কৃষ্ণ! মাথায় ঢুকবে না, ঠাকুরদা। ফুলে কীট আছে শুনেছেন তো? এ সেই ফুল আর এ-সেই কীট..
লাফিয়ে উঠে বললেন ডিটেকটিভ ইন্সপেক্টর আনন্দমোহন, ব্যস ব্যস আর পড়তে হবে, বুঝেছি।
খাতা বন্ধ করে বলল প্রতুল লাহিড়ী, হ্যাঁ, শুধু একখানা ডাক টিকিট!
কী বুঝলেন?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
চিঠি লিখে খামে মুড়ে ডাক টিকিট লাগানোর সময়ে শতকরা নিরানব্বই জন মানুষ জিভের ডগায় ডাকটিকিট বুলিয়ে নেন হাতের কাছে জল বা জলশোষক স্পঞ্জ থাকে না বলে।
অজয় ডাকটিকিটের পেছনে টামুই ফুলের বিষ মাখিয়ে রাখত। যাকে খুন করতে হবে তাকে চিঠি লিখে জবাব চাইত এবং ঝটিতি জবাব পাওয়ার আশায় নিজের ঠিকানা লেখা আর একটা খাম আর বিষ মাখানো ডাকটিকিট সঙ্গে দিত।
ধনঞ্জয় মিত্র উইল পালটাবেন শুনেই মাধবচরণকে সরিয়ে দিয়েছিল এইভাবেই হাতে খানিকটা সময় নেওয়ার মতলবে। তারপরে একই কায়দায় চিঠি লিখল ধনঞ্জয় মিত্রকে। উইল পালটাবার জন্যে তিনি সবাইকে ডাকলেন এবং সবার সামনেই সেই চিঠির জবাব দিয়ে বিদায় নিলেন ধরাধাম থেকে।
মারা গেলেন সারদাচরণ একই পন্থায়। তিনি বোধহয় কিছুটা আঁচ করেছিলেন। অজয় তাঁকে পঞ্চাশ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল। ওটা অছিলা। উদ্দেশ্য জবাব নেওয়া। পঞ্চাশ হাজারেও নয় লিখে মৃত্যুমুখে ঢলে পড়লেন ভদ্রলোক।
এই হল কৃষ্ণের বৈজ্ঞানিক কুরুক্ষেত্র।
* সাপ্তাহিক অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। ২৯শে ফাল্গুন, ১৩৮১।
গন্ধর্বলোক
ঈশানীর চিঠি ঈশান কোণের মেঘের মতোই আমার ছুটির দফারফা করে ছাড়ল। নামডাক ।এমনিতে হয়নি। বোম্বাইয়ের রূপোলি পর্দার তারকা-রানি আমি। কাজেই আবেগ বস্তুটার মাত্রা আমার মধ্যে একটু বেশিই। স্নায়ুর ওপরেই আমাকে বাঁচতে হয়। জানি, সব চিত্রতারকাদের মতোই চল্লিশ ছুঁয়ে আমাকেও গ্যাসট্রিক আলসারে ভুগতে হবে–স্নায়ুর ওপর অত্যাধিক চাপ দেওয়ার শাস্তি পেতে হবে। শিলাদকুমারও এই নিয়ে ঠাট্টা করে আমাকে।
বছরে পাঁচ-ছটা বড় বড় ছবিতে আমাকে নায়িকা হতেই হয়। দ্বিতীয় ছবির শুটিং শেষ হবার পর শিলাদকুমার ফিরল কাম্বোডিয়া থেকে। দুজনেই বেশ কাহিল। কেননা, সাতমাস একটানা কাম্বোডিয়ার ছবির কাজ করেছে শিলাদ। তাই প্রস্তাব করেছিল, আর একবার হানিমুনে বেরোনো যাক।
শিলাদের কথা শুনে হাসি পেয়েছিল বইকি। আর একবার হানিমুন, কথাটার কোনও মানে নেই আমার কাছে। কোনও হানিমুনই হয়নি আমাদের। বিয়ে হলে তো হবে। বিয়ে করার সময় পেলাম কখন? ফিল্মদুনিয়ার গন্ধর্বলোকে বিয়ে করার সময় কটা ভাগ্যবানের হয়?
