ভগ্নীর অসাধারণ অন্তর্ধান রহস্যের সংবাদ বহন করে মিস মিত্র ফিরে এলেন কলকাতায় আর ক্রমাগত চিন্তা করতে লাগলেন। আগাগোড়া বিষয়টা বারংবার তোলপাড় করেও তিনি চিন্তার কোনও কূল-কিনারা পেলেন না। তিনি জানতেন না যে এরকম ভাবে নানা কারণে বহু নারী এবং পুরুষ উধাও হয়ে যায় প্রতি বছরে–কেউই তাদের সন্ধান পায় না, যে পর্যন্ত না দৈব এসে কল-কাঠি নেড়ে দিচ্ছে। কিন্তু কী জানি কেন, মিস্ অন্নপূর্ণা মিত্রের কাছে এই ব্যাপারটি মনে হল একটি রীতিমতো অলুক্ষুণে, বিস্ময়-জনক, অতুলনীয় এবং ভয়াবহ ঘটনা। অনবরত এই বিষয় নিয়ে ভেবে ভেবে তিনি মাথা গুলিয়ে ফেললেন, তবুও স্বল্প-বা জগদীশ সরকার যে গোলকধাঁধার সৃষ্টি করেছেন, তার প্রবেশ পথেরই হদিশ পেলেন না খুঁজে। অবশ্য ভগ্নিপতি সম্বন্ধে মিস্ মিত্রের কোনও সন্দেহ ছিল না। কেননা তার ব্যবহার এবং কথাবার্তা খুবই সরল, স্পষ্ট এবং অতীব বোধগম্য। তিনি একজন কৃমি-কীট–এই সংবাদ তাকে জানিয়ে দিয়েছেন–কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি অবশ্যই সত্য কথাই বলেছেন। কিন্তু মিস্ মিত্র তার একমাত্র বোনটিকে ভালোবাসতেন। এবং কমলা সরকার কোথায় গেছেন এবং তাঁর কী হয়েছে–এই সংবাদ জানার জন্যে তিনি আকুল হয়ে উঠলেন। আর তাই সর্বশেষে তিনি পুলিশের সমীপে এই ঘটনাটি হাজির করলেন।
অন্তর্হিত মহিলার যতটুকু বর্ণনা সম্ভব, মিস্ মিত্র স্মৃতি থেকে উদ্ধার করে তা দিতে কসুর করলেন না; কিন্তু এই কেসের ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীটি মিস্ মিত্রের দৃষ্টি একটি বিষয়ে আকর্ষণ করলেন–যেহেতু তিনি তাঁর ভগ্নীকে বহু বছর যাবৎ দেখেননি, অতএব এ ক্ষেত্রে জগদীশ সরকারের পরামর্শ অপরিহার্য। সুতরাং পুনরায় শিল্পকর্ম থেকে টেনে আনা হল ট্যাক্সিডারমিসট ভদ্রলোককে। মিস্ মিত্রের আনা সংবাদটুকু এবং তার দেওয়া কমলা সরকারের দৈহিক বর্ণনার ওপর ভদ্রলোকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হল। তিনি আর একবার তার ছোট্ট জটিলতাবিহীন গল্পটি বললেন, বিশ্রী কানাঘুষো এড়াবার জন্যে প্রতিবেশিদের কাছে কেন মিথ্যা বলেছেন–সে কথারও উল্লেখ করলেন এবং সর্বশেষে মিস্ মিত্র বর্ণিত কমলা সরকারের ফটোগ্রাফে নিজেরও দু-একটি খুঁটিনাটি পরিবর্তন সংযোজন করে দিলেন। তারপর তিনি কনস্টেবলটিকে দুটি ফটোগ্রাফ দিলেন। ফটো দুটির মধ্যে যে যে স্থানে সাদৃশ্য চোখ এড়ায় না, সেগুলিও তর্জনী নির্দেশ করে দেখিয়ে দিলেন এবং তারপর প্রসন্ন-বদনে স্মিতহাস্যে তাকে দিলেন বিদায়।
