মারিয়া খুশির চোটে হাততালি দিল। বলল–ফ্রান্সিস, চলো না?
–যাবে তো! কিন্তু লুপাকা কি তোমাকে ওখানে যাবার অনুমতি দেবে? ফ্রান্সিস বলল?
–কেন দেবেনা? আমি তো আর পালিয়ে যাচ্ছি না। মারিয়া বলল।
–ঠিক আছে। মেস্তিজো কখন আরম্ভ হবে উৎসব? ফ্রান্সিস বলল।
–একটু রাতে। আমরা খেয়ে-দেয়ে যাবো। উৎসব বেশ কিছুক্ষণ চলবে। মেস্তিজো বলল
–তাহলে এক কাজ করো মেস্তিজো। তুমি মারিয়াকে নিয়ে রাজা লুপাকার কাছে যাও। রাজাকে বললো যেন মারিয়াকে উৎসবে যেতে অনুমতি দেয়। অবশ্য সঙ্গে পাহরাদার থাকবে। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি বলে। মেস্তিজো ঘাসের বিছানা ছেড়ে উঠল। মারিয়াকে নিয়ে রাজবাড়িতে গেল।
ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যেই মেস্তিজো ফিরে এল মারিয়াকে নিয়ে। সঙ্গে সেই দুজন চিমু পাহারাদার। হেসে বলল–রাজা লুপাকার মেজাজ এখন খুব ভালো। চিকামার গন্যমান্য উনকারা নাকি দল বেঁধে রাজারানীকে উৎসবে আসার জন্য নিমন্ত্রণ করে গেছে। কাজেই অনুমতি বলার সঙ্গে সঙ্গেই পাওয়া গেছে।
রাতের খাওয়া-দাওয়া সারল ফ্রান্সিসরা। মারিয়া পাহারাদার সৈন্য দুজনও ওদের সঙ্গে খেল।
একটু রাত হতেই সবাই চলল উৎসবের প্রাঙ্গণের দিকে। ফ্রান্সিস উপহার পাওয়া পঞ্চো পরল। মারিয়া তাই দেখে হাসতে লাগল।
হুয়াকা দেবতার স্বর্ণমুর্তির বেদীর সামনের প্রাঙ্গনে উৎসবের আয়োজন হয়েছে। দেবতার পূজো দুপুরবেলাই হয়ে গেছে। স্বর্ণমূর্তির অর্থাৎ কাঠের মূর্তি ফুলে পাতায় প্রায় ঢাকা পড়ে গেছে। বেদীতেও ফুলপাতার স্তূপ। প্রাঙ্গনের চারিদিকে মশাল জ্বলছে। উৎসব প্রাঙ্গন আলোয় আলোময়। প্রাঙ্গনের চারপাশ বহু নারী-পুরুষ শিশুরা জড়ো হয়েছে। গাছের গুঁড়ি কুরে তার মুখে ভেড়ার চামড়া আটকে বাজনা তৈরি করা হয়েছে। সেটাই একজন দমাদম বাজাচ্ছে। কচ্ছপের নাড়ি দিয়ে তৈরী বাজনা আর একজন বাজাচ্ছে। টানা টানা সুরের বাজনা।
একটু পরেই দুটো পাহাড়ী ঘোড়ায় চেপে রাজা লুপাকা আর রানী এল। সামনে পেছনে রাজার দেহরক্ষীরা। দুজনেই বেশ সেজেগুজে এসেছে। রাজার মাথায় মোটা করে হলুদ ফেট্টি বাঁধা। তাতে একটা ধবধবে সাদা পাখির লম্বা পালক। রানীর ঢিলেঢালা পোশাকে কাঁচের চুকরো বসানো। মশালের আলোয় ঝিকিয়ে উঠছে সেসব। উপস্থিত উনকারা কেউ কিন্তু রাজারানীর জয়ধ্বনি করল না। শুধু তাকিয়ে দেখল। শুধু উপস্থিত চিমু সৈন্যরা হাতের বর্শা আকাশের দিকে তুলে কী বলল সমস্বরে চিৎকার করে। বোধহয় রাজা লুপাকা ও রানীর জয় ঘোষণা করল।
