যুদ্ধ শেষ। এবার ফ্রান্সিস ওর বন্দুদের খুঁজে খুঁজে বের করে দুর্গের একটি ঘরে নিয়ে এলো। সবাই যুদ্ধ ক্লান্ত। অনেকেই শুকনো ঘাসের বিছানায় শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসের বিশ্রাম নেই। বন্ধুদের গুণে গুণে দেখল–তিনজন এখানো আসেনি। তারা যুদ্ধে মারা গেছে কিনা আহত হয়েছে সেই খোঁজে ফ্রান্সিস দুর্গের বাইরে এলো। নিহত আহত সৈন্যদের মধ্যে ফ্রান্সিস বন্ধুদের খুঁজতে লাগল। অনেক নিহত আহত সৈন্যদের মধ্যে খুঁজতে খুঁজতে এক আহত বন্ধুকে পেল। আহত বন্ধুটাকে তুলে দাঁড় করাল। দেখল বন্ধুটির পিঠে তলোয়ারের কোপ গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। ফ্রান্সিস ওকে বলল–তুমি একটু অপেক্ষা করো। আরো দু’জন বন্ধুর খোঁজ পাচ্ছি না। ওদের কী হয়েছে দেখি, তুমি ততক্ষণ এখানে অপেক্ষা করবো। আমিই তোমাকে দুর্গে নিয়ে যাবো। জাহাজ থেকে বৈদ্য ভেনকে এনে তোমার চিকিৎসা করাব। এই বলে আহত বন্ধুটিকে ওখানে বসিয়ে রেখে ফ্রান্সিস আর দু’জন বন্ধুকে খুঁজতে লাগল। কিছুক্ষণ যুদ্ধের জায়গায় ঘুরে ঘুরে ফ্রান্সিস দুই বন্ধুকে পেল। কিন্তু জীবিত বা আহত নয়। যুদ্ধে দু’জনেই মারা গেছে।
ফ্রান্সিসের গভীর দুঃখে চোখে জল এলো। এই বিদেশ বিভুইয়ে এসে বন্ধু দু’জন মারা গেল। দেশে ফিরে তাদের বাবা-মাকে অনেক কষ্টে শান্ত করতে হবে। ফ্রান্সিস ভাবল যুদ্ধে নামলে মৃত্যু হতেই পারে। এই নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই। বরং এখন কী কী কাজ করতে হবে সেটাই ভেবে নিল।
ফ্রান্সিস আহত বন্ধুটির কাছে ফিরে এলো। ওকে তুলে ধরে আস্তে আস্তে দুর্গের দিকে নিয়ে চলল। বন্ধুটির পিঠ থেকে তখনও চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে। বেশ কষ্ট করেই বন্ধুটিকে ফ্রান্সিস দুর্গে নিয়ে এলো। ওরা যে ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল সেই ঘরেই আহত বন্ধুটিকে রাখল। তারপর বিস্কোকে বলল–জাহাজ থেকে ভেন হ্যারি আর এ মারিয়াকে এখানে নিয়ে এসো। বিস্কো চলে গেল।
ফ্রান্সিস এবার বন্ধুদের বলল–আমাদের দুই বন্ধু যুদ্ধে মারা গেছে। কথাটা শুনে সব ভাইকিংরা নিজেদের মধ্যে কথা বলা বন্ধ করল। মাথা নিচু করে সবাই মৃত বন্ধু দু’জনের স্মৃতির প্রতি ভালোবাসা জানাল।
দুর্গের ডানদিকে একটু দূরে কবরখানা। বিকেলে আনগেভিন সেখানে এলো। যেসব সৈন্য যুদ্ধে মারা গেছে তাদের কবর দেওয়া হল। ফ্রান্সিস মারিয়া হ্যারি অন্য কিছু বন্ধু তাদের মৃত দুই বন্ধুর দেহও কবর দিল।
সন্ধে নামতেই সবাই দুর্গে ফিরে এলো। ওদের ঘরেই ফ্রান্সিসরা এলো। দেখল– বৈদ্য ভেন-এর ওষুধে আহত বন্ধুটি এখন অনেকটা ভালো হয়েছে।