পুলিশের জোর তদন্ত চলল–Missing Squad ফটোগ্রাফ দুটি নিয়ে সম্ভব অসম্ভব সব জাতীয় স্ত্রীলোকের সঙ্গেই দেখতে লাগল মিলিয়ে। কিন্তু তা হতোস্মি! মিস্ মিত্র যে তিমিরে ছিলেন, সেই তিমিরেই রইলেন। তখন তিনি নিজেও নিজের প্রচেষ্টা আর অর্থ নিয়োগ করে অনুসন্ধানকে ব্যাপকতর করে তুললেন; প্রায় প্রতিটি সংবাদপত্রেই ফটো সহ নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপন ছাপা হল–কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগল আর ততই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন মিস অন্নপূর্ণা মিত্র। সবশেষে পুলিশের সঙ্গে এবং আরও কয়েক জনের সঙ্গে পরামর্শ করে দেওয়াল-বিজ্ঞাপন ছাপালেন এবং কাঞ্চনপুর ও শহরের সর্বত্র দিলেন ছড়িয়ে। শহরের বাইরেও কিছু গেল। বাড়ির দেওয়ালে, গাছের গুঁড়িতে, পার্কের বেঞ্চে–সর্বত্র দেওয়াল প্রলম্বিত শ্রীমতী কমলা সরকারের ফটোগ্রাফ বহু পথচারীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে লাগল–এ সেই ফটোগ্রাফ যেটি জগদীশবাবু নিজে নগর-রক্ষীবাহিনীর হাতে দিয়েছেন তুলে, সেই সাথে তার দেওয়া বিশদ দৈহিক বর্ণনাও হয়েছে মুদ্রিত বর্ণনার মধ্যস্থানে লেখা আছে বেশ একটু খুঁড়িয়ে চলেন–এই কয়টি শব্দ মোটা মোটা হরফে ছাপা। প্লাকার্ডের ফল কিছু দেখা গেল না–কিছুই চাঞ্চল্যকর সংবাদও এল না। শেষবারের মতো তাঁকে কাঞ্চনপুর স্টেশনের দিকে যেতে দেখা গেছে–এই বিবৃতিও সরকারি গোয়েন্দার কাছে খুব আশাজনক সূত্র বলে মনে হল না। এ ব্যাপারে কোনও ইঙ্গিতও সংবাদপত্রে হল না প্রকাশিত; আর তারপর ধীরে ধীরে আমরা আবার নিজস্ব সংবাদদাতা পরিবেশিত সম্মুখ-রণাঙ্গনের চাঞ্চল্যকর বিবরণে হয়ে গেলাম মগ্ন। একটি মুখরা স্ত্রীলোকের গতিবিধি নিয়ে আলোচনা করবার মতো অবকাশ আমাদের আর কারুরই রইল না–কাঞ্চনপুর কলোনিও তাঁর কথা বিস্মৃত হয়ে এল ধীরে ধীরে।
আর তারপর হল এই রহস্যের উপসংহার এবং সেটা নিছক দৈবঘটিত ছাড়া আর কিছুই নয়। কাঞ্চনপুর কলোনির একপ্রান্তে অবস্থিত একটি দ্বিতল ভবনের দোতলায় ততোধিক নির্জন এক কক্ষে অলস মধ্যাহ্নে পদচারণা করছিলেন শ্রীকান্ত মিত্র–একজন মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। হাতে বিশেষ কোনও কাজ ছিল না এবং পড়াতেও বিশেষ মন বসছিল না। কাজেই উদাসীন এবং অলস ভঙ্গিমায় তিনি জানলা দিয়ে রাস্তার ওপারে দোকানের সাইনবোর্ডটি লক্ষ্য করলেন, রাস্তার মোড়ে দুটি ছোট মেয়েকে দেখলেন বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেতে। তারপর দেখলেন এক স্থূলাঙ্গী মহিলা বহুকষ্টে রিক্সা থেকে নেমে প্রবেশ করলেন পার্শ্ববর্তী দোকানে। তখন তিনি শো-কেসের মূল্যবান হস্তীদন্ত নির্মিত নটরাজের মূর্তির শিল্পকৌশল দেখলেন, এবং ভাবলেন যে এরকম একটি মূর্তি কিনে তার পড়ার টেবিলে সদ্যক্রীত মড়ার মাথার খুলি ওপর রেখে দিলে কীরকম দেখাবে; আর তারপর তার ভ্রাম্যমান দৃষ্টি ঘুরতে ঘুরতে এসে স্থির হল পথপার্শ্বের একটি গাছের মোটা গুঁড়ির ওপর; গুঁড়িটির ওপরে দুটিমাত্র শাখা ঠিক ইংরাজি Y-এর মতো উর্ধে উঠে গেছে। এই দুটি শাখার সংযোগস্থলে দেখতে পেলেন একটি নিরুদ্দেশ বিজ্ঞাপন এবং কমলা সরকারের দৈহিক বর্ণনা।
