ফ্রান্সিস বলল–তা ঠিক– তবে দেশে ফিরে কী হবে। যা ঘটতে যাচ্ছে সেটাও একটা বিচিত্র অভিজ্ঞতা। আমরা চিন্তা শুধু একটাই–আমাদের কারো যেন প্রাণহানি না ঘটে।
সভা ভেঙে গেল।
বিকেলে ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে আনগেভিনের যুদ্ধ জাহাজে গেল। আনগেভিনের কেবিনঘরে বসেই ওরা কথা বলল। ফ্রান্সিস নিজেদের সম্মতির কথা জানাল। আরো বলল–আপনারা জয়ী হলেই আমরা কিন্তু দেশের দিকে জাহাজ চালাবো।
–ঠিক আছে। আমাদের লক্ষ্য যুদ্ধে জয়লাভ করা। আনগেভিন বলল।
সন্ধের পর থেকে আনগেভিন যুদ্ধ জাহাজ দুটি সামনে চলতে লাগল পেছনে ফ্রান্সিসদের জাহাজ।
পরদিন সকালে আনগেভিনের দূত হিসেবে একজন লোক এলো। হ্যারির সঙ্গে কথা বলল। হ্যারি ফ্রান্সিসকে বলল–আনগেভিন বলে পাঠিয়েছেন যে পঁচিশটি যুদ্ধাস্ত্র অর্থাৎ বর্ম ঢাল আর শিরস্ত্রাণ আমাদের দেবে। এর বেশি অস্ত্র ওদের মজুত নেই। আমাদের পঁচিশজনকে যেতে বলছে ওদের যুদ্ধ জাহাজে। যুদ্ধাস্ত্র আনতে।
চলো। আমরা নিশ্চইযাবো। এরকম যুদ্ধাস্ত্র ছাড়া তৃতীয় পিটারের সশস্ত্র সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করা যাবে না। তখনই ভাইকিং বন্ধুদের ফ্রান্সিস হ্যারিকে দিয়ে ডেকে পাঠাল। সবাই এলে বন্ধুদের থেকে চব্বিশজনকে বেছে নিল। তারপর দলবেঁধে চলল আনগেভিনের যুদ্ধ হাজাজে। যাবার সময় ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–তুমি লড়াইতে নামবে না। তুমি মারিয়ার সঙ্গে থাকবে।
ফ্রান্সিস বিস্কো শাঙ্কোসহ পঁচিশজন বর্ম শিরস্ত্রাণ ঢাল হাতে নিজেদের জাহাজে ফিরে এলো। এইসব যুদ্ধাস্ত্র পেয়ে সবাই খুশি। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল–হ্যারি তুমি বলে এসো যে আমাদের যে সববন্ধুরা যুদ্ধাস্ত্র পেল না তারা লড়াই করবে না। হ্যারি সেকথা আনগেভিনকে গিয়ে বলে এলো। আনগেভিন বলল–যুদ্ধ না করুক কিন্তু যুদ্ধরত সৈন্যদের সাহায্য করতে হবে। হ্যারি তাতে সম্মত হল।ফ্রান্সিসকে এসেবললও সেকথা। ফ্রান্সিস বলল ঠিক আছে।
পরদিন দুপুর নাগাদ নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপরে ওর বসার জায়গা থেকে চেঁচিয়ে বলল–ডাঙা দেখা যাচ্ছে–ডাঙা।
একটু পরেই আনগেভিন হ্যারিকে ডেকে পাঠাল। হ্যারি এলে বলল– আমরা মাল্টায় এসে গেছি। আমরা মাল্টার উত্তর দিকে নামবো। এখানেই আছে সেন্ট অ্যাঞ্জেলো দুর্গ। সেই দুর্গ আমরা পিটারের সৈন্যদের যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে দখল করবো। তোমার বন্ধুদের সৈন্যদের যুদ্ধের জন্যে তৈরি হতে বলো। তৈরি হয়ে তারা যেন আমাদের দুই জাহাজে চলে আসে। তোমাদের জাহাজ তো যুদ্ধ জাহাজ নয়। তোমাদের জাহাজ একটু দূরে থাকবে। হ্যারি জাহাজে ফিরে এসে সব ফ্রান্সিসকে বলল।
