণে একটু পিছিয়ে এসে গুহা মুখটা খোলা রাখল। চামচিকেগুলোরও বেরিয়ে আসতে অসুবিধে হল না।
এবার ফ্লেজার হামা দিয়ে ঢুকল। নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে হামা দিয়ে চলল। হঠাৎ ওর মনে হল এখন গুহাটা বড়ো লাগছে। ফ্লেজার উঠে দাঁড়াল। বুঝল গুহার মুখটাই ছোটো। ভেতরটা অনেক বড়ো।
নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে ফ্লেজার পাথুরে দেয়ালে হাত বুলোতে বুলোতে এগিয়ে চলল। হঠাৎ সামনে মনে হল নিরেট পাথর। ফ্লেজার হাত বাড়িয়ে দেখল এবড়ো খেবড়ো পাথরের দেয়াল যেন। ফ্লেজার বুঝল গুহাটা এখানেই শেষ।
ফ্লেজার ফিরে চলল। হামা দিয়ে গুহামুখ থেকে বের হল। তখন ও বেশ হাঁপাচ্ছে। হ্যারি এগিয়ে এলো। বলল–কী দেখলে?
–কিছুই না–একটা লম্বা বড়ো গুহা। মুখটা ছোটো হলে কি হবে ভেতরটা বেশ বড়ো। অনায়াসে হেঁটে এগোনো যায়। কিছুদূর গিয়ে গুহাপথ শেষ। সামনে নিরেট পাথুরে দেয়াল। ফ্লেজার বলল।
দু’জনে বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে বসল। বন্ধুরা জানতে চাইল হ্যারিরা কোথায় গিয়েছিল। হ্যারি টিলার কথা গুহার কথা বলল।
ওদিকে শাঙ্কো বিস্কো আর পেড্রো বড়ো রাস্তা ধরে ঘোড়ায় চড়ে চলল। কতকটা আন্দাজেই সেভিল্লানগরের দিকে চলল।
পাশে তিনটে গ্রাম পেল। বাড়িঘর ঘোর অন্ধকার। এসব গ্রামে একসঙ্গে অত খাবারদাবার পাওয়া যাবে না।
একসময় সেভিল্লানগরে এসে ওরা পৌঁছাল। নগরের নির্জন পথে পথে কোথাও কোথাও মশাল জ্বলছে। বাড়িঘরদোরে আলোর চিহ্নও নেই। সবাই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। শাঙ্কো একটা সরাইখানা খুঁজছিল। ওদের কপাল ভালো। একটা সরাইখানা পেল। সরাইখানার মধ্যে মোমবাতির আলো জ্বলছে।
ওরা সরাইখানার বন্ধ দরজার সামনে এসে ঘোড়া থেকে নামল। কাঠের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিল। দরজা খুলে গেল। মোমবাতির আলোয় দেখা গেল পাকা ও দাড়িগোঁফওয়ালা এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক এসে দাঁড়াল। শাঙ্কো এগিয়ে গেল। বলল দেখুন–আমরা খুব দূর থেকে আসছি। আমাদের বন্ধুরা সেভিল্লার বাইরে অপেক্ষা করছে। আমরা ক্ষুধার্ত তৃষ্ণার্ত পরিশ্রান্ত। আমাদের জন্যে কিছু খাবারের ব্যবস্থা করতে পারেন?
–নিশ্চয়ই পিরবো। আপনারা ভেতরে আসুন। প্রৌঢ় বলল। শাঙ্কোরা সরাইখানার মধ্যে ঢুকল। দেখল কয়েকজন লোক একতাল ময়দা ঠাসছে। রুটি হবে। এবার প্রৌঢ় বলল–আপনারা সংখ্যায় ক’জন?
ছাব্বিশ জন। বিস্কো বলল।
–ঠিক আছে। এই ময়দা দিয়ে কালকে সকালের জন্যে রুটি তৈরি হবে। এখন আমরা দোকানের সেই খাবার করবো না। আপনাদের জন্যে রুটি করে দেব। লোকটি বলল।
–রুটির সঙ্গে মাংস করে দিতে পারেন? বিস্কো বলল।
-মাংস রাঁধতে দেরি হবে। আপনারা ক্ষুধার্ত। বেশি দেরি করা চলবে না। আলু আর আনাজপত্র দিয়ে একটা খাবার করে দিচ্ছি। এটা খুব তাড়াতাড়ি হবে।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো বলল। তারপর তিনজনে টানা কাঠের বেঞ্চে বসল।
প্রথমে রাঁধুনিরা রুটি তৈরি করল। একটা বুনো লতা দিয়ে তৈরি বেশ বড়ো ঝুড়িতে রুটি রাখল। এবার আলু আনাজপত্র দিয়ে তরকারিমতো করল। শাঙ্কো এগিয়ে এলো। বলল তরকারির ঝোলটা কমাও। ঘোড়ার পিঠে করে নিয়ে যেতে হবে। চলুকে না পড়ে।
রাঁধুনিরা কিছুক্ষণ তরকারিটা ফুটিয়ে ঝোল কমিয়ে আনল।
এবার শাঙ্কো প্রৌঢ় দোকানির কাছে এলো। কোমরের ফেট্টি থেকে একটা স্বর্ণমুদ্রা বের করে প্রৌঢ় দোকানদারকে দিল। বলল–এবার আমাদের এক পীপে জল দিন। প্রৌঢ় রাঁধুনিকে বলল–এক পীপে জলের ব্যবস্থা কবো। একজন রাঁধুনি চলে গেল।
শাঙ্কো প্রৌঢ়কে বলল–ঐ রুটির ঝুড়ি তরকারি রাখার কাঠের পাত্র আর জলের পীপে–সব আমরা নিয়ে যাবো। ফেরৎ দিতে পারবো কিনা–বলতে পারছি না। তবে স্বর্ণমুদ্রা দিলাম। এতেই আপনার সবকিছুর দাম উঠে যাবে। প্রৌঢ় খুশির হাসি হাসল।
এবার রাঁধুনি জলভরা পীপে নিয়ে এলো। শাঙ্কোরা দোকানের বাইরে এলো।
