আপনি এই মুহূর্তে কিছু করতে পারবেন বলে আমার মনে হয় না। তবে আমার একথা বলার কারণ যে কোনো মুহূর্তে আপনাকে ঢাকায় রওনা হওয়ার মানসিক প্রস্তুতিতে রাখা।
আমি বললাম, আমি এই মুহূর্তে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। আপনি যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারলে আমি এখনই রওনা দেব।
আমার কথায় পারুল ও ইমাম উভয়ই খুশি হয়েছে বলে মনে হল। আমি নন্দিনীর ট্রেনিং ক্যাম্পের কথা নাসরিনকে আনার সময় টেলিফোনে ইমামকে জানিয়েছিলাম। পারুল বলল, দিদিকে সম্ভব হলে খবরটা পাঠানো উচিত।
আমি বললাম, নন্দিনী দুএকদিনের মধ্যে কলকাতায় আসবে। আমার গ্রুপ কমান্ডার আলী রেজা এতক্ষণে নিশ্চয়ই নন্দিনীকে নাসরিনের বিষয় জানিয়ে আমি যে কলকাতায় এসেছি একথা জানিয়েছেন। খবর পেলে সে আর দেরি করবে না। গাড়ি ইমামের বাসার সামনে এসে দাঁড়াল।
.
পরের দিন বেশ দেরিতে আমার ঘুম ভাঙল। বেলা নটায় মিতুর চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙল, মামা উঠুন, এক ভদ্রলোক সকাল থেকে আপনার জাগার জন্যে বসে আছেন।
কোথায়?
ড্রইংরুমে।
নাম জিজ্ঞেস করিস নি?
মিঃ আলী রেজা।
মিতুর কথায় আমি লাফ দিয়ে বিছানায় উঠে বসলাম। দ্রুত বেসিনে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিয়ে বসার ঘরে ঢুকে দেখি রেজাভাই মাথা নিচু করে চিন্তিত মুখে চুপচাপ বসে আছেন। আমি সালাম বলেই রেজা ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম, রেজাভাই আপনি এসছেন?
আগে নাসরিনের কথা বলুন।
তাকে আমার ভগ্নিপতি একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে ভর্তির ব্যবস্থা করে রেখেছিল। গতকালই তার জ্ঞান ফিরেছে। শুধু রাতের খবরটা আমি নিতে পারি নি। আমিও খুব বিপদগ্রস্ত রেজাভাই। খুব ক্লান্ত।
আমাদের কোলাকুলির মধ্যে মিতু ও পারুল এসে ঢুকল।
সকালে ইমাম রোজ ক্লিনিকে টেলিফোনে জেনেছে মেয়েটি আজ সকাল থেকেই উঠে বসতে পারছে। তার পরিপূর্ণ সেন্স ফিরে এসেছে এবং আপনার আর আলী রেজা সাহেবের খোঁজ করছে। তাকে ডাঃ রায় সব খুলে বলেছেন। এখন মোটামুটি ভালো আছে, চিন্তার কিছুই নেই। ভাই আপনি মেহমানকে নিয়ে খাওয়ার টেবিলে চলে আসুন। নাস্তা আর কফি দেয়া হয়েছে। আপনাদের জামাই অফিসে গেছেন। আসুন নাস্তা জুড়িয়ে যাচ্ছে।
বলল পারুল।
আমি বললাম, এ আমার বোন পারুল, এটা মিতু, ভাগ্নি। আর ইনি আমার গ্রুপ কমান্ডার কমরেড আলী রেজা। আর নাসরিন এর ছাত্রী। আমরা দর্শনায় এর নেতৃত্বেই একটা অপারেশনে সফল হয়েছি। চলুন রেজাভাই ভেতরে গিয়ে নাস্তা খেতে খেতে এদের সাথে আলাপ করবেন।
