এবার নিশ্চিন্ত হয়ে গাড়িতে উঠল দু’জনে। গাড়ি চলল রাজধানী নিকোশিয়ার দিকে।
ওদিকে ফ্রান্সিস আর পারিসি পালিয়ে গেছে বলে হ্যারিদের সবাইয়ের হাত বেঁধে দেওয়া হলো। হাত-বাঁধা অবস্থাতেই খাওয়া শোওয়া।
সেদিন বিকেলে ডঠাং ঢং করে কয়েদখানার লোহার দরজা খুলে গেল। ভাইকিংরা একটু আশ্চর্যই হলো। এ সময় তো দরজা খোলা হয় না।
দরজা দিয়ে ঢুকল আল জাহিরি। সঙ্গে এক রোগা লিকলিকে আরবী। বেশ ফর্সা। চিবুকে ছাঁটা দাড়ি। মাথায় লাল ফেজ টুপি পরা। দু’জন পাহারাদারকে আল জাহিরি কী বলল। তারা মারিয়ার কাছে এলো। মারিয়ার হাত ধরল। মারিয়া এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিল। এবার হ্যারিরা বুঝতে পারল মারিয়াকে ক্রীতদাসীর মতো ঐ শুটকো লোকটার কাছে বিক্রি করা হবে। হ্যারি সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল– ও-হো-হো। সঙ্গে সঙ্গে সব ভাইকিং বন্ধুরা উঠে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল। ও-হো-হো৷ পাহারাদার দু’জন বেশ ঘাবড়ে গেল। কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। আল জাহিরি দেখল এসব। তারপর ইঙ্গিতে হ্যারিকেডাকল। ঐ শুটকো লোকটা বোধহয় গ্রীক আর আরবী ভাষা জানে। অন্য ভাষা জানে না। তাই হ্যারিকে ডাকল আল জাহিরি।
হ্যারি এগিয়ে গিয়ে আল জাহিরির সামনে দাঁড়াল। আল জাহিরি বলল, আজ হোক, কাল হোক, তোমাদের সবাইকে বিক্রি করা হবে। তবে তোমরা বাধা দিচ্ছো কেন?
হ্যারি বলল, শুধু রাজকুমারীকে আমরা বিক্রি করতে দেব না। আমাদের সবাইকে যেদিন বিক্রি করবেন সেইদিন রাজকুমারীকে বিক্রি করতে পারবেন। তার আগে নয়। আল জাহিরি হেসে বলল, ভালো দামে বিক্রি হতো।
সে তো আপনার কেঠো হাসি দেখেই বুঝতে পারছি। হ্যারি বলল।
আল জাহিরি ব্যবসাদার। বুঝল–এত তাড়াহুড়ো করতে গেলে ঝামেলায় পড়তে হবে। ওর দরকার হ্যারিদের আর মারিয়াকে বিক্রি করা। সময় সুযোগ মতো সেটা করতে হবে। দু’চারজনকে অন্য কয়েদখানায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এই অজুহাত দেখিয়ে দফায় দফায় নিয়ে বিক্রি করতে হবে। ভাইকিংদের সংখ্যাও কমে আসবে। তখন রাজকুমারীকে বিক্রি করা হবে। কারণ তখন বাধা দেওয়ার মতো ভাইকিংরা খুব কম থাকবে। সহজেই সব মিটে যাবে।
সেই শুটকো মতো লোকটাকে কী বোঝাতে বোঝাতে আল জাহিরি চলে গেল।
সেদিন একটু বেলায় কয়েদঘরের দরজা ঢং ডঠাংশব্দে খুলে গেল। সৈন্যরা কয়েদঘরে ঢুকতে লাগল। সকলের হাত দড়ি দিয়ে বাঁধতে লাগল। মারিয়াও বাদ গেল না। তারপর আট-দশজন সৈন্য খোলা তলোয়ার হাতে ওপরে ডেক-এ ওঠার সিঁড়ির কাছে দাঁড়াল। পাহারাদাররা হ্যারিকে বলল, সবাইকে বলো–ডেক-এ উঠতে হবে। হ্যারি গলা চড়িয়ে সেই কথাই সবাইকে বলল। ফ্রান্সিসের ভাইকিং বন্ধুরা একে একে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল।