সে যাই হোক, মধুচন্দ্রিমা যাপনের প্রস্তাব লুফে নিয়েছিলাম।
বাইরে বেরোনো নিরাপদ নয়। ভক্তদের জ্বালায় প্রাণ ওষ্ঠাগত হবে। তাই যেমন-তেমন ঘরে শুয়ে রইলাম। বাইরে বাজতে লাগল টেলিফোন। নীচে খটাখট শব্দে ব্যস্ত রইল অফিস টাইপরাইটার। ফ্যান-ক্লাব কর্মীরা ফুরসত পেল না চিঠির বস্তা থেকে মুখ তোলবার। ডিটেকটিভরাও রোজকারমতে টহল দিয়ে ফিরতে লাগল বাড়ি আর বাগানের প্রতিটি বর্গ ইঞ্চিতে।
আমি আর শিলাদ এয়ারকন্ডিশনড ঘরে শুয়ে বিভোর হয়ে রইলাম পরস্পরকে নিয়ে। এক-এক রাতে এক-এক ফুলশয্যার রোমান্সে মশগুল হয়ে রইলাম দুজনে দুজনকে নিয়ে। ব্রেকফাস্ট আসত সূর্য যখন মধ্যগগনে। আমি ক্রিম খেতে ভালোবাসি বলে শিলাদকুমার কত ঠাট্টাই না করত। বলত, দুদিনেই অ্যায়সা মোটা হবে যে ছবির কাজ আর জুটবে না। আমি শুনতাম না। ক্রিম আমার ভীষণ ভালো লাগে। এতদিনেও যখন মুটিয়ে যাইনি–তখন আর যাবোও না।
সেদিনও ব্রেকফাস্ট এলে ক্রিম খাচ্ছি। খেতে খেতে আমার চিঠির তাড়া থেকে একটা খাম বেছে নিলাম। খুলতেই দেখলাম ঈশানীর চিঠি।
শ্রীযুক্তা মদালসা দেবী
মান্যবরেষু,
আমি আর পারছি না। আপনার হয়ে জাল অটোগ্রাফ দিতে দিতে হাঁপিয়ে উঠেছি। রেহাই পাবার জন্য চুল হেঁটে ফেলাম। তবুও মুক্তি নেই। আপনার ভক্তের দল এখনও রাস্তায় দেখলেই আমার পেছনে ছোটে। মনে করে আমিই মদালসা। বলে, কেন চুল ছাঁটলাম। অমন লম্বা চুল হেঁটে কেন ববছাঁট করলাম। মদালসা দেবী, আমি সত্যিই আর পারছি না। সারাটা জীবন নকল মদালসা দেবী হয়ে কাটাবার বিড়ম্বনা আর সইতে পারছি না।
বিনীতা
ঈশানী দত্ত
চিঠি পড়েই মাথা গরম হয়ে গেল। চিঠির বক্তব্যর জন্য নয়। এ চিঠি আমার কাছে এল কী করে? সেক্রেটারিদের পইপই করে বলে দিয়েছি, ভক্তবিটেলদের কোনওরকম স্তুতিপত্র যেন আমার সামনে না পৌঁছোয়। ফ্যান-ক্লাব খুলেছি কি এমনি-এমনি? খোশামুদে চিঠি প্রথম প্রথম ভালোই লাগত। ভাবতেও অবাক লাগে, এসব চিঠির জবাবও দিতাম। কিন্তু হাউইয়ের মতো খ্যাতির আকাশে উঠে পড়ার পর স্তুতিপত্র দেখলেই মেজাজ খিঁচড়ে যায়।
একেই বলে খ্যাতির বিড়ম্বনা। খ্যাতি যখন থাকে না, তখন খ্যাতির পেছনে দৌড়াই। খ্যাতি যখন আসে, তখন খ্যাতিকে এড়িয়ে চলি। শিলাদকুমার অবশ্য এর ব্যতিক্রম। গোড়া থেকেই এ কারো ধার ধারেনি। গন্ধর্বলোকে হিরো রূপেই ওর প্রবেশ; প্রস্থানও ঘটবে হিরোর মতো।
তাই সেক্রেটারিদের ওপর ঢালাও হুকুম আছে, সব চিঠিই খুলে দেখবে। ব্যক্তিগত চিঠি আসবে, আমার সামনে-বাদবাকি সব যাবে ফ্যান-ক্লাবে। বাঁধা ছকের টাইপকরা চিঠিতে জবাব যাবে। এমনকী আমার সইকরা যে ফটোগ্রাফ পাঠানো হবে, তার সইটিও নিজে করব না–ওরাই আমার হয়ে করে দেবে।
