ভোরবেলা। মারিয়ার জ্বর একটু কমল। কষ্টও একটু কমল।
হ্যারি বিস্কোকে ডেকে বলল–চলো–ভালো বৈদ্যের খোঁজে কেরিনিয়ায় নগরে আমাদের যেতে হবে।
–কিন্তু বৈদ্যের খোঁজ পাব কী করে? বিস্কো বলল।
-দেখি। যে ভদ্রলোকের বাড়িতে আমরা আশ্রয় নিয়েছিলাম তাকেই জিজ্ঞেস করবো। চলো। হ্যারি বলল।
ওরা দু’জন জাহাজের ডেক-এ উঠে এলো। হ্যারি দেখল–এখানে-ওখানে ভাইকিং বন্ধুরা দল বেঁধে বসে আছে। গতরাতে কেউই বোধহয় ঘুমোয় নি।
দু-একজন ভাইকিং বন্ধু হ্যারির কাছে এগিয়ে এলো। বলল–হ্যারি রাজকুমারী এখন কেমন আছেন?
–ভালো না–আমরা ভালো বৈদ্যের সন্ধানে যাচ্ছি।
হ্যারি আর রিস্কো জাহাজ থেকে নেমে এলো। মারিয়ার শিয়রের কাছে ভেন বসে রইল। মেঝেয় বসে রইল শাঙ্কো। ভাইকিং বন্ধুরা মাঝে মাঝে এসে খবর নিয়ে যাচ্ছে। মারিয়া তখন জ্বরে অজ্ঞান।
হ্যারি আর রিস্কো অ্যান্তিকের সামনে এলো। পেতলের কড়াটা দরজায় ঠুকে শব্দ করল। দরজা খুলে গেল।
অ্যান্তিকো দাঁড়িয়ে। বললেন কী ব্যাপার? হ্যারি বলল–আমাদের দেশের রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তার চিকিৎসার জন্যে একজন ভালো বৈদ্যের খোঁজ দিতে পারেন?
–আমি পেশায় বৈদ্য। তোমরা রাজকুমারীকে নিয়ে এসো। আমিই চিকিৎসা করবো। কোনো ভয় নেই। অ্যান্তিকো বললেন।
হ্যারি আর বিস্কো দু’জনেই নিশ্চিন্ত হল। খুশিও হল।
ওরা অ্যান্তিকোর বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো। হ্যারি বলল–বিস্কো একটা কৃকদের শস্যটানা গাড়ি জোগাড় করতে হবে।
দু’জনে বাজার এলোকায় এলো।খুঁজে খুঁজে একাট গাড়ি পেল। ভাড়া করল গাড়িটা। গাড়িট চেপে দু’জন জাহাজঘাটায় এলো। জাহাজে উঠল। কেবিনঘরে ঢুকে দেখল ভেন বসে আছে। ভেন বলল–বৈদ্যের খোঁজ পেলে?
–হ্যাঁ–হ্যারি বলল রাজকুমারীকে নিয়ে যাওয়া যাবে?
