তোমার ঘুম
কতকাল তোমার সঙ্গে আমার দেখা নেই,
তোমার কণ্ঠস্বর শুনি না কতকাল। যিশুখৃষ্ট
ক্রুশে বিদ্ধ হবার পর
যতদিন গেছে অস্তাচলে, ততদিন তোমার
চোখের চাওয়া আর
স্পর্শের বিদ্যুচ্চমক থেকে আমি বঞ্চিত, মনে হয়।
যখন তোমাকে ফোন করি, তখন
ওপারে একটি ধ্বনি হতে থাকে ক্রমাগত একঘেয়েমির
মতো। কোনো সাড়া মেলে না।
কখনো কেউ রিসিভার তুলে রডিওর ঘোষকের
বলবার ধরন গলায় এনে জানায় তুমি বাড়ি নেই,
আবার কখনো শুনি ঘুমোচ্ছ তুমি।
যখন ঘুমোবার কথা নয়, তখন ঘুমোচ্ছ জেনে
কেমন খটকা লাগে। ভাবি তবে কি
তুমি কোনো জাদুবলে রূপকথার সেই
ঘুমন্ত সুন্দরী হয়ে গেলে? আবার ভাবনাকে
অন্য বাঁকে নিয়ে নিজেকে
প্রবোধ দিই, কারো কারো ঘুম রাত থেকে
মধ্য দুপুর অব্দি গড়ায়, গড়াতেই পারে। তাই
এ নিয়ে নালিশ রুজু করা নিরর্থক। বরং
নিজের ভাগ্যকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে
বলি, আমাদের সংযোগের মুহূর্তটাই রাগুগ্রস্ত।
অথচ বাদশাহ সুলেমানের আমলের রত্নের মতো
কত মুহূর্ত আমাদের কেটেছে
তোমার ড্রইংরুমে। তখন তোমাকে ব্যাবিলনের
উদ্যানের কোনো মনোরম, দুর্লভ, তম্বী গাছ ভেবে
তাকিয়ে থেকেছি তোমার দিকে। এবং
আমার দৃষ্টিতে বিহ্বলতা পাঠ করে বলেছো,
কী দেখছো অমন ক’রে? সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে
দ্রুত পাতা ওল্টাতাম ম্যাগাজিনের,
অথবা দৃষ্টি মেলে দিতাম তোমার বাগানের দিকে। দূর অতীত
আর বর্তমান বইতো এক লয়ে পাখির গানে।
অসহ্য এই বিচ্ছেদ যা আমাকে দিনের পর দিন
রাত্রির পর রাত্রি
তোমার ছায়া নিয়ে তৃপ্ত থাকতে জপায়। এই বিচ্ছেদ
উজিয়ে আমি বেঁচে আছি, একথা ভেবে
নিজেকেই কেমন অপরাধী মনে হয়। অথচ তুমিহীনতা
আমাকে জড়িয়ে রাখে কবিতার সঙ্গে
সারাক্ষণ, যেমন বিশ্বাস
প্রাণের স্পন্দনকে। আর কবিতা তৈরি করে
এমন এক পথ, যে-পথ তোমার আসার
মুহূর্তের জন্য বারবার মরীয়া কণ্ঠস্বর হয়।
আজো দুপুরবেলা তোমাকে ফোন করবার পর
ঠাণ্ডা নিঃস্পৃহ এক কণ্ঠস্বর জানালো
তুমি ঘুমিয়ে আছো। সেই কণ্ঠস্বর আমাকে এক ঝটকায়
ছুড়ে দিলে আমার শহরের জনহীন রাস্তায় আর
নৈরাশ্যের সূর্যাস্তের ভেতর। একটা ভয় লিকলিকে
সরীসৃপের ধরনে আমাকে
চাটতে থাকে-তাহ’লে কি আমি অবিরাম ডায়াল
করতে করতে মেথুসেলা হয়ে যাবো? এখন সব পাখি
ঘুমের গুহায় পাখা গুটিয়ে নিঝুম, সকল নদী
ঘুমে প্লাবিত করছে গ্রাম, জনপদ। আমার আয়না জুড়ে
ঘুমিয়ে আছে এক নারী, যে ভুলে গেছে ভালোবাসার
ভাষা। তোমার হৃদয় ঘুমিয়ে পড়েনি তো?
