নরেন্দ্রকে ঠাকুর বললেন, “ওরে ব্রাহ্মণ-শরীর যে রে। তাই ব্রাহ্মণ সংস্কার যাবার নয়।”
বৈকুণ্ঠনাথের ব্যাখ্যা, “ঠাকুর সকলের আলয়ে অনুগ্রহণ করেন নাই। বলতেন, “লুচি-তরকারি খেতে পারা যায়, কিন্তু অন্ন নহে।”
কাশীপুরের সবদিক সাবধানে বিচার করে স্বামী প্রভানন্দের সঙ্গে একমত এই লেখক, এই বিবৃতি নির্ভরযোগ্য নয়।
ঠাকুরের শেষ পর্ব সম্পর্কে স্বামী অভেদানন্দের ‘আমার জীবনকথা একটি নির্ভরযোগ্য রচনা। “সেইদিন রাত্রে ১টার সময় আমরা তাঁহার নিকট বসিয়াছিলাম। সাধারণত যেমন সমাধি হইত, সেইরূপ হইল। তাঁহার দৃষ্টি নাগ্রের উপর স্থির হইয়া রহিল। নরেন্দ্রনাথ উচ্চৈঃস্বরে ‘ওঁকার উচ্চারণ করিতে আরম্ভ করিল। আমরাও সমবেত স্বরে ওঁকার ধ্বনি করিতে লাগিলাম।…সমস্ত রাত্রি কাটিয়া গেল, শ্রীশ্রীঠাকুরের বাহ্যজ্ঞান আর ফিরিয়া আসিল না।”
শ্রাবণের শেষদিনে কাশীপুরে ঠাকুরের মহাপ্রস্থানের বর্ণনা দিতে গিয়ে রোমাঁ রোঁলা স্বামী রামকৃষ্ণানন্দ থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। “শেষ দিন রামকৃষ্ণ শেষপর্যন্ত আমাদের সহিত আলাপ করেন।… তিনি আমার দেহের উপর পাঁচ ছয়টি বালিশে ভর করিয়া বসেন। আমি বাতাস করিতেছিলাম। নরেন্দ্র তাহার পা লইয়া টিপিয়া দিতেছিলেন। রামকৃষ্ণ তাহার সহিত কথা বলিতেছিলেন। কহিতেছিলেন, কি করিতে হইবে। তিনি বারে বারে বলেন, এ ছেলেদের সাবধানে দেখো’.. তারপর তিনি শুইতে যান। একটা বাজিলে অকস্মাৎ তিনি একপাশে গড়াইয়া পড়েন। তাহার গলায় ঘড় ঘড় শব্দ হইতে থাকে।… নরেন তাড়াতাড়ি তাহার পা লেপে ঢাকিয়া ছুটিয়া সিঁড়ি বাহিয়া নীচে নামিয়া যান। এ দৃশ্য তিনি সহিতে পারিতেছিলেন না। ডাক্তার নাড়ী দেখিতেছিলেন। তিনি দেখিলেন, নাড়ী বন্ধ হইয়া গিয়াছে। আমরা সকলে ভাবিলাম উহা সমাধি।”
রোলাঁর নিজস্ব সংযোজন : ১৫ আগস্ট ১৮৮৬-”সেদিন অপরাহেও তার যথেষ্ট শক্তি ছিল। তিনি ক্ষত-পীড়িত কণ্ঠ নিয়েও শিষ্যদের সঙ্গে দু’ঘণ্টা কাল আলাপ করেন যোগ সম্বন্ধে। সন্ধ্যার দিকে তার চৈতন্য বিলুপ্ত হয়। সকলেই ভাবেন, মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু দুপুর রাত্রে পুনরায় তাকে জীবিত দেখা যায়। শিষ্য রামকৃষ্ণানন্দের দেহের উপর পাঁচ-ছ’টি বালিশ হেলান দিয়ে তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত প্রিয় শিষ্য নরেনের সঙ্গে আলাপ করেন এবং অনুচ্চস্বরে তাঁর শেষ উপদেশগুলো দিয়ে যান। তারপর তিনি উচ্চৈঃস্বরে তিনবার তার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় বস্তু ‘কালী’র নাম উচ্চারণ করেন এবং এলিয়ে পড়েন।… পরদিন মধ্যাহ্নের পূর্বে আধঘণ্টা পর্যন্ত এই সমাধিস্থ অবস্থায় থাকে। তারপর মৃত্যু ঘটে। তার নিজের কথায়–তিনি এক গৃহ থেকে অন্য গৃহে চলে যান।
