আরও খবর : “এখানে ইলিস মাছ অপর্যাপ্ত আজকাল। ভরপেট খাও, সব হজম। ফল অনেককলা, নেবু, পেয়ারা, আপেল, বাদাম, কিসমিস, আঙ্গুর যথেষ্ট, আরও অনেক ফল ক্যালিফোর্নিয়া হতে আসে। আনারস ঢের, তবে আম, লিচু ইত্যাদি নাই!”
নিউইয়র্ক নিবাসে এক বিখ্যাত হোটেলে বিবেকানন্দর সান্ধ্য নিমন্ত্রণ–এসব নিমন্ত্রণ করে যাঁরা ধন্য হতেন সেইসব ধনীদের জন্য তাঁর তৈরি বিশেষ ইংরিজি শব্দ ‘লং পকেট’ বা লম্বা পকেট। প্রায়শই স্বামীজির গন্তব্যস্থান জগদ্বিখ্যাত এসটোরিয়া হোটেল, কিংবা শোয়েল, কিংবা ডালমনিকো! যিনি তিনদিন পর্যন্ত পথের ধারে অনাহারে কাটিয়েছেন তাকেই যেতে হচ্ছে অন্তহীন ডিনার পার্টিতে যা সন্ধ্যায় শুরু হয়ে ভোর দুটোর আগে কিছুতেই শেষ হতে চায় না। এইসব বিখ্যাত রেস্তোরাঁকে প্রায়শই প্রাধান্য দিলে শরীর অসুস্থ হবার আশঙ্কা যথেষ্ট, তাই একসময় স্বামীজি “নিঃশব্দে” ভেজিটারিয়ানে রূপান্তরিত হয়েছেন এবং নেমন্তন্ন এড়িয়ে চলেছেন। ১৮৯৫ সালের মার্চ মাসে স্বামীজি লিখছেন, “আজ একটা ডিনারে যাচ্ছি, এইটাই শেষ।”
এর পরের চিত্র–থাউজেন্ড আইল্যান্ড পার্কে বিবেকানন্দ একেবারে নিরামিষাশী, ঘন ঘন উপবাসও চলেছে। জায়গাটা ছাড়বার আগে তিনি তিরিশ-চল্লিশ পাউন্ড ওজন কমাবার কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।
নিউইয়র্কপর্ব সম্পর্কে আরও খবর আছে। মিস ওয়ালডো যেমন বহু দূরত্ব পেরিয়ে মূল শহরে এসে স্বামীজিকে বেঁধে দিতেন, তেমন সুযোগ পেলেই বক্তৃতার ফাঁকে ফাঁকে স্বয়ং বিবেকানন্দ চলে যেতেন মিস ওয়ালডোর বাড়িতে, সেখানে তিনি সোজা উঠে যেতেন টঙে এবং শুরু করতেন রান্না।
অর্ডিনারি রাঁধুনি নন বিবেকানন্দ, গবেষক রাঁধুনি, তাই চলতো নব নব পদের পরীক্ষা এবং আবিষ্কার এবং কিভাবে পশ্চিমী মশলা ইত্যাদি দিয়ে পূর্বদেশের রান্নার কাছাকাছি পৌঁছনো যায় তার বিরতিহীন প্রচেষ্টা। শিশুর মতন এঘর থেকে ওঘরে স্বামীজি ছোটাছুটি করতেন। হরিদাসীর অন্য একটা নামও তিনি দিয়েছিলেন–যতী-মাতা’ সন্ন্যাসীদের মাতা।
বিদেশে থাকার সময় বিবেকানন্দ শুধু মোটাসোটা বেদ-উপনিষদ দেশ থেকে আনাচ্ছেন তাই নয়, সেই সঙ্গে নিউ ইয়র্কে কি পৌঁছচ্ছে ১৮৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে তা তার চিঠিতেই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। কলকাতায় গুরুভ্রাতাকে স্বামীজি লিখছেন “যোগেনভায়া, অড়হর ডাল, মুগের ডাল, আমসত্ত্ব, আমসি, আমতেল, আমের মোরব্বা, বড়ি, মসলা সমস্ত ঠিকানায় পৌঁছিয়াছে।…এক্ষণে যদি ইংলন্ডে স্টার্ডির ঠিকানায়…ঐ প্রকার ডাল ও কিঞ্চিৎ আমলে পাঠাও তো আমি ইংলন্ডে পৌঁছিলেই পাইব। ভাজা মুগডাল পাঠাইবার আবশ্যক নাই। ভাজা মুগডাল কিছু অধিকদিন থাকিলে বোধ হয় খারাপ হইয়া যায়।”
