মোট কথা, কোনও ধরনের ফ্যান-লেটার যেন আমার ত্রিসীমায় আসে। এই হল আমার অর্ডার। তা সত্ত্বেও ঈশানীর চিঠি আমার কাছে পৌঁছোয় কী করে?
বিরক্তি নিশ্চয় কণ্ঠেও প্রকাশ পেয়েছিল। কেননা, কাগজ পড়তে পড়তে মুখ তুলল শিলাদ–হল কী?
ফ্যান লেটার। হাজারবার বলেছি এসব চিঠি যেন আমার কাছে না পৌঁছোয়।
বলে, চিঠিটা ছুঁড়ে দিলাম ওর বিছানায়। এক হাতে তুলে নিল শিলাদ। ভারী সুন্দর হাতটা সিল্কের চাদরের পটভূমিকায় নতুন করে দেখলাম। হাত দেখে মানুষের চরিত্র ধরা যায়। অন্তত আমার তাই বিশ্বাস। তা না হলে যার চেহারা অমন অসুরের মতো, তার মন অমন মিষ্টি, অমন নরম, অমন শিল্পীসুলভ হবে কেন? ওর হাতে সে চিহ্ন আছে।
চিঠিটা পড়ল শিলাদ। পড়ে হেসে ফেলল–ঈশানী দত্ত! বেশ নাম। চিঠিটাও। ভক্তের চিঠি তো এরকম হয় না। ইন্টারেস্টিং! বলে, অপাঙ্গে তাকাল। চিঠিটার মধ্যে রহস্য আছে।
রহস্য! রহস্য আবার কি? এ চিঠি এখানে পৌঁছোল কী করে, এ ছাড়া আর কোনও রহস্য তো দেখছি না।
হাতের লেখাটা যে তোমার হাতের লেখার মতো। রহস্য সেইটাই।
কথাটা সত্যি। ঈশানী দত্তর হাতের লেখা অবিকল আমার হাতের লেখার মতোই।
সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই মতলবটা মাথায় এল আমার। খাট থেকে নামতে নামতে বললাম–চললাম।
কোথায়?
ঈশানীকে দেখতে।
কিন্তু এ যে হানিমুনের সময়! এই দ্যাখো কাগজেও তাই লিখেছে। এখন কি বাইরে বেরোয়?
নকল মদালসারও তো হানিমুনের ইচ্ছা যায়। বলে মুচকি হাসলাম আমি। বিধাতারও তখন হেসেছিলেন–অলক্ষ্যে।
বেশ তো, খাবার নেমতন্ন করো, বর্তে যাবে, শিলাদ বলেছিল।
উঁহু। থার্ডক্লাস যে-কোনও একটা হোটেলে শুধু দুজনে দেখা করব, কথা বলব। এই হল আমার আজকের অ্যাডভেঞ্চার।
সেই ব্যবস্থাই হল। প্যারাডাইজ হোটেল। বিকেল চারটে। ঘর বুক করার পর ঈশানী দত্তর প্যারেলের ঠিকানায় খবর পাঠালাম–আমি আসছি।
.
