হ্যাঁ জানি।
তাহলে বলছ না কেন?
ইকবাল ওরফে হোসেন স্যার।
নাম শুনে সবাই চমকে উঠলেও কেউ কিছু বলল না।
সুরাইয়া কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বলল নাম শুনে সবাই বোবা হয়ে গেলে নাকি? শোন, কথাটা জানার পর আমি যখন বললাম, তোমার ভাইকে জানিয়ে আমি আব্বাকে আম্মাকে রাজি করাব তখন বড় আপা বলল, যেদিন জানাবে তার পরের দিন আমার মরা মুখ দেখবে। তবু আমি তোমাদেরকে জানালাম। তোমাদের সবাইয়ের কাছে আমার মিনতি তোমরা যদি হোসেন স্যারকে এ বাড়ির জামাই করতে না চাও, তাহলে এমন কিছু করো না যার ফলে আপা যেন বুঝে না ফেলে যে, তোমরা তার ব্যাপারটা জেনে গেছ।
সব ভাই শিক্ষিত, তাদের বৌ-রাও শিক্ষিত। তারাও হোসেন স্যারের পরিচয়। জেনেছে। ছোট বৌ মমতাজ অন্য দুজনের চেয়ে বেশি শিক্ষিত। সে ভার্সিটি পড়ুয়া মেয়ে। সেই প্রথম বলল, বংশ নিয়ে বাড়াবাড়ি করা মোটেই ঠিক নয়। উচ্চ বংশের ছেলেরা চরিত্রহীন হলে যেমন বংশের দুর্নাম হয়, নিচ বংশের ছেলেরা চরিত্রবান হলে তেমনি বংশের সুনাম হয়। কোনো এক মনীষী বলেছেন “জন্ম হউক যথা তথা-কর্ম হউক ভালো।” ইকবালের সম্পর্কে যতটুকু শুনেছি তার বাপ দাদা গরিব ছিল। তাই আমাদের বাগানের দারোয়ান ছিল। কিন্তু তারা কোনোদিন এতটুকু অন্যায় করেনি। বরং তারা ভালো লোক ছিল বলে তাদেরকে আমাদের মুরুব্বিরা ভালো চোখে দেখতেন। তারা ভালো ছিল, তাই তাদের বংশে ইকবালের মতো ভালো ছেলে জন্মেছে। আমি বড় বুবুর সঙ্গে একমত।
মেজ বৌ আরেফা বলল, আমিও বড় বুবু ও ছোটর সঙ্গে একমত।
বড় আব্দুর রশিদ প্রথমে রেগে গেলেও তিন জায়ের কথা শুনে রাগ পুড়ে গেছে। ছোট দু’ভাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, তোমরা কি বল?
তাদেরও বড় ভাইয়ের মতো অবস্থা। প্রথমে মেজ আব্দুস সামাদ বলল, বড় আপার ভালোর জন্য আমি সব কিছুতে রাজি।
ছোট আব্দুল করিম বলল, মেজ ভাই যা বলল, আমিও তাই বলব। তবে তোমার মতামতই চূড়ান্ত।
আব্দুর রশিদ বলল, তোমাদের কথাই ঠিক। সব কিছুর বিনিময়ে হলেও বড় আপাকে মানষীক কষ্টের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। কিন্তু আম্মা আব্ব কিছুতেই রাজি হবেন না। তাদেরকে নিয়েই সমস্যা। আর আব্বার যে অবস্থা, শুনে যদি উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তাহলে হার্ট এ্যাটাক করতে পারে।
ছোট আব্দুল করিম সুরাইয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, আব্বা আমাদের সবার চেয়ে বড় আপাকে বেশি ভালবাসলেও তোমার স্থান তার পরেই। তুমিই কথাটা আব্বাকে। জানাও। আব্বা যদি আমাদেরকে ডেকে কিছু বলেন, তখন আমরা আমাদের মতামত জানাব।
সুরাইয়া বলল, বেশ আজ রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর আমি আব্বাকে জানাব। তোমরা আমার ঘরে থাকবে।
খাওয়া দাওয়ার পর রুকসানা আব্বাকে ওষুধ খাইয়ে চলে যাওয়ার পর আজিজা বেগম স্বামীর পায়ে হাতে সর্ষের তেল মালিশ করছিলেন। বড় বৌকে আসতে দেখে বললেন, কিছু বলবে মা?