দেবরক্ষী মূর্তি সেই মাথাটার নিচেই পাথরের আসন। রাজারানী ঘোড়া থেকে নেমে এই আসনে বসল। শুরু হলো বাজনা। খুব সেজেগুজে একদল উনকা মেয়ে প্রাঙ্গ নে ঢুকল। তাদের গায়ে উজ্জ্বল সুতোর নক্সা আঁকা ঢিলেঢালা পঞ্চো। মাথার বিনুনিতে নানা রঙের ফুল গোঁজা। মাথায় কপালে লাল মোটা ফেট্টি বাঁধা। তাতে নানা রঙের পাখির পালক। বাজনার তালে তালে শুরু হলো মেয়েদের নাচ। নাচের সঙ্গে বেশ চড়া সুরে মেয়েরা গানও গাইতে লাগল। ঘুরে ঘুরে নাচতে লাগল। দর্শকরা চিৎকার করে তাদের উৎসাহিত করতে লাগল।
নাচগান থামল। রানী হাত তুলে আবার নাচিয়েদের নাচগান করতে নির্দেশ দিল। আবার বাজনা বেজে উঠল। শুরু হলো নাচ আর সেইসঙ্গে গান। সেই গান উনকা ভাষার গান
ফ্রান্সিসরা কিছুই বুঝলনা। মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল–এটা হচ্ছে হুয়াকা দেবতাকে বন্দনার গান। নাচগান চলল কিছুক্ষণ। দর্শকরা নাচিয়েদের দিকে ফুল ছুঁড়ে দিতে লাগল। চিৎকার করে উনকা ভাষায় কী বলতে লাগল। বোধহয় নাচিয়েদের বাহবা দিতে লাগল।
নাচ গান শেষ হলো। বাজনা বন্ধ হলো। গোলমাল থামতে হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে থেকে একটি তরুণ নাচিয়ে মেয়েদের সামনে এসে দাঁড়াল। দর্শকরা অবাক। তরুণটির মুখ মশালের আলোয় উজ্জ্বল। উত্তেজনায় তরুণটির ঠোঁটদুটো কাঁপছে। তরুণটি মুখের কাছে হাতের চেটো গোল করে চিৎকার করে কী বলে উঠল। মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল–সর্বনাশ। ছেলেটি রাজা কোলার জয়ধ্বনি দিচ্ছে। ও বিপদে পড়বে। তারপরেই তরুণটি তীক্ষ্ণস্বরে একটা গান ধরল। মুহূর্তে দর্শকদের মধ্যে ভীষণ চাঞ্চল্য জাগল। মেস্তিজো ফ্রান্সিসকে বলল ছেলেটি রাজা কোলার গুণকীর্তন করে গান গাইছে উনকারা সবাই এই গান জানে। সত্যিই দেখা গেল সব দর্শকরা-বেশির ভাগই উনকা উঠে দাঁড়িয়েছে। তরুণটির গানের সঙ্গেততক্ষণে গলা মিলিয়েছেনাচিয়ে উনকা মেয়েরাও। আস্তে আস্তে উপস্থিত প্রায় সব দর্শকরা সেই গানের সঙ্গে গলা মেলাল।
ওদিকে রাজা লুপাকা আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে, রানীও। রাগে রাজা লুপাকার মুখ লাল হয়ে গেছে। তার চিরশত্রুরাজা কোলার গুনগান গাইছে তারই সামনে। রাজা চিৎকার করে কী বলে উঠল। চিমু সৈন্যরা বর্শা হাতে ঝাঁপিয়ে পড়ল উনকাদের ওপর। উনকাদের মুখের গান বন্ধ হয়ে গেল। গান থামিয়ে নাচিয়ে মেয়েরাও প্রাঙ্গণ থেকে পালাল। দর্শকদের চিৎকার চ্যাঁচামেচি শুরু হলো। শুধু সেই তরুণটি একা তখনও গান গেয়ে চলেছে। রাজা লুপাকা তার দেহরক্ষীর একজনকে ইঙ্গিত করল। রক্ষীটি ছুটে এসে তরুণটির বুকে বর্শা বিধিয়ে দিল। তরুণটি উবু হয়ে উৎসব প্রাঙ্গণে পড়ে গেল। গান বন্ধ হয়ে গেল। কয়েকবার নড়ে ওর দেহটা স্থির হয়ে গেল।
