আশংকা
তার হাতে কোনো মন্ত্রপূত ডুগডুগি
অথবা জাদুর বাঁশি নেই,
তবু কেন ওর পেছনে পেছনে ছুটে চলেছে এত লোক?
ছোট ছোট হৈ-হৈ ছেলেমেয়েরা ওর পিছু নেবে,
এমন উন্মাদ সে নয়। মাথা উঁচিয়ে
সে হাঁটছে, দৃষ্টি দূর দিগন্তের দিকে।
কোনো রঙিন বিজ্ঞাপনের ফুরফুরে কাগজ
সে উড়িয়ে দিচ্ছে না হাওয়ায়,
তার হাত থেকে ঝরছে না রাজনৈতিক ইস্তাহার।
কাউকে কাছে ডাকার
স্পৃহা লতিয়ে ওঠেনি, তার মনে, বরং সে
নিজের ভেতর ডুবসাঁতার দেয় সারাক্ষণ।
মাঝে-মধ্যে রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে
সে ভাবে- এই প্রাচীনকালের মুক্তোর মতো চাঁদ
ঝুঁকে আছে তার উপর, চকচকে কিছু মাছ
তন্দ্রার তটে এসে বুড়বুড়ি কাটে, এরা কি মনে রাখবে
তাকে? আর যারা না চাইতেই ওর পিঠ
লক্ষ ক’রে ছোটে উদ্দাম, একদিন তারা ওকে
পায়ে মাড়িয়ে যাবে না তো? সে কি তখন
মাংসের করুণ দলা হ’য়ে পড়ে থাকবে ধুলোয়?
না কি সে মন্ত্রটন্ত্র ছাড়াই কোনও চৈত্রপূর্ণিমায়
হ’য়ে যাবে মনপবনের দাঁড়!
একজন
সজীব আঠারোতেই রুক্ষ, তামসিক
প্রতিক্রিয়াশীলতার ব্যাকুল খাদেম,
প্রট্রোডলারের
ঝলকানি-লাগা
খালিশ, নিরেট
ভোগবাদী নেতাদের বাক্চমকে আবিষ্ট,
নাৎসী-আনুগত্যে নতজানু সর্বক্ষণ।
তার করোটিতে
বৃষ্টিপাত-পরবর্তী রামধনু নেই,
জ্যোৎস্নাবিহ্বলতা নেই। সুদূর, গুমোট
আইয়ামে জাহেলিয়াতের
অন্ধকার মাথায় ঘা-ভর্তি
গ্রীষ্মের কুকুর যেন, জিভ বের ক’রে
হাঁপায় কেবল।
সূর্যোদায়-রহিত মনের আস্ফালনে
ধুন্ধুমার ফুঁ দিয়ে নেভায়
মঙ্গল প্রদীপগুলি যখন তখন আর প্রগতির ঋদ্ধ গ্রন্থমালা
আগুনের বুকে ছুঁড়ে ফেলে
হাত সেঁকে নেয় ঘটা ক’রে
উঠতে বসতে করে কার্ল মার্কস-এর মুণ্ডপাত।
শহরের ঠেঙাডে প্রহরে গর্দানের রোঁয়া-খাড়া
নেকড়ের মতো ঘোরে রাস্তায় রাস্তায়,
মারণাস্ত্র হাতে মধ্যরাতে দমাদম
লাথি মারে শ্রীমন্ত শুভ-র শান্তিখচিত দরজায়।
এখানে রেখেছি লিখে
আমার স্বপ্নের ঘাটে বৃষ্টি পড়ে, টগবগে
সাদা ঘোড়া পা ঠোকে পিছল
মাটিতে, যদি সে পড়ে যায় মুখ থুবড়ে, পাতাগুলি
সসম্ভ্রমে ঢেকে দেবে তাকে। বজরায়
কে বধূ রয়েছে ব’সে সালংকারা? তার মনোভার
পারে না সরিয়ে দিতে স্তব্ধ নিশীথের জলধারা।
আমার স্বপ্নের ঘাটে ঈশ্বর পুত্রের আংরাখা
বুকে চেপে নারী করে অশ্রুপাত, তার
ওপর নক্ষত্র ঝরে, দেবদূত ওড়ে আর চারণ কবির
কণ্ঠস্বরে সৃষ্টি হয় জ্যোৎস্নাস্নাত মানবিক গাথা।
জগৎ সংসারে প্রতি যুগে মানব সন্তান কত
ক্রুশবিদ্ধ হয়, রক্ত মুছে যায় তাণ্ডবে, আমেন।
২
‘কবিকে পোছে না কেউ,’ ব’লে এক গলির মাস্তান
গুলী ছোঁড়ে মেঘের মুলুকে। কুকুরেরা চিৎকারে বমন
করে ভীতি। কবি কিশোরের পাণ্ডুলিপি
গুণ্ডার পায়ের নিচে কবুতরছানা। এই দৃশ্য দেখে কিছু
দু’চোখে অঞ্জনমাখা ভণ্ড ধর্মাশ্রয়ী হো হো হাসে, উহাদের
হিংস্র দাঁতে
জ্যোৎস্নাও পারে না দিতে সৌন্দর্য প্রলেপ। ছিন্নবেশ
উন্মাদের অট্রহাসি বরং অধিক
রমণীয় মনে হয়। বসিয়া বিজনে কেন একা মনে কবি
বৃষ্টিতে ভেজাও দুঃখ? কেন
বুকের ভেতরে জ্বালা প্রগাঢ় আগুন ছন্নছাড়া প্রার্থনায়?