–হা–তবে সাবধানে গাড়ি করে নিয়ে যাবে। ভেন বলল।
–আমরা গাড়ির ব্যবস্থা করেছি। হ্যারি বলল।
তখন বেলা হয়েছে। হ্যারি মারিয়ার মুখের কাছে মুখ এনে বলল–রাজকুমারী ভালো চিকিৎসার জন্যে আপনাকে নিয়ে যাবো। গাড়িতে করে। একটু কষ্ট হবে। সহ্য করবেন।
বিস্কো বিছানার কাছে গেল। মারিয়ার পিঠে বাঁ হাতটা রাখল। ডান হাত পায়ের নীচে দিয়ে আস্তে আস্তে মারিয়াকে তুলে পাঁজাকোলা করল। আস্তে আস্তে কেবিনঘরের বাইরে নিয়ে এলো। সিঁড়ি দিয়ে ডেক-এ উঠে এলো। পেছনে হ্যারি।
মারিয়ার দুই চোখ বোজা। এবার মুখ থেকে গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল। মারিয়ার এই কষ্ট দেখে বিস্কোও সহ্য করতে পারছিল না। কিন্তু মারিয়াকে সম্পূর্ণ সুস্থ করার জন্যে মারিয়াকে তো এই কষ্ট মেনে নিতেই হবে।
বিস্কো মারিয়াকে নিয়ে জাহাজ থেকে জাহাজঘাটায় পেতে রাখা কাঠের তক্তায় উঠল। একজনের যাওয়ার জন্যে তক্তা। বিস্কো সাবধানে মারিয়াকে নিয়ে তক্তায় উঠল। তারপর পা টিপ টিপ করে তক্তার ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। তক্তা শেষ। বিস্কো জাহাজঘাটায় নামল। বিস্কোর আগেই হ্যারি এটা বড়ো মোটা কাপড় আর বালিশমতো নিয়ে এসেছিল। সেসব ঐ গাড়িতে আগেই পেতে রেখেছিল হ্যারি।
বিস্কোকে এত সন্তর্পণে মারিয়াকে আনতে হল যে বিস্কোর দু’হাত ধরে এলো। হাত দুটোয় ব্যথা করতে লাগল।
বিস্কো মারিয়াকে আস্তে আস্তে গাড়ির মধ্যে পাতা কাপড়ে শুইয়ে দিল। বালিশমতো পুঁটুলিটা মাথার নীচে দিল। মারিয়ার তখনও চোখ বোজা। গোঙানিটা কমেছে।
হ্যারি আর বিস্কো গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ির চালককে গাড়ি চালাতে বলল। ঘর ঘর শব্দ তুলে এক ঘোড়ায় টানা গাড়ি চলতে শুরু করল। গাড়ির ঝাঁকুনিতে মারিয়ার কষ্ট বাড়ল। মুখ থেকে জোরে গোঙানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। হ্যারি চালককে বলল–এমনভাবে গাড়ি চালাও যাতে ঝাঁকুনি কম হয়। চালক এবার আস্তে আস্তে চালাতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই গাড়ি অ্যান্তিকোর বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। হ্যারি গাড়ি থেকে নেমে দরজার পেতলের কড়াটা দরজায় ঠুকল। দরজা খুলে দাঁড়ালেন অ্যান্তিকোর স্ত্রী। বললেন–তোমরা রোগীকে এনেছো?
–হ্যাঁ। হ্যারি বলল।
–বাইরের ঘরে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দাও। ভদ্রমহিলা বললেন।
এবার হ্যারি আর বিস্কো দু’জনেই মারিয়াকে তুলে আস্তে আস্তে বাইরের ঘরে নিয়ে এলো। ঘরে লম্বা তক্তপোষমতো পাতা। ওপরে বিছানা পাতা। দু’জনে মারিয়াকে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিয়ে হ্যারি বাইরে এলো। চালকের দাম মেটাল। মোটা কাপড় আর বালিশ গাড়ি থেকে নিয়ে এলো। মারিয়ার মাথার নীচে বালিশটা দিয়ে দিল হ্যারি। মোট কাপড়টা একপাশে রাখল।
দু’জনে ঐ বিছানায় বসল। একটু পরেই অ্যান্তিকো এলেন। খুব মনোযোগ দিয়ে মারিয়াকে নানাভাবে পরীক্ষা করলেন। তারপর পাশে দাঁড়ানো স্ত্রীকে মৃদুস্বরে কিছু বললেন। স্ত্রী বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। একটু পরে একটি চিনেমাটির ছোটো বোয়াম নিয়ে এলেন। অ্যান্তিকো বোয়ামের মুখ খুলে আঙ্গুল ঢুকিয়ে কালো রঙের আঠামতো ওষুধ বের করলেন। মারিয়ার মুখ একটু খুলে ওষুধটা মুখে ঢুকিয়ে দিলেন। মারিয়ার চোখ মুখ কুঁচকে গেল। বোঝা গেল ওষুধটা তেতো। তবে মারিয়া ওষুধটা ফেলে দিল না। আস্তে আস্তে খেয়ে নিল।
অ্যান্তিকো বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বললেন– আজকের রাতটা কাটলেই উনি আস্তে আস্তে সুস্থ হবেন। এখন আপনারা চলে যেতে পারেন।হ্যারি বলল–আমরা দুপুরে একবার খেতে যাবো। তারপর দুপুরের পর থেকে সারারাত এখানেই থাকবো।
