কাশীপুর মহাশ্মশানের উদ্দেশে শবযাত্রা শুরু হয়েছিল বিকাল ছ’টার পর।
লাহোরের ট্রিবিউন পত্রিকার সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত শেষ দর্শনের এক চমৎকার বিবরণ রেখে গিয়েছেন। তাঁর পূতদেহ শ্মশানঘাটে নিয়ে যাবার জন্য দিনের তাপমাত্রা কমার অপেক্ষায় বসেছিলাম, সে সময় একখণ্ড মেঘ থেকে বড় বড় দানার বৃষ্টি ঝরে পড়ল। উপস্থিত সকলে বলতে থাকল এই হচ্ছে পুরাণকথিত স্বর্গ থেকে ঝরে পড়া পুষ্পবৃষ্টি। অমর দেবতাগণ স্বৰ্গমর্ত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তির নশ্বরতা থেকে অমরতায় উত্তরণকালে অভিনন্দন জানাচ্ছে।”
স্বামীজির পূজনীয় আচার্য, পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণের অন্তিমযাত্রার বিবরণ এখনও সম্পূর্ণ সংগৃহীত হয়নি, তবু তার শেষ জীবনের শেষ মুহূর্তগুলির বর্ননায় গুরু রামকৃষ্ণ ও পরবর্তী নেতা নরেন্দ্রনাথ দু’জনেই বেশ কিছুটা নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছেন।
০৬. ঠাকুরের চিকিৎসক-সংবাদ
চিকিৎসক ও উকিলদের প্রবল সমালোচনা করতেন বটে, কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণ যে এঁদের বেশ ভালোবাসতেন তার যথেষ্ট প্রমাণ ছড়িয়ে রয়েছে নানা লেখায়। একজন ডাক্তার তাকে জুতো উপহার দিয়েছিলেন এবং তা তিনি সানন্দে গ্রহণ করেছিলেন। এর আগে তার জুতো চুরি যায়। আর একজন চিকিৎসকের কাছে সযত্নে রক্ষিত ছিল তার পাদুকা। উকিলদের কথা বলাই বাহুল্য, যাঁকে তিনি সবচেয়ে ভালোবাসতেন ৩ নম্বর গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটের সেই নরেন্দ্রনাথ দত্ত তো সবসময় বলতেন সাতপুরুষ উকিলের বংশ। নরেন্দ্রনাথ নিজেও একসময় এটর্নি অফিসে কাজে বেরুতেন। শেষ মুহূর্তে কাশীপুরে যাতায়াতকালে ফাঁইনাল আইন পরীক্ষায় বসা হয়নি।
ঠাকুরের চিকিৎসক অনুসন্ধানে ৩৮ জনের নাম পেয়েছি–এঁরা ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য ও নাড়িজ্ঞানী। কেউ এম. ডি., কেউ অ্যালোপাথ হয়েও পরে হোমিওপ্যাথ, কেউ পারিবারিক পেশায় বৈদ্য। এই ৩৮ জনের মধ্যে অন্তত ২৭ জন যে কোনো না কোনো সময় শ্রীরামকৃষ্ণের স্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত ছিলেন তাও লক্ষ্য করেছি, বাকি ১১ জন সম্পর্কে ব্যাপারটা এখনও অস্পষ্ট।
স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের নাম নিচে দেওয়া হল। কিছুক্ষেত্রে পুরো নাম সহজলভ্য নয়, সেকালের রীতি অনুযায়ী অমুক ডাক্তার, অমুক কবিরাজ বলেই তারা সুপরিচিত থাকতেন :
• অতুলচন্দ্র ঘোষ
• আব্দুল ওয়াজিদ
• ঈশানচন্দ্ৰ কবিরাজ
• উপেন্দ্রনাথ ঘোষ
• কালী ডাক্তার।
• কৈলাশচন্দ্র বসু
• গঙ্গাপ্রসাদ সেন।
• গোপাল কবিরাজ
• গোপীমোহন কবিরাজ
• জ্ঞানেন্দ্রমোহন কাঞ্জিলাল
• ত্রৈলোক্যনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
• ত্রৈলোক্যনাথ বসু।
• দাড়িওয়ালা ডাক্তার
• দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়
• দ্বারিকানাথ কবিরাজ
