একটা ঝুলন্ত কাঁচে-ঢাকা আলো জ্বলছে বাইরে। ঐ সামান্য আলোতেই দেখে দেখে ভেন-এর কেবিনঘরের দরজার সামনে মারিয়া এলো। দরজা খোলাই ছিল। মারিয়া কেবিনঘরে ঢুকে,ঢুকল–ভেন-ভেন। ভেন-এর ঘুম ভেঙে গেল।ও উঠে বসল। জিজ্ঞেস করল-কে? রাজকুমারী?
-হ্যাঁ। একবার এসো তো। একটু জ্বরমতো হয়েছে। মারিয়া বলল।
–সে কি! এই সেদিন অসুখ থেকে উঠলেন। ভেন বলল।
ঐ কেবিনঘরে বিস্কোও থাকে। বিস্কোর ঘুম ভেঙে গেল। বলল-রাজকুমারীর কী হয়েছে?
–একটু জ্বর হয়েছে–ওষুধ পড়লেই সেরে যাবে। মারিয়া বলল। বিস্কো বিছানা থেকে নেমে এলো। বলল–চলুন আপনাকে আমি নিয়ে যাচ্ছি–ভেনকে বলল ভেন–তুমি ওষুধ নিয়ে এসো।বিস্কো মারিয়াকেসঙ্গে নিয়ে চলল মারিয়ার কেবিনঘরের দিকে। এতক্ষণ মারিয়া শরীরের ব্যথা বেদনা মাথার অসহ্য যন্ত্রণা প্রবল জ্বর অনেক কষ্টে সহ্য করেছিল। আর পারল না। নিজের কেবিনঘরের দরজার কাছে এসে মাথা ঘুরে মেঝেয় পড়ে গেল। বিস্কো তো অবাক। সামান্য জ্বরে মারিয়া এতটা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ও মারিয়ার পিঠে হাত দিয়ে আস্তে আস্তে মারিয়াকে উঠে বসাল। তারপর মারিয়াকে পাঁজাকোলা করে তুলল। এইবার বিস্কো বুঝল–রাজকুমারীর শরীর প্রচণ্ড জ্বরে যেন পুড়ে যাচ্ছে। বিস্কো আস্তে আস্তে মারিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
মারিয়ার গলা থেকে ঘোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসতে লাগল।বিস্কো মারিয়ার মাথায় কপালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
ভেন ঢুকল। হাতের ওষুধের বোয়ামটা বিছানায় রাখল। মারিয়ার কপালে গলায় হাত রেখে জ্বরের তাপ দেখল। তারপর চোখ দেখল। হাতের নাড়ির গতি দেখল। তারপর মেঝেয় গিয়ে বসল। বোয়ামটা নিল। বোয়াম থেকে সবুজ রঙের আঠালো একটা ওষুধ বের করল। হাত দিয়ে চারটে বড়ি করল। বিস্কোকে বলল-জল এনে ওষুধের একটা বড়ি রাজকুমারীকে খাইয়ে দাও। বিস্কো কাঠের গ্লাসে জল এনে মারিয়াকে মৃদুস্বরে বলল রাজকুমারী এই ওষুধটা খেয়ে নিন। এটা খেলে কষ্ট কমবে। মারিয়া তখন প্রায় অজ্ঞানের মতো। বিস্কো বুঝল সেটা। তবুওষুধটা খাওয়াতে হবেই। বিস্কো মারিয়ার পিঠে হাত রেখে মাথাটা উঁচু করল। জলের গ্লাস থেকে মুখে জল ঢালল। মারিয়া জল খেল। বিস্কো এবার একটা বড়ি খাইয়ে দিল। তারপর মারিয়াকে শুইয়ে দিল।
বিস্কো ভেনকে বলল-ভেন তুমি চলে যেও না। ভেন বলল–আমাকে এখানে সারারাতই জেগে থাকতে হবে।
–আমি হ্যারিকে ডেকে আনছি। বিস্কো বলল। তারপর দ্রুত পায়ে কেবিনঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
একটু পরেই হ্যারি এলো। সঙ্গে শাঙ্কো। হ্যারি এগিয়ে গিয়ে মারিয়ার কপালে হাত রাখল। গলায় হাত রাখল। বলল–ভেনজুর খুব বেশি–তাই না?