ধন্য সেই পুরুষ
ধন্য সেই পুরুষ, নদীর সাঁতার পানি থেকে যে উঠে আসে
সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে,
ধন্য সেই পুরুষ, নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে যে নেমে আসে
প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়;
ধন্য সেই পুরুষ, হৈমন্তিক বিল থেকে যে উঠে আসে
রঙ-বেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে।
ধন্য সেই পুরুষ কাহাতের পর মই-দেয়া ক্ষেত থেকে যে ছুটে আসে
ফসলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে।
ধন্য আমরা, দেখতে পাই দূর দিগন্ত থেকে এখনো তুমি আসে
আর তোমারই প্রতীক্ষায়
ব্যাকুল আমাদের প্রাণ, যেন গ্রীষ্মকাতর হরিণ
জলধারার জন্যে। তোমার বুক ফুঁড়ে অহংকারের মতো
ফুটে আছে রক্তজবা, আর
আমরা সেই পুষ্পের দিকে চেয়ে থাকি, আমাদের
চোখের পলক পড়তে চায়না,
অপরাধে নত হয়ে আসে আমাদের দুঃস্বপ্নময় মাথা।
দেখ, একে একে, সকলেই যাচ্ছে বিপথে অধঃপাত
মোহিনী নর্তকীর মতো
জুড়ে দিয়েছে বিবেক-ভোলানো নাচ মনীষার মিনারে,
বিশ্বাস্ততা চোরা গর্ত খুঁড়ছে সুহৃদের জন্যে
সত্য খান খান হয়ে যাচ্ছে যখন তখন
কুমোরের ভাঙা পাত্রের মতো,
চাটুকারদের ঠোঁটে অষ্টপ্রহর ছোটে কথার তুবড়ি,
দেখ, যে কোন ফলের গাছ
সময়ে-অসময়ে ভরে উঠছে শুধু মাকাল ফলে।
ঝলসে-যাওয়া গাসের মতো শুকিয়ে যাচ্ছে মমতা
দেখ, এখানে আজ
কাক আর কোকিলের মধ্যে কোনো ভেদ নেই।
নানা ছল ছুতোয়
স্বৈরাচারের মাথায় মুকুট পরাচ্ছে ফেরেব্বাজের দল।
দেখ, প্রত্যেকটি মানুষের মাথা
তোমার হাঁটুর চেয়ে এক তিল উঁচুতে উঠতে পারছে না কিছুতেই।
তোমাকে হারিয়ে
আমরা সন্ধ্যায় হারিয়ে যাওয়া ছায়ারই মতো
হয়ে যাচ্ছিলাম,
আমাদের দিনগুলি ঢেকে যাচ্ছিল শোকের পোশাকে,
তোমার বিচ্ছেদের সংকটের দিনে
আমরা নিজেদের ধ্বংসস্তূপে বসে বিলাপে ক্রন্দনে আকাশকে বাধিত
করে তুলেছিলাম ক্রমাগত; তুমি সেই বিলাপকে
রূপান্তরিত করেছো জীবনের স্ততিগানে। কেননা জেনেছি
জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত তুমি।
ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের ওপর রৌদ্র ঝরে
চিরকাল, গান হয়ে
নেমে অসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা; যাঁর নামের ওপর
কখনো ধুলো জমতে দেয়না হাওয়া,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয়
জ্যোৎস্নার সারস,
ধন্য সেই পুরুষ, যাঁর নামের উপর পতাকার মতো
দুলতে থাকে স্বাধীনতা,
ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে
মুক্তোযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।
নগ্ন স্তব্ধতা
যে-কোনো দিনেরই মতো তিমিরের নাড়ী-ছেঁড়া আলো
ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। একটি তরুণী
