আজ কি আমায় গাইতে হবে
নীল আকাশের নির্জন গান ?
নীড়ের বাঁধন ভুলে গিয়ে
ছড়িয়ে দেব মুক্ত পরান ?
গন্ধবিহীন বায়ুস্তরে
শব্দবিহীন শূন্য ‘ পরে
ছায়াবিহীন জ্যোতির মাঝে
সঙ্গীবিহীন নির্মমতায়
মিশে যাব অবাধ সুখে ,
উড়ে যাব ঊর্ধ্বমুখে ,
গেয়ে যাব পূর্ণসুরে
অর্থবিহীন কলকথায় ?
আপন মনের পাই নে দিশা ,
ভুলি শঙ্কা , হারাই তৃষা ,
যখন করি বাঁধন – হারা
এই আনন্দ – অমৃত পান ।
তবু নীড়েই ফিরে আসি ,
এমনি কাঁদি এমনি হাসি ,
তবুও এই ভালোবাসি
আলোছায়ার বিচিত্র গান ।
পথিক
পথিক ওগো পথিক , যাবে তুমি ,
এখন এ যে গভীর ঘোর নিশা ।
নদীর পারে তমালবনভূমি
গহন ঘন অন্ধকারে মিশা ।
মোদের ঘরে হয়েছে দীপ জ্বালা ,
বাঁশির ধ্বনি হৃদয়ে এসে লাগে ,
নবীন আছে এখনো ফুলমালা ,
তরুণ আঁখি এখনো দেখো জাগে ।
বিদায়বেলা এখনি কি গো হবে ,
পথিক ওগো পথিক , যাবে তবে ?
তোমারে মোরা বাঁধি নি কোনো ডোরে ,
রুধিয়া মোরা রাখি নে তব পথ ।
তোমার ঘোড়া রয়েছে সাজ পরে ,
বাহিরে দেখো দাঁড়ায়ে তব রথ ।
বিদায়পথে দিয়েছি বটে বাধা
কেবল শুধু করুণ কলগীতে ।
চেয়েছি বটে রাখিতে হেথা বাঁধা
কেবল শুধু চোখের চাহনিতে ।
পথিক ওগো , মোদের নাহি বল ,
রয়েছে শুধু আকুল আঁখিজল ।
নয়নে তব কিসের এই গ্লানি ,
রক্তে তব কিসের তরলতা ।
আঁধার হতে এসেছে নাহি জানি
তোমার প্রাণে কাহার কী বারতা ।
সপ্তঋষি গগনসীমা হতে
কখন কী যে মন্ত্র দিল পড়ি—
তিমির – রাতি শব্দহীন স্রোতে
হৃদয়ে তব আসিল অবতরি ।
বচনহারা অচেনা অদ্ভুত
তোমার কাছে পাঠালো কোন্ দূত ।
এ মেলা যদি না লাগে তব ভালো ,
শান্তি যদি না মানে তব প্রাণ ,
সভার তবে নিবায়ে দিব আলো ,
বাঁশির তবে থামায়ে দিব তান ।
স্তব্ধ মোরা আঁধারে রব বসি ,
ঝিল্লিরব উঠিবে জেগে বনে ,
কৃষ্ণরাতে প্রাচীন ক্ষীণ শশী
চক্ষে তব চাহিবে বাতায়নে ।
পথপাগল পথিক , রাখো কথা ,
নিশীথে তব কেন এ অধীরতা ।
পথের শেষ
পথের নেশা আমায় লেগেছিল ,
পথ আমারে দিয়েছিল ডাক—
সূর্য তখন পূর্বগগনমূলে ,
নৌকা তখন বাঁধা নদীর কূলে ,
শিশির তখন শুকায় নিকো ফুলে ,
শিবালয়ে উঠল বেজে শাঁখ ।
পথের নেশা তখন লেগেছিল ,
পথ আমারে দিয়েছিল ডাক ।
আঁকাবাঁকা রাঙা মাটির লেখা
ঘরছাড়া ওই নানা দেশের পথ—
প্রভাত – কালে অপার – পানে চেয়ে
কী মোহগান উঠতেছিল গেয়ে ,
উদার সুরে ফেলতেছিল ছেয়ে
বহুদূরের অরণ্য পর্বত ।
নানা দিনের নানা – পথিক – চলা
ঘরছাড়া ওই নানা দেশের পথ ।
ভাবি নাইকো কেন কিসের লাগি
ছুটে চলে এলেম পথের’পরে ।
নিত্য কেবল এগিয়ে চলার সুখ ,
বাহির হওয়ার অনন্ত কৌতুক ,
প্রতি পদেই অন্তর উৎসুক
