সত্য কথা বলতে কি অন্নপূর্ণা, সে আর ফিরবে বলে আমি আশা করি না। আমাকে সে ছেড়ে গেছে–তিন মাস আগে সে চলে গেছে।
এই কথা আমায় বলতে চান আপনি! আপনাকে ছেড়ে গেছে। তার সঙ্গে কী ব্যবহারটা তাহলে করেছিলেন? কোথায় গেছে সে?
বিশ্বাস কর অন্নপূর্ণা, আমি জানি না। একদিন সন্ধ্যায় আমাদের মধ্যে একটু ঝগড়া-ঝগড়ি হল, কিন্তু তা নিয়ে আমি বেশি কিছু ভাবিনি। কিন্তু সে বললে যে যথেষ্ট হয়েছে, বলে কয়েকটি জিনিস গোছ-গাছ করে ব্যাগে পুরে বেরিয়ে গেল। আমি পিছু পিছু অনেকটা ছুটে গেলাম, বার বার মিনতি করে বললাম ফিরে আসতে–কিন্তু সে একবারও ঘাড় ফিরিয়ে তাকালে না–সোজা স্টেশনের দিকে চলে গেল। আর সেই দিন থেকে তাকে আর দেখিও নি, তার কথাও শুনিনি। আর যত চিঠি এসেছে, সব আমি পোস্ট-অফিসে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি।
ভগ্নিপতির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন অন্নপূর্ণা মিত্র। দোষটা কার, কমলার না জগদীশবাবুর–এই নিয়ে কিছুক্ষণ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, সবশেষে ক্রোধে কাঁপতে কাঁপতে বেরিয়ে গেলেন বাড়ি থেকে। আর জগদীশবাবু ফিরে গেলেন কারখানায়। কয়েকটি ময়ূর ঠাসা বাকি ছিল, সেইগুলো সেরে ফেলতে! আবার তিনি সুস্থ বোধ করতে লাগলেন। কিছুক্ষণের জন্য তার বুকের স্পন্দন কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল–আশঙ্কা করেছিলেন তাঁর গোলকধাঁধার রহস্য বুঝি গেল ফাঁস হয়ে। কিন্তু তারপরে আবার ফিরে এল তাঁর চিত্তের শান্তি।
এর পর সব কিছু মোটামুটি মানিয়ে যেত, যদি না চৌমাথার কাছে অন্নপূর্ণা মিত্রের সঙ্গে রেবা রায়ের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হত। রেবা রায় সরকারি চাকুরে অময়বাবুর স্ত্রী। ইতিপূর্বে জগদীশবাবুর বাড়িতে দুজনের আলাপ হয়েছিল–কাজেই দেখামাত্র দুজনেই দুজনকে চিনতে পারলেন। কয়েকটি বাজে কথার পর মিস্ মিত্রকে রেবা রায় জিগ্যেস করলেন যে কলকাতায় ফেরবার পর ইতিমধ্যে তার বোনের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করেছেন কিনা।
সে যে কোথায় তাই যখন জানি না, তখন কী করে আমার সঙ্গে তার দেখা হতে পারে? বেশ কিছুটা উন্মা প্রকাশ করে মিস মিত্র উত্তর দিলেন।
কী মুসকিল, আপনি তাহলে জগদীশবাবুর সঙ্গে দেখা করেননি?
এই মুহূর্তে আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করে আসছি।
কিন্তু তিনি তাহলে নিশ্চয় এলাহাবাদের ঠিকানাটা ভুলে যেতে পারেন না?
আর এইভাবে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে গড়িয়ে গেল কথাবার্তার গতি এবং মিস মিত্র পরিষ্কার জানতে পারলেন যে জগদীশবাবু তার বন্ধু-বান্ধবদের কাছে বলেছেন যে তার স্ত্রী অনেক দিনের জন্য এলাহাবাদে আত্মীয়-স্বজনের কাছে বেড়াতে গেছেন। প্রথমত মিত্র-ভগ্নিদ্বয়ের কোনও আত্মীয়ই এলাহাবাদে থাকত না–তাদের আদিবাস ছিল ময়মনসিংহে, আর দ্বিতীয়ত, জগদীশবাবু তাঁকে বলেছেন, কমলা ক্রুদ্ধ হয়ে বাড়ি ছেড়ে কোথায় বেরিয়ে গেছেন তা তিনি জানেন না। প্রথমে মিস মিত্র ভাবলেন এখুনি ফিরে গিয়ে ভগ্নিপতিকে এক হাত নেবেন–তারপর তিনি মত পরিবর্তন করলেন। দেরি হয়ে যাচ্ছিল, কাজেই তৎক্ষণাৎ আর দেখা না করে তিনি কলকাতাতেই ফিরে গেলেন,–সারাপথে কি ভাবে জগদীশবাবুকে শায়েস্তা করবেন, সেই কথাই লাগলেন ভাবতে।