একটু রাত হতে ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–হ্যারি আনগেভিনের নির্দেশ তো আমরা মেনেছি। যুদ্ধ করেছি। আনগেভিনকে সেকথা বলতে হবে–চলো।
বলবো যে যুদ্ধে জয়ও হয়েছে। এবার আমরা দেশের দিকে যাবো। সৈন্যদের জিজ্ঞেস করে দুর্গের সবচেয়ে ভালো ঘরটায় এলো। দেখল-আনগেভিন কয়েকজন অনুচরকে নিয়ে পাখির পালকে তৈরি বিছানায় বসে আছে। যুদ্ধজয়ের আনন্দে আনগেভিন মশগুল।
হ্যারি বলল–আনগেভিন–আপনি যুদ্ধে আমাদের সাহায্য চেয়েছিলেন। আমরা লড়াইতে অংশ নিয়েছি। আপনি সেন্ট অ্যাঞ্জেলো দুর্গ জয় করেছেন।
–হ্যা–তোমাদের সাহায্য আমাদের খুব কাজে লেগেছে। তোমাদের লড়াই করা তো দেখলাম। সত্যিই তোমরা দুঃসাহসী যোদ্ধা। আনগেভিন বলল।
হ্যারি বলল–যুদ্ধে আপনাকে সাহায্য করেছি। এবার আমরা আমাদের দেশের দিকে জাহাজ চালাতে চাই।
না–আনগেভিন বলল–এখনও আমরা রাজধানী ভ্যালেত্তা জয় করতে পারি নি। ভ্যালেত্তা জয় করা পর্যন্ত তোমাদের সাহায্য চাই।
–কিন্তু এসব তো আপনাদের দেশের ব্যাপার–আপনাদের দেশের সমস্যা। এসবের সঙ্গে আমাদের জড়াচ্ছেন কেন। এই যুদ্ধেই আমরা দুই বন্ধুকে হারিয়েছি। হ্যারি বলল।
–ও সব বুঝি না–ভ্যালেত্তা দখলের লড়াইয়ে তোমাদেরও থাকতে হবে। আমরা ভ্যালেত্তা জয় করবো। আমি মাল্টার রাজা হব। তখন তোমরা ছাড়া পাবে তার আগে নয়। আনগেভিন বলল।
হ্যারি একথা ফ্রান্সিসকে বলল। ফ্রান্সিস বলল–এখন আনগেভিনের কথা মানতেই হবে সময় সুযোগ বুঝে পালাবো আমরা। ফ্রান্সিস ওদের ভাষায় বললে।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি দুর্গের ঘরের দিকে এলো। সবাই এগিয়ে এলো কী হবে এখন জানতে। ফ্রান্সিস বলল, ভাইসব–আনগেভিন এখনই আমাদের মুক্তি দিতে রাজি নয়। রাজধানী ভ্যালেত্তা দখল না হওয়া পর্যন্ত আনগেভিনের সৈন্যবাহিনীর সঙ্গে আমাদের থাকতে হবে। লড়াইও করতে হবে।
–আমরা লড়াই করবোনা–আমরা দেশে ফিরে যাবো। শাঙ্কো বলল।কিছু ভাইকিং ও বন্ধু সেটা সমর্থনও করল। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো আনগেভিনকে এসব কথা আমরা না বলেছি। কিন্তু আনগেভিন আমাদের চলে যেতে দেবে না। ও কোনো কথাই শুনতে রাজি নয়।
–আমরা তো এখন বন্দি নই। গভীর রাতে জাহাজ নিয়ে পালাতে পারি। ফ্লেজার বলল। ফ্রান্সিস বলল–ফ্লেজার–এখন যুদ্ধ চলছে। আনগেভিনের সৈন্যরা রাত জেগে ওদের যুদ্ধ জাহাজ পাহারা দিচ্ছে। আমরা জাহাজে চড়ে পালাতে গেলে ওরা কামান দেগে আমাদের জাহাজ ধ্বংস করে দেবে। আমরা তাহলে অনেকেই মারা যাবো। যারা বেঁচে থাকবে তারাও দেশে ফিরে যেতে পারবেনা। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল– আমরা আমাদের অটুট জাহাজ নিয়ে পালাবো ঠিকই তবে সেটা সময় ও সুযোগ বুঝে।