লাল নীল ঘুড়ি
ছেড়ে দেয় বায়ু স্তরে; বিকেলে চায়ের কাপে প্রফুল্ল চুমুক,
ঘোরানো সিঁড়িতে গাঢ়-মিহি স্বরে কথোপকথন,
ছাদের ওপারে ছিল জ্বলজ্বলে ডাগর বেলুন,
চাঁদ বলি তাকে। কবি তাঁর
শব্দের ঝর্ণাকে ব্যালে শিক্ষকের ধরনে নিপুণ
পরিচালনায়
মোহন গন্তব্যে পৌঁছে দেন। এখানে আগুন নিয়ে
দ্যুতি, বলে তাঁকে গাছপালা,
নীড়ে-ফেরা পাখি, অস্তরাগময় শহরে কলোনি।
অকস্মাৎ চতুদিকে দৃষ্টি-অন্ধ করা কী বিপুল
উদ্ভাসন; মাটিতে আগুন,
লতাগুল্ম, গাছে-গাছে গোলাপের, চামেলীর পরাগে আগুন,
পাথরে-পাথরে লকলকে
জিভের মতন জ্বলে আগ্রাসী আগুন,
পশুপাখি, মানুষের ভেতরে আগুন, অন্তরীক্ষে,
জলের ওপরে আর ভেতরে আগুন জ্বলে; যেন এ-শহর
পরেছে চকিতে উরু, জানু, বুক, মাথা
জুড়ে আগুনের শাড়ি। মর্ত্যভূমি বজ্ররশ্মিজালে
বন্দি হয়ে চোখের পলকে রূপান্তরে কী উত্তপ্ত ভস্মাধার।
সাইরেন বড় মূক, ঘোষণা করার মতো কোনো
কণ্ঠস্বর নেই
এখন কোথাও। সংখ্যাহীন ঝলসানো গোরু-ঘোড়া
মাঠে কি গোয়ালে, আস্তাবলে পড়ে আছে
ইতস্তত ভীষণ নিষ্প্রাণ, প্রভুভক্ত কুকুরের ক্ষয়ে-যাওয়া
নিঃস্পন্দ শরীর সমর্পিত
নগ্ন বারান্দায় নৈবেদ্যের মতো। নিস্তব্ধ বসন্ত, পাখিদের
অজস্র কংকাল নগ্ন গাছে-গাছে। এমনকি পাথরের নিচে যতো
প্রাণী টিকে থাকে প্রতিহিংসার মতো,
তারাও এখন চিহ্নহীন।
মাটি আর দেবে না কিছুই। কোনোখানে এক ফোঁটা
জল নেই ভয়ানক দূষণ ব্যতীত। ফলমূল
কোথাও নির্দোষ নেই আর। খাদ্য আছে শস্যাগারে,
অথচ ভক্ষণযোগ্য নয় এককণা।
তেজস্ক্রিয় ভস্মের ঘোমটা-টানা পৃথিবীর ঠোঁটে,
রোদ চুমো খায় পুনরায়। কিন্তু এই রোদ নিয়ে
উৎসব করার মতো কোনো প্রাণী নেই।
দশ দিকে। মহাজন অথবা ঘাতক, গৃহী কিংবা
ঘরছাড়া চিরপলাতক, জুয়াড়ী অথবা নববিলাসের
টানে সাতঘাট জল-খাওয়া বাবু, দূরন্ত সাহেব,
অথবা পটের বিবি, বেশ্যার দালাল,
তুখোড় দোকানদার অথবা খদ্দের,
ট্রাফিক পুলিশ কিংবা ধাবমান যান,
মুর্দা কিংবা মুর্দাফরাস কারুরই
নামগন্ধ নেই।
যোজন যোজনব্যাপী ধুধু চরাচরে। ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে
থরে থরে সাজানো কৌটায়,
নানান রঙের জামা কাপড়ের ভাঁজে ভাঁজে আর
কার্পেটে পাপোষে মৃত্যু বুঁদ হয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণে
ঠোঁট চাটে টুপ ভুজঙ্গ মৃত্যু, যেন
নিজেকেই আকণ্ঠ করবে পান। চতুর্দিকে ক্রুর দাবদাহ,
বস্তুত পৃথিবী পঞ্চতপা।
হঠাৎ ভূতল থেকে কেউ
উঠে আসে হামাগুড়ি দিয়ে কায়ক্লেশে আদিম শিশুর মতো,
পারে না তাকাতে ঝলসিত পৃথিবীর দিকে, চোখ
তুলতেই দ্যাখে একজন এক টুকরো আনন্দের মতো ফল
বাড়িয়ে দিয়েছে তার প্রতি রমণীয় ভঙ্গিমায়।
নারী আর পুরুষের তীব্র থরো থরো
আলিঙ্গনে আদিগন্ত নগ্ন স্তব্ধতায়
আনন্দ-বেদনা জাত কবিতার মতো হেসে ওঠে ভালোবাসা।