পরের হপ্তায় আবার তিনি আবির্ভূত হলেন কাঞ্চনপুরে। কাঁচা মিথ্যা কথনের অপরাধে তিনি জগদীশবাবুকে অভিযুক্ত করলেন তাঁর সামনে ধরে দিলেন দুটি বিভিন্ন কাহিনি। আর, আবার আগের মতো জগদীশবাবুর বুকটা ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। ভয়ানক আতঙ্কে হাত-পা প্রায় অবশ হয়ে আসার উপক্রম হল। কিন্তু তার সংযম নিতান্ত অল্প ছিল না।
সত্যিই, তিনি বললেন, আমি তোমায় কোনও মিথ্যেই বলিনি অন্নপূর্ণা। ঠিক যা ঘটেছে তোমায় বলেছি। কিন্তু এখানকার লোকদের জন্যে এলাহাবাদের ওই কাল্পনিক গল্পটা আমায় বানাতে হয়েছিল। এ বিষয় নিয়ে প্রত্যেকে আলোচনা করুক, এ ইচ্ছা আমার ছিল না–বিশেষ করে কমলার ফিরে আসার সম্ভাবনা যখন রয়েছে–আমার তো মনে হয় আর কিছুদিনের মধ্যেই সে ফিরে আসবে।
সন্দেহপূর্ণ চোখে মুহূর্তের জন্য মিস্ মিত্র জগদীশবাবুকে এক দৃষ্টে লক্ষ্য করলেন আর তারপরেই দ্রুতপদে উঠে গেলেন দোতলায়। কিন্তু অচিরেই তিনি নেমে এলেন।
কমলার ড্রয়ার আমি দেখে এলাম। এমন ভাবে তিনি কথা শুরু করলেন যেন জগদীশবাবুকে যুদ্ধে আহ্বান করছেন। অনেকগুলো জিনিস পাওয়া যাচ্ছে না। চুণীর লকেট বসান নেকলেশটা নেই, কৃষ্ণার দেওয়া হীরার আংটিটাও দেখতে পেলাম না, কানপাশা, চুড়ি আর তাগাও দেখতে পেলাম না।
কমলা চলে যাবার পর আমি ওর সব কটা ড্রয়ারই বাইরের দিকে খুলে ঝুলতে দেখেছি। নিশ্বাস ফেললেন জগদীশবাবু। আমার বিশ্বাস, সে যাবার সময়ে সব গয়নাই নিয়ে গেছে।
এটা স্বীকার করতেই হবে যে জগদীশবাবু প্রতিটি ছোটখাটো বিষয়ের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রেখেছিলেন–এ গুণটি বোধহয় তাঁর শিল্প-দক্ষতা থেকেই জন্মেছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে যাবার সময়ে স্ত্রী যাবতীয় অলঙ্কার ফেলে চলে গেছে–এ গল্প কেউই বিশ্বাস করবে না। আর কাজেকাজেই যাবতীয় অলঙ্কার-সম্পত্তি গেল অদৃশ্য হয়ে।
প্রকৃত পক্ষে, এ ক্ষেত্রে কি যে আর করা উচিত, তা মিস্ মিত্র আর ভেবে উঠতে পারলেন না। দুটি বিভিন্ন রকমের কাহিনি বলার তাৎপর্য জগদীশবাবু এমন সুন্দরভাবে যুক্তির সাহায্যে বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, সে যুক্তি তিনিও না মেনে পারেননি। সুতরাং জগদীশবাবু যে যে-কোনও কৃমি-কীট মনুষ্যের চেয়েও জঘন্য–এই পরম সত্যটুকুই তাকে জানিয়ে দিয়ে তিনি দড়াম করে দরজা বন্ধ করে প্রস্থান করলেন। পুনরায় দ্রুত-স্পন্দিত বক্ষ নিয়ে জগদীশবাবু ফিরে গেলেন তাঁর কারখানায়। গোলকধাঁধা তখনও নিরাপদ, রহস্য তার অনাবিষ্কৃত৷ দ্বিতীয়বার আবার যখন মিস্ মিত্রের অগ্নি-মূর্তির সম্মুখীন তিনি হলেন, প্রথমটা তাঁর হৃৎপিণ্ডটা বড় বেশি রকম লাফালাফি করছিল–কিন্তু এখন বুঝলেন এ আতঙ্ক সম্পূর্ণ আকার বিহীন। তার কোনও বিপদ আর নেই। আমাদের মতো তিনিও তখন ভাবলেন সামন্ত ঘটিত মামলার বিবরণটি। সামন্ত দৌড়োদৌড়ি করছিলেন বলেই ধ্বংস হয়ে গেলেন। যদি সামন্ত চঞ্চল না হয়ে এক স্থানে জেঁকে বসে থাকতেন, তাহলে তার কেশাগ্র স্পর্শ করবার সাহস কারও হত না এবং কয়লার গাদার নীচে সমাধিও কোনওদিন হত না আবিষ্কৃত। জগদীশবাবু অবশ্য মনে মনে চিন্তা করতে লাগলেন যে সন্দিগ্ধমনা যে কোনও ব্যক্তি আসুক তার গৃহে, খুঁজে দেখুক প্রতিটি কোণ, চোর-কুঠরি এবং কয়লার গাদা। বাগানের প্রতিটি ফুলগাছের মাটি খনন করুক, প্রতিটি দেওয়াল ভেঙে তন্নতন্ন করে দেখুক। এই কথাই ভাবতে-ভাবতে তিনি তুলে নিলেন ঘোর কৃষ্ণবর্ণ একটি দাঁড়কাক। সকালের দিকে এ অর্ডারটি এসেছিল–সমস্ত মন নিবিষ্ট করে তিনি কৃষ্ণ-প্রাণীটিকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে রইলেন।
