হঠাৎ ফ্রান্সিস ভেজানো লোহার দরজাটা দ্রুত হাতে খুলে বাইরে চলে এলো। পেছনে পারিসি। আচমকা এই ঘটনায় দরজার কাছে দাঁড়ানো দুই পাহারাদার হতবাক। ওর মধ্যে একজন ফ্রান্সিসের দিকে ছুটে এলো। ও কোমর থেকে তলোয়ার খুলছে তখনি ফ্রান্সিস ওর বুকে লাথি মারল। পাহারাদার ছিটকে কয়েদঘরের মেঝেয় পড়ে গেল। হাত থেকে তলোয়ার ছিটকে গেল। অন্য পাহারাদারটি কাছে আসার আগেই ফ্রান্সিস কাঠের থালা ছুঁড়ে মারল কাঁচে ঢাকা বাতিটার দিকে। কাঁচে ঢাকা বাতি ভেঙে চৌচির। অন্ধকার হয়ে গেল জায়গাটা। পাহারাদার অন্ধকারে ফ্রান্সিসদের দেখতে পেল না। পারিসির হাত ধরে ফ্রান্সিস ছুটল সিঁড়ির দিকে। কয়েদঘরের পাহারাদাররা চিৎকার চাঁচামেচি করতে লাগল। কিন্তু সেই শব্দ ওপরে ডেক পর্যন্ত এলো না। কাজেই ডেক এ দাঁড়ানো সৈন্যরা কিছুই বুঝল না।
সিঁড়ি দিয়ে যত দ্রুত সম্ভব ফ্রান্সিস পারিসিকে নিয়ে উঠ এলো ডেক-এ। ডেক এর সৈন্যদের দু’একজনের হাতে তলোয়ার। বাকিরা গল্পগুজব করছে। ফ্রান্সিস আর পারিসিকে, সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসতে দেখে দু’একজন সৈন্য ছুটে এলো। সৈন্যরা কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস পারিসির হাত ধরে বলল, আমার সঙ্গে লাফ দাও। দু’জনে একসঙ্গে লাফ দিয়ে রেলিং ডিঙিয়ে ঝপাৎ করে সমুদ্রের জলে পড়ল।
সব সৈন্য পাহারাদাররা ডেক-এর ধারে এসে রেলিং ধরে চিৎকার চাঁচামেচি করতে লাগল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস আর পারিসি ওদের ধরাছোঁয়ার বাইরে।
ফ্রান্সিস আর পারিসি ডুব সাঁতার দিয়ে বেশ কিছুটা গিয়ে আস্তে আস্তে জলের ওপর মাথা তুলল। পেছনে তাকিয়ে দেখল ক্যারাভেল-এর ডেক-এ আল জাহিরি এসে দাঁড়িয়েছে।
ফ্রান্সিস পারিসিকে বলল, কোনোরকম শব্দ না করে আস্তে আস্তে সাঁতার কেটে চলো। একটু দূরে গিয়ে আমরা সমুদ্রতীরে উঠবো। দু’জনেই আস্তে আস্তে সাঁতার কেটে চলল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তীরে পৌঁছল। পেছল পাথর বালির ওপর দিয়ে হেঁটে এসে তীরে উঠল। মাথার জল ঝাড়তে ঝাড়তে ফ্রান্সিস বলল, পারিসি,এই জলেভেজা অবস্থায় কোথাও একটু একটু আশ্রয় তো নিতে হবে।
কিছু ভাববেন না। আমার বাড়িটা তো আছে। পারিসি বলল।
তোমার বাড়িতে কে আছে? ফ্রান্সিস বলল।
আমার বুড়ি মা। তবে বেশ কয়েক মাস তো আমি বাইরে বাইরে। মা’র কী অবস্থা জানি না। পারিসি বলল।
চলো তো। একটা মাথা গোঁজার আস্তানা পেলেই হলো। ফ্রান্সিস বলল।
কেরিনিয়া বন্দুর-শহরের রাস্তা দিয়ে ওরা চলল। রাত হয়েছে। রাস্তা নির্জন। রাস্তার এখানে-ওখানে মশাল জ্বলছে। বাড়িঘর অন্ধকারে ডুবে আছে। সবাই ঘুমুচ্ছে বোধহয়।
প্রায় আধঘণ্টার ওপর হাঁটতে হাঁটতে ওরা পারিসির বাড়ির দোরগোড়ায় এলো। পারিসি দরজার শেকলটা দরজায় ঠুকতে ঠুকতে ডাকল–মা, মা। বারকয়েক ডাকার পর সাড়া পাওয়া গেল। বুড়ির ভাঙা গলায় কেউ বলছে–কে রে?