৩
বয়স ঢলেছে বটে পশ্চিম আকাশে,
তবু শব্দবোধ
সঠিক হ’ল না মঞ্জরিত। দুরাশায়
করেছি মেঘের চাষ দারুণ খরায়। চোখমুখ
হায়, জ্বলে পুড়ে যায় রোদের ছ্যাঁকায়। বৃষ্টিহীন
দীর্ঘ দিবসের ভস্মকণা
দু’চোখে ফোটায় পিন। দুঃস্থ কৃষকের,
মজুরের চালডাল চকিতে নেপোয় দেয় মেরে।
এ শ্রাবণে হায়রে এমন ঘন ঘোর বরিষায়
ফুটোময় টিনের ছাদের
তলায় এভাবে প্রাণাধিক বিবি বাচ্চা নিয়ে বাস করা দায়।
আত্মত্যাগী, রুক্ষ বুদ্ধিজীবী
ঢাউস বইয়ের পাতা চেখে নিজেকে বলেন আজো
বলেন জনসভায় ধারালো ভাষায়,
‘এ সংকটে মার্কসীয় দর্শন ছাড়া মুক্তি নেই কোনো।
কম্যুনিস্ট মেনিফেস্টো সবার মুখস্থ থাকা চাই।
সমাজতন্ত্রের কথা অমৃত সমান,
শ্রেণীচ্যুত কবি ভনে, শোনো পুণ্যবান।
৪
কীভাবে যে বেঁচে আছি পিশাচ নগরে! দিনদুপুরেই দেখি
গুম হ’য়ে যায় লোক, নগররক্ষীরা নিদ্রাতুর,
পাহারা ভরসাছুট, সকলেই নিষ্ক্রিয় দর্শক। পচা মাংসের
দুর্গন্ধ
বেড়ে যায়; যে কোনো মুহূর্তে অন্ধকার ঘাড়ে নিয়ে
ভিক্ষুর মুদ্রায় আমি চলে যেতে পারি,
বহু পথ ঘুরে টলটলে দিঘির কিনারে এসে
শান্তিজল আঁজলায় তুলে নেব, হাওয়ায় উড়বে
বৈকালী চীবর।
৫
এখানে রেখেছি লিখে নিজেকে নানান ছাঁদে, ছোঁও,
ছুঁয়ে দেখো, আমার হৃৎপিণ্ড কীরকম
বেজে ওঠে নিরিবিলি। শব্দগুলি মিলনপ্রয়াসী
রমণীর মতো বুক উন্মোচন ক’রে দেবে। কেউ
গৈরিক বাউল হ’য়ে একতারা হাতে এক পাক ঘুরে এ
গহন
দুপুরে উঠবে গেয়ে গান, কেউ ত্র্যাকর্ডিয়নের
রীডে তার আঙুল নাচাবে। এই লেখা অকস্মাৎ
আর্তস্বরে ব’লে দেবে হৃদয়ের উষ্ণ-অশ্রুজলে-
আমার শৈশব আর আমার কৈশোর
সেই কবে বিক্রি হ’য়ে গেছে কোলাহলে আঁশটে হাটে;
যৌবন যে বাজেয়াপ্ত হ’ল কবে, নিজেই জানি না। খুঁজে
দেখো,
আমার স্পন্দিত বুকে স্তরময় বিষাদের খনি।
এখানে রেখেছি লিখে অন্যমনস্কভাবে, নাকি
গৃঢ় ঘোরে সে গাছের কথা, নিষ্পত্র যে,
যার ডালে ভুলেও বসে না কোনো পাখি,
যে দাঁড়িয়ে থাকে দিনভরা রাতভর বজ্রাহত অভিমানে।