প্রায় অন্ধকার কয়েদঘর থেকে বাইরের আলোয় আসতেই সবাই কিছুক্ষণ তাকাতেই পারল না। এই অভিজ্ঞতা ফ্রান্সিস আর বন্ধুদের আছে, কিন্তু মারিয়ার এই অভিজ্ঞতা নেই। মারিয়া বলে উঠল, আমি যে তাকাতেই পারছি না।
হ্যারি বলল, রাজকুমারী কিছুক্ষণের মধ্যে সব ঠিক হয়ে যাবে। সত্যিই তাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরের আলোর তীব্রতা মারিয়ার চোখে সয়ে গেল। ক্যারাভেল থেকে কাঠের পাটাতন ফেলা হয়েছে। পাটাতন দিয়ে হেঁটে হেঁটে সবাই নেমে এলো। সৈন্যদল ওদের ঘিরে নিয়ে চলল। যেখানে হ্যারিদের নামানো হলো সেখান থেকে কেরিনিয়া বন্দর বেশ দূরে।
কেরিনিয়া বন্দরে তখন ব্যস্ততা। বেশ কয়েকটি নানা দেশের জাহাজ ভেড়ানো আছে। দু’একটা জাহাজ বন্দর ছেড়ে চলে যাচ্ছে। হ্যারিরা যেখানে নামল সেখানটায় দেখল দুতিনটে লম্বাটে ঘর। ঘরগুলোর মাথায় শুকনো ঘাস আর পাতার ছাউনি। কাফ্রি আরবী গ্রীক পাহারাদার সৈন্যরা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এরা সবাই ঐ তিনটি কয়েদঘরের পাহারাদার।
ভাইকিংদের নিয়ে আসা হলো মাঝখানের ঘরটার সামনে। লোহার গরাদ লাগানো দরজা। দু’জন পাহারাদার তালা খুলে ঢং ডটাং শব্দে লোহার দরজা খুলল। ওদের সেই ঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হলো। শব্দ তুলে দরজা বন্ধ করা হলো।
এই পাথরগাঁথা কয়েদঘরে ওপরের দিকে গরাদ দেওয়া দু’টো জানালা। এই দিনের বেলাও মশাল জ্বলছে। মেঝেয় শুকনো ঘাস লতাপাতা দড়ি দিয়ে বেঁধে শক্ত করা বিছানা মতো।
যীশুর কাঠের মূর্তি ভাইকিংরা কেউ বসল, কেউ শুয়ে পড়ল, কেউ কেউ পায়চারি করতে লাগল।
হ্যারি কয়েদঘরের কাঠের দেয়ালে ঠেস দিয়ে পা ছড়িয়ে বসেছিল। মাথায় নানান চিন্তা। ফ্রান্সিস আর পারিসি তো পালাল। ওরা নির্বিঘ্নেই পালিয়েছে। কিন্তু ওরা কী করে হ্যারিদের মুক্ত করতে পারবে সেটাই চিন্তার। হ্যারিদের একমাত্র সান্ত্বনা ফ্রান্সিস বাইরে আছে। ও মুক্ত। একটা কিছু উপায় ফ্রান্সিস নিশ্চয়ই বুদ্ধি করে বের করবে। ওদিকে শাঙ্কো ভাবল–সে একা পালাবে। ক্রীতদাসের হাটে হ্যারিদের বিক্রি করার আগেই সবাইকে মুক্ত করতে হবে। এই নিয়ে শাঙ্কো ভাবতে লাগল। শেষ পর্যন্ত স্থির করল পালাতে হবে। ও হ্যারির কাছে গিয়ে বসল। মৃদুস্বরে বলল–হ্যারি আমি পালাবো।
–কী করে? হ্যারি একটু আশ্চর্য হয়েই বলল।
–সেসব আমার ভাবা হয়ে গেছে। শাঙ্কো বলল।
–শাঙ্কো ভেবেচিন্তে পা ফেলো–হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস আর পারিসি পালিয়েছে। ফ্রান্সিস আমাদের মুক্তির একটা কিছু ব্যবস্থা করবেই। তার আগে তুমি পালাতে যেও না। তোমার যদি কোনো বিপদ হয় ফ্রান্সিস রাগ করবে আমাদের ওপর। কেন আমরা তোমাকে বাধা দিই নি এই জন্যে। শাঙ্কো বলল–
