–পারবেন চুরি করতে? পারিসি বলল।
–সব ব্যবস্থা দেখবো তবেই বলা যাবে পারবো কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
কেরিনিয়া নগরের পথ দিয়ে ফ্রান্সিস আর পারিসি চলল। কিছুদূর যেতেই রাস্তার ধারে একটা বড়ো সরাইখানা পেল। দু’জনে ঢুকল। এখানে বিদেশি লোকের সংখ্যাই বেশি। ঐ সরাইখানার একটা ঘরে দু’জনে আশ্রয় নিল।
তখন বিকেল। ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল–পারিসি দুর্গে যাও। তুমি এই সাইপ্রাসের মানুষ। তোমাকে সন্দেহ করবে না। গীর্জায় প্রার্থনা করতে যাচ্ছো বললে কেউ বাধা দেবে না। গীর্জায় গিয়ে দেখবে নিওফিতসের তৈরি মূর্তিটা বেদীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিনা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে দেখলেই কাজে নামতে হবে। এবার দুর্গের গীর্জায় যাও। লক্ষ্য করো গীর্জায় তালা লাগানো হয় কি না।
পারিসি সরাইখানা থেকে বেরিয়ে দুর্গের গীর্জায় চলল। দুর্গোর সেই সদর দেউড়ির সামনে বেশি পাহারাদার নেই। পারিসি দরজা পার হল। একজন পাহারাদার জিজ্ঞেস করল–কোথায় যাচ্ছো?
–গীর্জায় প্রার্থনা করতে পারিসি বলল।
হু —-যাও। পাহারাদার আর কিছু বলল না।
গীর্জার ভেতরে তখন কিছু লোকজনের ভিড় রয়েছে। ভেতরে ঢোকার আগে পারিসি ভালো করে দরজার মোটা কড়াটা দেখল। না কোনো তালা ঝুলিয়ে রাখা হয়নি। তার মানে গীর্জাটার দরজা সারারাত খোলাই থাকে। এই গীর্জায় পরিসি আগেও দু’তিনবার এসেছে। দূর থেকেই দেখল অগের মূর্তিটা বেদীতে নেই। সেখানে নিওফিতসের হাতে তৈরি মূর্তিটা বসানো হয়েছে। পরিসি যা জানতে এসেছিল তা সবই জানা হয়ে গেল। পারিসি গীর্জার আরো ভেতরে না ঢুকে বাইরে বেরিয়ে এলো। চলল সরাইখানার দিকে।
ফ্রান্সিসকে সব বলল। ফ্রান্সিস খুশিতে লাফিয়ে উঠল। মূর্তিটা বেদীতে স্থাপন করা হয়েছে আর গীর্জার দরজায় তালা দেওয়া হয় না ভেজিয়ে রাখা হয়। এই দুটো তথ্য পেয়ে ফ্রান্সিস খুশি হল। বলল–পারিসি–আজ রাতেই হানা দিতে হবে।
দু’জনে সরাইখানায় ফিরে এলো। সারাদিন শুয়ে বসে সময় কাটাল। কখন রাত হবে। কখন রাত গম্ভীর হবে তার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল।
এক সময় সন্ধে হল। দু’জনে তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে নিল। এখন রাত গম্ভীর হওয়ার জন্য অপেক্ষা করা।
রাত বাড়তে লাগল। ফ্রান্সিস একসময় বলল–এবার চলো পারিসি।
দু’জনে সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এলো। পথঘাট অন্ধকারে ডুবে আছে। ফ্রান্সিস অন্ধকারই চাইছিল। চললদু’জনে। দু’চারবার জোরহাওয়া বয়ে গেল। ফ্রান্সিস আকাশের দিকে তাকাল। একটা তারাও দেখা গেল না। ঘন মেঘে আকাশ অন্ধকার।