মাল্টার তীরভূমি দেখা গেল। তিনটি জাহাজই তীরভূমির কাছে এলো। দেখা গেল তীরভূমিতে পাথরের চাঁই নেই। প্রায় সমতল পাথুরে রাস্তামতো ঢালু হয়ে সমুদ্রে নেমে এসেছে। এতে সৈন্যদের চলাফেরার সুবিধেই হবে। যুদ্ধ জাহাজ থেকে তিরপর্যন্ত কাঠের পাটাতন পাতা হল।
আনগেভিনের নেতৃত্বে তার সৈন্যরা আর ফ্রান্সিসরা অস্ত্রসজ্জিত হয়ে পাতা কাঠের পাটাতন দিয়ে হেঁটে নেমে এলো। পাথুরে রাস্তামতো ঢালু জায়গা দিয়ে সকলেই উঠতে লাগল। রাজা তৃতীয় পিটারের কোনো সৈন্যের দেখা পাওয়া গেল না। খুশিতে আনগেভিনের সৈন্যরা তলোয়ার বর্শা উঁচিয়ে হৈ হৈ করে উঠল। ওরা ভেবেছিল যুদ্ধে নামতে হবে। অথচ দেখা গেল সমুদ্রতীরে রাজা পিটারের একটা সৈন্যও নেই।
ফ্রান্সিস একটু অবাকই হল যখন দেখল বিনা বাধায় ওরা এগিয়ে চলল। কিছুটা এগোতেই এবার একটা বড়ো দুর্গ দেখা গেল। পাথরের দুর্গার চারপাশ ঘিরে পাথুরে দেয়াল। আনগেভিন তার সৈন্যদের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল–সেন্ট অ্যাঞ্জেলা দুর্গ আমরা জয় করবো। সব সৈন্যরা হৈ হৈ করে উঠল। শূন্যে তলোয়ার ঘোরাল। বর্শা ওঠাতে নামাতে লাগল।
সামনে একটু উত্রাইমতো। সেটা পার হতেই দেখা গেল রাজা পিটারের সৈন্যরা দুর্গ-ঘেরা পাথুরে প্রাচীরের চারদিকে ছড়িয়ে আছে।
আনগেভিনের নেতৃত্বে সৈন্যদল এগিয়ে চলল দুর্গের দিকে। মাত্র হাত পঞ্চাশেক দূরে থাকতেই আনগেভিন চিৎকার করে হুকুম দিল–আক্রমণ করো। তার সৈন্যরা শূন্যে তলোয়ার ঘোরাতে ঘোরাতে অন্যদল বর্শা উঁচিয়ে দ্রুত ছুটে গিয়ে দুর্গরক্ষী সৈন্যদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফ্রান্সিসরাও তাদের পেছনে পেছনে ছুটে গেল। দুর্গের চারপাশ ভরে উঠল যুদ্ধরত সৈন্যদের অস্ত্রে ঝনঝনা রণহুংকার আর উৎসাহের ধ্বনিতে। তারপরই শোনা গেল আহতদের আর্ত চিৎকার।
লড়াই চলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখা গেল রাজা পিটারের সৈন্যদের সংখ্যা কমে গেছে। যারা তবু লড়াই করছিল তারা পিছু হটতে হটতে দুর্গের মধ্যে গিয়ে আশ্রয় নিল। আনগেভিনের সৈন্যদের হাতে দুর্গ পতনের মুখে। তীব্র লড়াই চলল। রাজা পিটারের সৈন্যরা এদিক-ওদিক ছুটে পালাতে লাগল। এতে আনগেভিনের সৈন্যদের ও যুদ্ধরত ভাইকিংদের উৎসাহ দ্বিগুণ হল। রাজা পিটারের সৈন্যদের বন্দি করা হতে লাগল। এবার দুর্গের ভেতের আশ্রয় নেয়া সৈন্যদের বন্দি করার জন্যে আনগেভিনের সৈন্যরা জলস্রোতের মতো দুর্গটায় ঢুকতে লাগল। দুর্গের মধ্যেও বেশ কিছুক্ষণ লড়াই চলল। তারপর পরাজিত রাজা পিটারের সৈন্যদের বন্দি করা হল। রাখা হল দুর্গের কয়েদঘরে।