আমি পারিসি–মা দরজা খুলে দাও। পারিসি বলল। ঠক্ ঠক্ শব্দে কাঠের দরজা খুলল। মোমবাতি হাতে একজন বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। পারিসিকে দেখে ফোকলা দাঁতে হাসল। বলল, তুই কী করেছিস? রাজার সৈন্যরা তোর খোঁজে তিন-চার দিন এসেছিল।
ওসব নিয়ে ভেবো না। আমি অন্যায় কিছু করিনি। পারিসি বলল। ফ্রান্সিস, পারিসি আর ওর মার কথা গ্রীক ভাষায় বলে কিছুই বুঝছিল না। পারিসি ফ্রান্সিসকে বুঝিয়ে বলল। তারপর মাকে বলল–আমার এক বিদেশি বন্ধু এসেছে। আমাদের কিছু খেতে দাও।
এত রাতে, কী দেব। ভালো পিঠে আছে–খাবি? মা বলল।
কেন খাবো না। চলো ভেতরে। খেতে দাও। পারিসি বলল। ফ্রান্সিস আর পারিসি তো আধপেটা খেয়েই পালিয়েছিলে। কাজেই যখন একটা মাটির থালায় পরিসির মা পিঠে খেতে দিল তখন দু’জনেই হাপুস হুপুস করে খেয়ে নিল। জলটল খেয়ে এতক্ষণে ওদের স্বস্তি হলো। দু’জনে ভেজা পোশাক পালটাল। তারপর ঐ ঘরেই দু’জনে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। একটু পরে ঘুমিয়ে পড়ল।
সকালে ফ্রান্সিস বলল, পারিসি-বর্তমান শাসক গী দ্য লুসিগনানের সঙ্গে আমাকে দেখা করতে হবে। তুমি এই সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করো।
মুশকিল হয়েছে যে আমি তো জেরস পাহাড় থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম। আমাকে পেয়ে কয়েদখানায় পাঠাবে। পারিসি বলল।
ঠিক আছে–ফ্রান্সিস বলল, আমাকে সঙ্গে নিয়ে তুমি রাজসভায় চলো। তোমাকে যাতে কোনো ঝামেলা পোহাতে না হয় সে ব্যবস্থা আমি করবো।
আমাদের তো রাজধানী নিকোশিয়ায় যেতে হবে। পারিসি বলল।
তাই চলো। তুমি একাট চাষীদের শস্যটানা গাড়ির ব্যবস্থা করো। ফ্রান্সিস বলল।
দেখি। পারিসি এই কথা বলে বেরিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে পারিসিফিরে এলো। বলল–গাড়ি পেয়েছি। কিন্তু এতদূর পথ যেতে অর্ধ স্বর্ণমুদ্রার অর্থ চাইছে। ফ্রান্সি বলল, পারিসি, তোমার জানাশুনো কোনো স্বর্ণকার আছে?
তা আছে। পারিসি বলল।
তাহলে গাড়িতে চড়ে আগে সেখানে চলো। আমার বিয়ের আংটিটা বন্ধক রেখে স্বর্ণমুদ্রার অর্থ নেব। গাড়িভাড়া দেব। ফ্রান্সিস বলল।
পারিসির মা’র হাতে তৈরি আরো পিঠে খেল দু’জনে। বাড়িতে তৈরি এত সুস্বাদু পিঠে ফ্রান্সিস যে কতদিন খায়নি। পিঠে খেতে খেতে ফ্রান্সিসের বারবার মা’র কথা মনে পড়তে লাগল।
ওরা চাষীর গাড়িতে চড়ে বসল। পথে এক স্বর্ণকারের দোকানে ঢুকল ওরা। পারিসির পরিচিত দোকানদার। আংটি বন্ধক রেখে কিছু স্বর্ণমুদ্রা দিল। ফ্রান্সিস বারবার বলল, আমি কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়িয়ে নিয়ে যাব। এর মধ্যে সোনার আংটিটা গালিয়ে ফেলবেন না কিন্তু। দোকানদার মাথা নেড়ে বলল, না–না। অন্তত বছর খানেকের আগে আমরা বন্ধকী জিনিস গলাই না।