জ্বি বলব বলে সুরাইয়া ভয় পেয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
আজিজা বেগম বললেন, বল মা কি বলবে?
সুরাইয়া সাহস করে বলল, আমি বড় আপার বিয়ের ব্যাপারে দু’একটা কথা বলতে চাই।
বি.এ পাশ করার পর থেকে যে মেয়ে কত ভালো ভালো পাত্র ফিরিয়ে দিয়েছে, সেই মেয়ের বিয়ের কথা বড় বৌকে বলতে শুনে আব্দুল মতিন ও আজিজা বেগম যেমন খুব অবাক হলেন তেমনি আনন্দিতও হলেন। স্ত্রী কিছু বলার আগে আব্দুল মতিন জিজ্ঞেস করলেন, তুমি যে কথা বলতে এসেছ রুকসানা জানে?
জ্বি না আব্বা। বড় আপা কেন বিয়ে করতে চায় না, আমি তা জানতে পেরে আপনাদেরকে বলতে এসেছি।
বেশ কি জেনেছ বল।
বড় আপা দক্ষিণ ফুকরার মরহুম কাজেম সেখের ছেলে ইকবালকে বলে চুপ করে গেল। ভয়ে তার গলা শুকিয়ে এল। তাই কথাটা শেষ করতে পারল না।
ইকবালের নাম শুনে আব্দুল মতিন খুব রেগে গিয়ে ধমকের সুরে বললেন, থামলে কেন? ইকবাল কি?
সুরাইয়া আরো বেশি ভয় পেয়ে ঢোক গিলে কাঁপাস্বরে বলল, তাকে ছোটবেলা থেকে বড় আপা ভালবাসে। আর ইকবালও বড় আপাকে ভালবাসে। তাই বড় আপা যেমন বিয়ে করতে চায় না, তেমনি ইকবালও বিয়ে করেনি।
বিনা মেঘে ঘরে বাজ পড়লেও বোধ হয় আব্দুল মতিন অতটা চমকে উঠতেন না। ভীষণ চমকে উঠে নির্বাক দৃষ্টিতে সুরাইয়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাগে ফুলতে লাগলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে সামলে নিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন, কথাটা কার কাছে জেনেছ? রুকসানা তোমাকে বলেছে?
শ্বশুরের অবস্থা দেখে সুরাইয়া খুব ভয় পেলেও বুদ্ধি খাঁটিয়ে বলল, না আব্বা। একদিন অনেক রাত্রে বড় আপার ঘরে আলো জ্বলতে দেখে ভাবলাম, বড় আপাতো প্রতিদিন এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। আজ এত রাতে কেন জেগে আছে জানার জন্য জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলাম, ডাইরীতে কি যেন লিখছে। পরের দিন সেকথা। মনে পড়তে বড় আপা কারখানায় চলে যাওয়ার পর কৌতূহলবশতঃ তার ঘরে গিয়ে ডাইরিটা বালিশের তলায় পাই। তারপর সেটা পড়ে জানতে পারি। পরে একসময় তাকে ডাইরি পড়ার কথা বলি। শুনে বড় আপা খুব রেগে যায়। আমি তার কাছে মাফ চাইতে বলল, ডাইরি পড়ে যা কিছু জেনেছ, তা যদি আমার জীবিতকাল পর্যন্ত গোপন রাখার ওয়াদা কর, তাহলে মাফ পাবে। আর যদি ওয়াদা খেলাপ কর, তাহলে পরের দিন আমার লাশ দেখবে।
আব্দুল মতিন আরো গম্ভীর স্বরে বললেন, ওয়াদা খেলাপের পরিণতি জেনেও ওয়াদা খেলাপ করলে কেন? তা ছাড়া তুমি কী জান না, ওয়াদা খেলাপ অতি জঘন্য অপরাধ?