অজানা কোন্ নিরুদ্দেশের তরে ।
ভোরের বেলা দুয়ার খুলে দিয়ে
বাহির হয়ে এলেম পথের’পরে ।
বেলা এখন অনেক হয়ে গেছে ,
পেরিয়ে চলে এলেম বহু দূর ।
ভেবেছিলেম পথের বাঁকে বাঁকে
নব নব ভাগ্য আমায় ডাকে ,
হঠাৎ যেন দেখতে পাব কাকে ,
শুনতে যেন পাব নূতন সুর ।
তার পরে তো অনেক বেলা হল ,
পেরিয়ে চলে এলেম বহু দূর ।
অনেক দেখে ক্লান্ত এখন প্রাণ ,
ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা ।
এখন কেবল একটি পেলেই বাঁচি ,
এসেছি তাই ঘাটের কাছাকাছি—
এখন শুধু আকুল মনে যাচি
তোমার পারে খেয়ার তরী ভাসা ।
জেনেছি আজ চলেছি কার লাগি
ছেড়েছি সব অকস্মাতের আশা ।
প্রচ্ছন্ন
কোথা ছায়ার কোণে দাঁড়িয়ে তুমি কিসের প্রতীক্ষায়
কেন আছ সবার পিছে ।
যারা ধুলা – পায়ে ধায় গো পথে , তোমায় ঠেলে যায় ,
তারা তোমায় ভাবে মিছে ।
আমি তোমার লাগি কুসুম তুলি , বসি তরুর মূলে ,
আমি সাজিয়ে রাখি ডালি—
ওগো , যে আসে সেই একটি – দুটি নিয়ে যে যায় তুলে ,
আমার সাজি হয় যে খালি ।
ওগো , সকাল গেল , বিকাল গেল , সন্ধ্যা হয়ে আসে ,
চোখে লাগছে ঘুমঘোর ।
সবাই ঘরের পানে যাবার বেলা আমায় দেখে হাসে ,
মনে লজ্জা লাগে মোর ।
আমি বসে আছি বসনখানি টেনে মুখের’পরে
যেন ভিখারিনীর মতো—
কেহ শুধায় যদি ‘কী চাও তুমি ‘ থাকি নিরুত্তরে
করি দুটি নয়ন নত ।
আজি কোন্ লাজে বা বলব আমি ‘তোমায় শুধু চাহি ‘ ,
আমি বলব কেমন করে—
শুধু তোমারি পথ চেয়ে আমি রজনী দিন বাহি ,
তুমি আসবে আমার তরে ।
আমার দৈন্যখানি যত্নে রাখি , রাজৈশ্বর্যে তব
তারে দিব বিসর্জন—
ওগো , অভাগিনীর এ অভিমান কাহার কাছে কব ,
তাহা রইল সংগোপন ।
আমি সুদূর – পানে চেয়ে চেয়ে ভাবি আপন – মনে
হেথা তৃণে আসন মেলে—
তুমি হঠাৎ কখন আসবে হেথায় বিপুল আয়োজনে
তোমার সকল আলো জ্বেলে ।
তোমার রথের’পরে সোনার ধ্বজা ঝলবে ঝলমল ,
সাথে বাজবে বাঁশির তান—
তোমার প্রতাপ – ভরে বসুন্ধরা করবে টলমল ,
আমার উঠবে নেচে প্রাণ ।
তখন পথের লোকে অবাক হয়ে সবাই চেয়ে রবে ,
তুমি নেমে আসবে পথে ;
হেসে দু হাত ধরে ধুলা হতে আমায় তুলে লবে—
তুমি লবে তোমার রথে ।
আমার ভূষণবিহীন মলিন বেশে ভিখারিনীর সাজে
তোমার দাঁড়াব বাম পাশে ,
তখন লতার মতো কাঁপব আমি গর্বে সুখে লাজে
সকল বিশ্বের সকাশে ।
ওগো , সময় বয়ে যাচ্ছে চলে , রয়েছি কান পেতে—
কোথা কই গো চাকার ধ্বনি ।
তোমার এ পথ দিয়ে কত – না লোক গর্বে গেল মেতে
কতই জাগিয়ে রনরনি ।
তবে তুমিই কি গো নীরব হয়ে রবে ছায়ার তলে ,
তুমি রবে সবার শেষে—
হেথায় ভিখারিনীর লজ্জা কি গো ঝরবে নয়নজলে ।
তারে রাখবে মলিন বেশে ?