• দু’কড়ি ডাক্তার
• নবগোপাল কবিরাজ
• নবীন পাল
• নিতাই মল্লিক
• নিতাই হালদার
• প্রতাপচন্দ্র মজুমদার
• ভগবান দাস
• ভগবান রুদ্র
• মধুসূদন ডাক্তার
• মহলানবীশ ডাক্তার
• মহেন্দ্রনাথ পাল
• মহেন্দ্রনাথ সরকার
• রাখালদাস ঘোষ।
রাজেন্দ্রলাল দত্ত
• রাম কবিরাজ।
• রামনারায়ণ ডাক্তার
• বিপিনবিহারী ঘোষ
• বিশ্বনাথ কবিরাজ।
• বিহারীলাল ভাদুড়ি
• বৈদ্য মহারাজ
• শশীভূষণ ঘোষ
• শশীভূষণ সান্যাল ও
• শ্রীনাথ ডাক্তার।
০৭. স্বামীজির অবিশ্বাস্য অ্যাকাউন্টিং পলিসি
অকালমৃত্যু ও অকালবার্ধক্যের এই দেশে স্বামী বিবেকানন্দ প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন কীভাবে শতবর্ষের সীমা পেরিয়ে কালজয়ী হল, তা একালের ম্যানেজমেন্ট বিশেষজ্ঞদের কাছে এখনও কৌতূহলের বিষয়।
এদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সঙ্ঘগুলি পূজ্যপাদ মহামানবদের স্পর্শে ধন্য হয়েও কিছুদিনের মধ্যে কেন টুকরো টুকরো হয়ে যায়, অথবা দলীয় দ্বন্দ্বের বিষে আত্মহননের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ এ দেশের প্রতিষ্ঠান-পরিচালকদের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন। সেই সঙ্গে জানা দরকার, শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদধন্য বেলুড়মঠের সন্ন্যাসীসঙ্ঘ কোন শক্তির বলে এমনভাবে কালজয়ী হল এবং বৃহৎ অরণ্যবনস্পতির মতো সর্বশ্রেণির মানুষের সমর্থন ও বিস্ময় ধরে রাখতে সমর্থ হল? দার্শনিক, দেশপ্রেমী ও মানবপ্রেমী বিবেকানন্দকে নিয়ে গত একশো বছরে দেশেবিদেশে নেহাত কম আলোচনা হয়নি, কিন্তু ম্যানেজমেন্ট বিজ্ঞানের পরিপ্রেক্ষিতে তার ভাবনা-চিন্তার প্রয়োগ ও বিশ্লেষণ সম্পর্কে তেমন নির্ভরযোগ্য ব্যাখ্যা এখনও পাওয়া যায়নি।
অর্থ সম্বন্ধে, বিশেষ করে অপরের অর্থ সম্বন্ধে, স্বামী বিবেকানন্দ ও তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ কখনও রেখেঢেকে কথা বলেননি। শ্রীরামকৃষ্ণ তার অন্তিমপর্বে প্রিয়জন ও ভক্তজনের আর্থিক সাহায্যের উপর বিশেষ নির্ভরশীল হয়েছে, কিন্তু তিনি একবারও ভুলে যাননি অর্থ হল গৃহস্থের রক্ত এবং সেই অর্থের যথাযোগ্য সম্মান বিশেষ প্রয়োজন।
কোনও অবস্থাতেই অপচয় অথবা বাজে খরচ ঈশ্বরপ্রেমে মাতোয়ারা হওয়া শ্রীরামকৃষ্ণের সমর্থন বা প্রশ্রয় পায়নি। অপরের কাছ থেকে অর্থ সংগৃহীত হলেই তার যে হিসেব প্রয়োজন, এই চিন্তা তরুণকালে অনভিজ্ঞ নরেন্দ্রনাথের মাথায় ঢোকেনি, তাই কাশীপুর-পর্বে ঠাকুরের অসুখের সময় খরচপাতির হিসেবপত্তর রাখা সম্পর্কে দাতাদের কথা ওঠায় তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। অতি সাবধানে নিতান্ত প্রয়োজনে যৎসামান্য খরচ করা হচ্ছে এই তো যথেষ্ট, যারা যথাসর্বস্ব দিতে এসেছে তাদের কাছে হিসেবের কথা তোলাকে অভিমানী নরেন্দ্রনাথ প্রসন্ন মনে নিতে পারেননি। তার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছিল। শোনা যায় কাশীপুরে নিতান্ত কঠিন মন্তব্য করে তিনি খাতাপত্তর ছুঁড়ে ফেলেছিলেন।