আমরা এসে নাস্তার টেবিলে বসলাম। কলা, ডিম, আপেল আর পাউরুটি সাজানো খাবার টেবিলে। আলী রেজা দেখেই খুশি হয়ে বললেন, এত নাস্তা বেশ কিছুকাল আমার কপালে জোটে নি কবি সাহেব। আগে কিছু খেয়ে নিই তারপর কথা বলব। নাসরিনের ভালো ব্যবস্থা করেছেন আপনার বোন আর ভগ্নিপতি এতেই এ পরিবারের কাছে আমার কৃতজ্ঞতায় সীমা নেই।
পারুল হেসে বলল, এটা আপনি কী বলছেন রেজা ভাই, আপনারা দেশের ভেতরে লড়ছেন, প্রাণ দিচ্ছেন, এটা তো আমাদের কর্তব্য।
তোমাকে বোন আমি ধন্যবাদ দিয়ে ছোটো করব না। তোমরা যে মেয়েটিকে ক্লিনিকে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করেছ সে আমার কন্যা তুল্য। তার ভালোমন্দের সাথে আমার বিবেক জড়িত। তার চিকিৎসার সমস্ত টাকা আমি দিতে এসেছি।
নাসরিনের চিকিৎসার খরচ আপনাকে বহন করতে হবে না রেজাভাই। যে ক্লিনিকে তাকে আমরা ভর্তি করেছি সে ক্লিনিকের ডাঃ রায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে আহত একজন যোদ্ধার চিকিৎসার ব্যয় ক্লিনিকই বহন করবে বলে জানিয়েছেন। তারা আমাদের কাছ থেকে কোনো টাকা নেবেন না। নিলে বাংলাদেশের সরকারই তা বহন করত। আপনি কেন দেবেন?
পারুল রেজা ভাইয়ের কাপে কফি ঢেলে দিতে গেলে তিনি আমার দিকে ফিরে বললেন, আপনি বলছিলেন আপনি খুব বিপদগ্রস্ত। কী ব্যাপার বলুন তো?
ঢাকার কাছে একটা অপারেশন আমার স্ত্রী মাইনের আঘাতে পঙ্গু হয়ে ঢাকায় আটকা পড়েছে। তাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনতে না পারলে বিপদ হতে পারে। চিকিৎসাও হচ্ছে না।
রেজা ভাইকে সংক্ষেপে হামিদার বিপদের কথা জানালে তিনিও স্তম্ভিত হয়ে আমার হাত চেপে ধরলেন, কী সাংঘাতিক! এতক্ষণ এখবরটা আমাকে বলেন নি কেন? আমাদের কয়েকটা শক্তিশালী ইউনিট ঢাকায় কাজ করছে। এ ব্যাপারে তারা খুবই সাহায্য করতে পারবে। তাছাড়া আমাদের যে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি হল সেটা পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটিকে রিপোর্ট করতে হলেও ঢাকার কাছাকাছি এক জায়গায় আমাকে গিয়ে পৌঁছুতে হবে। আর আপনি তো জানেন আমাদের একজন কমরেড গৌহাটিতে ভারতীয় ইন্টেলিজেন্সের হাতে আটকা পড়ে আছে। তাকে ছাড়াতে হলেও আমাকে ঢাকা হয়ে আসামে ঢুকতে হবে। আপনার স্ত্রীর অবস্থানের খবর আমাকে জানালে তার চিকিৎসার ভার আমাদের ইউনিটগুলো নিতে পারবে বলে ধারণা করি।
আপনাকে অনেক ধন্যবাদ রেজা ভাই। আমার ভগ্নিপতি এখনও আমার স্ত্রীর অবস্থানের কথা আমাকে স্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। শুধু বলেছেন তিনি শাজাহানপুরে একটি বাড়িতে আপাতত আশ্রয় পেয়েছেন। আশ্রয়টি খুব নিরাপদ নয়। সেখান থেকে তাকে অবিলম্বে সরিয়ে আনতে হবে।
এ ব্যাপারে আমাদের লোকেরা সাধ্যমতো সাহায্য করবে। আমাদের একটা মেডিক্যাল ইউনিট আছে তারা চিকিৎসার ব্যবস্থাও করবে।