ভেন বলল– হা। ওষুধ দিয়েছি। জ্বর কমবে।
ভেন বিছানায় বসল। মাঝে মাঝে মারিয়ার কপালে হাত দিয়ে দেখতে লাগল। হ্যারিরা মেঝেয় বসে রইল। হ্যারি ভাবছিল এই বিপদের সময় ফ্রান্সিস নেই। ফ্রান্সিস থাকলে মনে অনেক জোর পাওয়া যেত।
ততক্ষণে ভাইকিংরা খবর পেয়েছে রাজকুমারী ভীষণ অসুস্থ। ওরা কেবিনঘরের বাইরে ভিড় করল।
শেষ রাতের দিকে মারিয়াকে পরীক্ষা করে ভেন বলল–হ্যারি-জ্বর অনেকটা কমেছে। হ্যারি মারিয়ার কপালে হাত রাখল। হ্যাঁজুর অনেক কম।
ভোর হল। ভেন আর হ্যারিরা তখনও বসে আছে। রাতে কেউ আর ঘুমোয় নি।
হ্যারি ভেনকে বলল–তোমার কি মনে হয় এই ওষুধেই রাজকুমারী সুস্থ হবেন?
–ঠিক বলতে পারছি না। কয়েকদিন যাক–তখন বলতে পারবো। ভেন বলল।
বিকেল হতেই মারিয়ার আবার জ্বর এলো। জ্বর বাড়তে লাগল। জ্বর এত বাড়ল যে মারিয়া প্রায় অজ্ঞানের মতো হয়ে গেল। হ্যারি ভেনকে ডেকে নিয়ে এলো। ভেন মারিয়ার কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। ভেন-এর মুখ চিন্তাকুল হল।
ভেন মেঝেয় বসল। যে ঝোলাটা এনেছিল সেটা থেকে একটা শুকনো শেকড় বের করল। তারপর বের করল দুটো পাথর। বিস্কোকে জল আনতে বলল। বিস্কো কাঠের গ্লাশে জল ভরে দিল। ভেন শেকড়টা কিছুক্ষণ জলে ভিজিয়ে রাখল। তারপর শেকড়টা একটা পাথরের ওপর রাখল। অন্য পাথরটা দিয়ে শেকড়টা ঘষতে লাগল। হলুদ রঙের রস বেরোতে লাগল। সেই রসটা কাঠের গ্লাশের জলের সঙ্গে মেশাল। হ্যারিকে বলল–হলুদ জলটুকু রাজকুমারীকে খাইয়ে দাও।
হ্যারি সবধানে মারিয়ার মাথাটা দু’হাতে তুলে ধরল। আস্তে আস্তে মারিয়াকে ওঠাতে ওঠাতে বলল–রাজকুমারী–কষ্ট করে ওষুধটা খেয়ে নিন। মারিয়া দু’একবার দম নিয়ে ওষুধটা খেল। হ্যারি সাবধানে বিছানায় শুইয়ে দিল। এবার জ্বর কমে কিনা তার। জন্য প্রতীক্ষা করা।
সন্ধে হল। রাত বাড়তে লাগল। ভেন মাঝে মাঝেই মারিয়ার গলায় কপালে হাত দিয়ে জ্বর বাড়ছে না কমছে তা দেখতে লাগল।
একসময় ভেন হ্যারিকে বলল–আমি এখানে আছি। তোমরা গিয়ে খেয়ে এসো। হ্যারিরা খেতে গেল। কিন্তু কেউই বেশি খেতে পারল না।
ওরা কেবিনঘরে ফিরে এলো।
হ্যারিরা মেঝেয় বসে রইল। কারো চোখেই ঘুম নেই।
শেষ রাতের দিকে মারিয়ার শরীর আরো খারাপ হল। জ্বর এত বাড়ল যে মারিয়া অজ্ঞান হয়ে গেল।
ভেন মারিয়ার চোখ দেখল। কপালে গলায় হাত দিয়ে দেখল। পা ও হাত চেপে দেখল। মৃদুগলায় ডাকল–হ্যারি। হ্যারির একটু তন্দ্রামতো এসেছিল। ডাক কানে যেতেই ও দ্রুত ভেন-এর কাছে এলো। ভেন বলল–হ্যারি আমার জ্ঞান বুদ্ধিমতো চিকিৎসা আমি করেছি। আমার আর কিছু করার নেই। এখন কেরনিয়া নগরে ভালো বৈদ্যের খোঁজ কর। তাকে দেখাও। এছাড়া আর কিছু করার নেই।