শ্মশানে শবদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় ভক্তরা বলতে থাকেন : জয় ভগবান রামকৃষ্ণের জয়।
নরেন্দ্রনাথ সেই রাত্রেই দক্ষিণেশ্বরে লোক পাঠালেন ঠাকুরের ভাইপো রামলালকে খবর দিতে। রামলাল তৎক্ষণাৎ এসে দেহ পরীক্ষা করে বললেন, “এখনও ব্রহ্মতালু গরম আছে, তোমরা একবার কাপ্তেন উপাধ্যায়কে খবর দাও। নেপালের কাপ্তেন বিশ্বনাথ উপাধ্যায়…তাড়াতাড়ি আসিয়া উপস্থিত হইল এবং শ্রীশ্রীঠাকুরের মেরুদণ্ডে গব্যঘৃত মালিশ করিলে চৈতন্যোদয় হইবে বলিল।”
শশিভূষণ, শরৎচন্দ্র ও বৈকুণ্ঠনাথ সান্যাল যথাক্রমে গ্রীবায়, বক্ষে এবং পদমূলে ঘৃত মালিশ করতে লাগলেন, কিন্তু তিন ঘণ্টারও বেশি মালিশ করে কোনও ফল হ’ল না।
এরপরে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের কাশীপুরে আবির্ভাব। কিন্তু ক’টার সময়? ঠাকুরকে এই মহেন্দ্রলাল ‘তুমি’ বললেও, সমধিক শ্রদ্ধা-ভক্তি করতেন। বৈকুণ্ঠনাথের রচনা অনুযায়ী : “পরদিন প্রত্যুষে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার সর্বপ্রথম উদ্যানে উপস্থিত হন; এবং প্রভুর আনন্দপূর্ণ আনন, রোমাঞ্চিত তনু এবং অঙ্গ জ্যোতিতে গৃহপূর্ণ দর্শনে মুগ্ধ হইয়া কহেন-এই দিব্যাবস্থার প্রতিকৃতি গ্রহণ আমি বাঞ্ছনীয় বোধ করি। অতএব কলিকাতায় যাইয়া আমি এখনই ইহার ব্যবস্থা করিতেছি।”
মা-ঠাকরুণ “প্রাণের আবেগে ‘মা কালী গো! তুমি কি দোষে আমায় ছেড়ে চলে গেলে গো’ বলিয়া ভূপতিত হইয়া উচ্চরোলে ক্রন্দন ও বিলাপ করিতে লাগিলেন।”
গ্রুপ ছবি সম্বন্ধে বৈকুণ্ঠনাথের মন্তব্য : “পরিতাপের বিষয়, অত্যধিক বিলম্ববশতঃ প্রাতঃকালের সে জ্যোতির্ময় প্রাণটি তখন অন্তর্হিত হইয়াছিল।”
স্বামী অভেদানন্দের বর্ণনা অনুযায়ী, ডাক্তার সরকার “বেলা দশঘটিকায় এসে নাড়ী দেখে বলেন, ঠাকুরের প্রাণবায়ু নির্গত হয়েছে।”
অনেক বিচারবিবেচনার পর স্বামী প্রভানন্দের সিদ্ধান্ত : ডাক্তার সরকার “কাশীপুরে পৌঁছান বেলা একটায়।”
ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের দিনলিপি। খাওয়াদাওয়ার পর প্রথমে ডাফ স্ট্রিটে যাই এক রোগিণীকে দেখতে, তারপর পরমহংসের কাছে। তিনি মৃত। গত রাত্রে একটার সময় তাঁর দেহাবসান হয়েছে, He was lying on the left side legs drawn up, eys open, mouth partly open.” এরপরে লেখা, মহেন্দ্রলাল ছবি তোলার পরামর্শ দিলেন এবং নিজের চাদা হিসেবে দশ টাকা রেখে গেলেন।
বেঙ্গল ফটোগ্রাফার্সের ছবি তোলা সম্বন্ধে স্বামী অভেদানন্দের বর্ণনা : “রামবাবু নিজে খাটের সম্মুখে দাঁড়াইয়া নরেন্দ্রনাথকে তাঁহার পার্শ্বে দাঁড়াইতে বলিলেন। আমরা পশ্চাতে সকলে নির্বাক হইয়া সিঁড়ির উপর দাঁড়াইলাম। বেঙ্গল ফটোগ্রাফার কোম্পানি দুইখানা গ্রুপ ফটো তুলিয়া লইলেন।”