এই সব মশলাপাতিতে সমৃদ্ধ হয়ে স্বামীজি মার্কিন মুলুকের বিভিন্ন শহর দাপিয়ে বেড়ালেন! :
ডেট্রয়েট ১৮ মার্চ ১৮৯৬–এক ভক্তের বাড়িতে গিয়ে স্বামীজি রান্না করার অনুমতি চাইলেন। পকেট থেকে কয়েক ডজন গুঁড়ো মশলা ও ফোড়ন, আচার চাটনি ইত্যাদি ঝটপট বেরিয়ে এল। এসব ইন্ডিয়া থেকে সযত্নে পাঠানো। স্বামীজি যেখানেই যেতেন নানারকম মশলাপাতি সঙ্গে নিতেন। সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ এক বোতল চাটনি যা এক ভদ্রলোক মাদ্রাজ থেকে পাঠিয়েছেন। ভীষণ ঝাল থাকতো রান্নায়, সময়ও লেগে যেতো অনেক। কোন কোন ভক্তের ধারণা, এসব রান্না তার লিভারের পক্ষে ভাল নয়। কিন্তু তিনি ওসব বিশ্বাস করতেন না।
বিদেশে যতই শ্রদ্ধা ভালবাসা ও আদর যত্ন পান না কেন স্বামীজির ভারতীয়ত্ব যে শতকরা একশো ভাগ অক্ষুণ্ণ রয়েছে এবং ভারতীয় রান্নার প্রচার যে তিনি নির্বিবাদে করে বেড়াচ্ছেন তা নিউ ইয়র্ক থেকে (১৪ এপ্রিল ১৮৯৬) স্বদেশে স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দকে লেখা চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।..”মুগের ডাল তৈয়ার হয় নাই মানে কি? ভাজা মুগের ডাল পাঠাইতে আমি পূর্বেই নিষেধ করিয়াছি। ছোলার ডাল ও কাঁচা মুগের ডাল পাঠাইতে বলি। ভাজা মুগ এতদূর আসিতে খারাপ ও বিস্বাদ হইয়া যায়, সিদ্ধ হয় না। যদি এবারও ভাজা মুগ হয়, টেমসের জলে যাইবে ও তোমাদের পণ্ডশ্রম। আমার চিঠি না পড়িয়াই কাজ কেন কর? চিঠি হারাও বা কেন? যখন চিঠি লিখিবে, পূর্বের পত্র সম্মুখে রাখিয়া লিখিবে। তোমাদের একটু বিজনেস বুদ্ধি আবশ্যক।”
সন্ন্যাসী শুধু আটলান্টিকের ওপারে বেদান্ত ও বিরিয়ানি প্রচার করেননি, এক্সপোর্ট প্রমোশনের কর্তাব্যক্তিরা জেনে রাখুন সেই ১৮৯৬ সালে স্বামীজি নিউইয়র্কে বসে ভারতীয় মশলার রপ্তানি সম্ভাবনা সম্বন্ধে বিশেষ চিন্তা করেছেন। গুরুভাই ত্রিগুণাতীতানন্দকে ১৭ জানুয়ারি ১৮৯৬ নিউইয়র্ক থেকে স্বামীজি কি লিখেছিলেন তা শুনুন।
“…দয়ালবাবুকে বলবে, যে মুগের দাল, অড়র দাল প্রভৃতিতে ইংলন্ডে ও আমেরিকায় একটা খুব ব্যবসা চলতে পারে। ডাল-সুপ উইল হ্যাভ এ গগা ইফ প্রপারলি ইনট্রোডিউণ্ড। (ঠিকমত শুরু করাতে পারলে দালের ফুষের বেশ কদর হবে।) যদি ছোট ছোট প্যাকেট করে তার গায়ে রাঁধবার ডিরেকশন দিয়ে বাড়িতে বাড়িতে পাঠানো যায়–আর একটা ডিপো করে কতকগুলো মাল পাঠানো যায়, তো খুব চলতে পারে। ঐ প্রকার বড়িও খুব চলবে। উদ্যম চাই–ঘরে বসে ঘোড়ার ডিম হয়। যদি কেউ একটা কোম্পানি ফর্ম করে ভারতের মালপত্র এদেশে ও ইংলন্ডে আনে তো খুব একটা ব্যবসা হয়।”