স্নান সেরে নখরঞ্জন করে চুল আঁচড়ে যখন আমার হেয়ার-ড্রেসারের চেম্বার থেকে বেরোলাম, তখন আমাকে নায়িকা-শ্রেষ্ঠা মদালসা বলে চেনা মুশকিল। প্রসাধন এবং কেশবিন্যাস আর পাঁচটা সাধারণ মেয়ের মতোই।
প্যারাডাইজ হোটেলের সিঁড়ির ধাপে পা দিয়ে হঠাৎ মনটা অন্যরকম হয়ে গেল। নকল মদালসাকে দেখে লাভ কী? খামোকা এনার্জি নষ্ট..ধাপ থেকে পা নামিয়ে ফিরতে যাচ্ছি, মনে পড়ল শিলাদকুমারের মুখ…ঠাট্টা…টিটকিরি…ভক্তের ভয়ে পলায়ন? নাঃ, ফেরা হল না। সোজা গেলাম অফিসরুমে। নাকের ডগায় চশমা এঁটে বুড়ো ম্যানেজার এমন ভাবে তাকাল আমার পানে যেন আমি মেয়েটা তেমন সুবিধের নয়। দুই চোখে বেশ সন্দেহ…বারান্দা দিয়ে এগোতে এগোতে বিড়বিড় করে কিঞ্চিৎ জ্ঞানদানও করা হল। এ হোটেল নামী হোটেল, কুঅভিসন্ধি নিয়ে এখানে কেউ আসে না। হোটেলের দুর্নাম মালিক একদম সইতে পারে না। বলতে-বলতে বুক করা কামরার সামনে পৌঁছোলাম। দরজা ভেজানো ছিল। ঠেলে ঢুকলাম। প্রায়ান্ধকার। একটা টেবিল। দূরপ্রান্তে গোটাতিনেক চেয়ার। কে যেন সেখানে বসে রয়েছে।
পেছন ফিরে দেখলাম বুড়ো নেই। বললাম–অন্ধকারে কি মুখ দেখা যায়? বলেই খট করে সুইচ টিপলাম। আলোয় ভরে উঠল ছোট্ট ঘরটা।
অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম নকল মদালসার দিকে। চেয়ারে বসা মেয়েটি যেন আর একটা আমি।
তফাত শুধু পোশাক। আমি যা পরেছি, তা দামি না হলেও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু নকল আমি যা পরেছে, তা রীতিমতো নোংরা। যেমন ব্লাউজের ছিরি, তেমনি শাড়ির অবস্থা। ঘাড় পর্যন্ত ছাঁটা চুল। তা সত্ত্বেও আমার সঙ্গে তার মুখের আদলের হেরফের ঘটেনি। থুতনি সুডৌল। টানা টানা
চোখ। কামনার দুটি ডিপো। আমার ভক্তরা যে যে দেহশ্রীর জন্য আমাকে নিয়ে পাগল, সবই দেখলাম রয়েছে নকল আমির মধ্যে।
ঈশানী নির্ভয়ে তাকিয়েছিল। নিঃশঙ্ক চোখ। বলল–বসুন। কণ্ঠস্বর আমার মতোই। ঈষৎ ঘষা, ঈষৎ ধরা, ঈষৎ তীক্ষ্ণ। শুনেছি, পুরুষের রক্তস্রোত নাকি উদ্দাম হয় আমার এই কণ্ঠস্বরে। নকল আমি বহু চেষ্টায় এ স্বরও নকল করেছে।
আমি অভিনেত্রী। বিস্ময় চোখমুখ থেকে সরিয়ে রাখলাম। ঈশানী কিন্তু দেখলাম, মোটেই ঘাবড়ায়নি। মদালসার সামনে এসে বহু বাঘা রিপোর্টারও কেঁপে ওঠে। কিন্তু ঈশানী দত্ত বিন্দুমাত্র নার্ভাস হয়নি।
নৈঃশব্দ্য আমি ভাঙলাম। গৌরচন্দ্রিকার ধার দিয়েও গেলাম না। বললাম।–কি মনে করে?
কিছুই মনে করে নয়। বলল ঈশানী আমারই গলায়। আগে বসুন। অতদূরে নয়–আমার পাশে। ঈশানী যেন হুকুম করছে। যেহেতু তাকে আর আমাকে দেখতে যমজ বোনের মতো, অতএব আমার ওপর তার যেন একটা অধিকার জন্মে গিয়েছে। কত লম্বা আপনি?
প্রশ্নটা আকস্মিক। সুরটাও যেন কেমন-কেমন। কিন্তু গায়ে মাখলাম না। বললাম–সাড়ে পাঁচ।
আমারও তাই। ম্যাগাজিনেও তাই দেখেছিলাম। বাজিয়ে নিলাম।
কেন? বাজিয়ে নেবার দরকার কি? কিছু একটা বলা দরকার, তাই বললাম।
কোলের ওপর রাখা কালো হ্যান্ডব্যাগটা খুলল ঈশানী। একটা কালো রঙের সাইলেন্সার ফিট করা রিভলভার বার করে বলল–একটু পরেই আপনাকে খুন করব, তাই জেনে নিলাম। মরবার আগে কিছু বলার থাকলে বলতে পারেন।
নিস্তব্ধ ঘরে ঈশানীর কথা ফুরোলো। আবেগ নেই, উত্তাপ নেই, ঘৃণা নেই, দ্বেষ নেই। শুধু একটা ঘোষণা–আমাকে মরতে হবে। শুটিংয়ের সময়ে এরকম সংলাপ শুনলে মনে হত নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে। কিন্তু ঈশানীর কণ্ঠে নাটক নেই।