দুর্গের কাছাকাছি আসতে প্রথমে ছুটে এলো প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস। তারপরই শুরু হল বৃষ্টি। অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়তে লাগল। দু’জনেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলল। সদর দেউড়ির দিকে যাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই পাহারাদার রয়েছে।
ফ্রান্সিস দুর্গের পেছন দিকে চলল। তখন প্রচণ্ড শব্দে বাজ পড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। দুর্গের পেছনে বিস্তৃত বন জঙ্গল। ফ্রান্সিস দুর্গের প্রাচীর দেখতে দেখতে চলল। দুর্গ প্রাচীর কোথাও ফাটল নেই। দেখতে দেখতে একটা জায়গা এলো। বিদ্যুতের আলোয় দেখল প্রাচীরের একটা চৌকোণো পাথর দেয়াল থেকে বেরিয়ে আছে। আবার বিদ্যুৎ চমকাল। দেখল দেয়ালের মাথার কাছে দুটো পাথর আলগা। ফ্রান্সিস ঠিক করল দুর্গে ঢুকতে হলে এখান দিয়েই ঢুকতে হবে। প্রচণ্ড ঝড়জলের মধ্যে ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–পারিসি–এখান দিয়েই দেয়াল ডিঙোতে হবে। ফ্রান্সিস এরকম ঝড়জলই চাইছিল। ও মনে মনে ঈশ্বরের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাল।
ফ্রান্সিস খুলে ঝুলতে থাকা চৌকোণো পাথরের টুকরোটা সরিয়ে নীচে ফেলল। জায়গাটায় খোঁদলমতোহল। সেটায় রেখে ফ্রন্সিস উঠে দাঁড়াল। বুকের কাছে একটা পাথরের পাটায় হাত দিয়ে বুঝল-নড়বড় করছে। ফ্রান্সিস দুতিনবার টানতেই পাটাটা খুলে এলো। ওটা নীচে ফেলে দিল। এবার সেই খোদলটায় পা রেখে প্রাচীরের মাথার কাছে একটা বেরিয়ে থাকা পাথরের পাটা টানাটানি করে বুঝল ওটা শক্ত আছে। ফ্রান্সিস ঐ পাটায় ঝুলে পড়ে এক ঝটকায় প্রাচীরের মাথায় উঠে বসল।
এতক্ষণে বৃষ্টি কমে এসেছে। হাওয়ার সেই তেজও আর নেই। ফ্রান্সিস প্রাচীরের গায়ে দুটো পাথরের পাটা আগা দেখল। ও তারই একটা ঠেলে দিল। যে খোদলমতো হল সেটাতে পা রেখে লাফ দিয়ে নেমে এলো। প্রাচীরের ওপাশে তো ঘন জঙ্গল। তাই এপাশের প্রাচীরের ধারে কাছে সেনাপতি ফেলকোর কোনো পাহারাদার সৈন্য নেই। অবশ্য এই ঝড়জলে কোনো পাহারাদারও এদিকে থাকতে আসেনি।
এতক্ষণে বৃষ্টি আরো কমে এসেছে। হাওয়ার দাপটও কমেছে।
পাথর বাঁধানো প্রাঙ্গণ দিয়ে মাথা নিচু করে ফ্রান্সিস ছুটে চলল গীর্জাটার দিকে। গীর্জাটা ঘুরে আসতে হবে গীর্জাটার দরজার কাছে। ফ্রান্সিস এবার সতর্ক দৃষ্টিতে চারদিকে তাকিয়ে দেখল–কোথাও মশাল জ্বলছে না। শুধু সৈন্যাবাসে মশাল জ্বলছে।
ফ্রান্সিস মাথা নিচু করে পাথরের প্রাঙ্গণটা পার হয়ে গীর্জার সদর দরজার কাছে। এলো। দেখল দরজায় দুটো বড়ো কড়া লাগানো কিন্তু তালা দেওয়া নেই। ফ্রান্সিস আস্তে দরজার একটা পাট খুলল। কচ্ কোঁচ্। অল্প শব্দ হল। ও গীর্জার ভেতরে ঢুকল। ভেতরে দু’পাশের পাথুরে দেওয়ালে দুটো নয় একটা মশাল জ্বলছে। বেদীতে কয়েকটা মোমবাতি জ্বলছে। সেই আলোয় যীশুখ্রীস্টের মূর্তিটা দেখা যাচ্ছে।
