প্রতীক্ষা
আমি এখন সময় করেছি—
তোমার এবার সময় কখন হবে ।
সাঁঝের প্রদীপ সাজিয়ে ধরেছি—
শিখা তাহার জ্বালিয়ে দেবে কবে ।
নামিয়ে দিয়ে এসেছি সব বোঝা ,
তরী আমার বেঁধে এলেম ঘাটে—
পথে পথে ছেড়েছি সব খোঁজা ,
কেনা বেচা নানান হাটে হাটে ।
সন্ধ্যাবেলায় যে মল্লিকা ফুটে
গন্ধ তারি কুঞ্জে উঠে জাগি ।
ভরেছি জুঁই পদ্মপাতার পুটে
তোমার করপদ্মদলের লাগি ।
রেখেছি আজ শান্ত শীতল ক’রে
অঙ্গন মোর চন্দনসৌরভে ।
সেরেছি কাজ সারাটা দিন ধরে—
তোমার এবার সময় কখন হবে ।
আজিকে চাঁদ উঠবে প্রথম রাতে
নদীর পারে নারিকেলের বনে ,
দেবালয়ের বিজন আঙিনাতে
পড়বে আলো গাছের ছায়া – সনে ।
দখিন – হাওয়া উঠবে হঠাৎ বেগে ,
আসবে জোয়ার সঙ্গে তারি ছুটে—
বাঁধা তরী ঢেউয়ের দোলা লেগে
ঘাটের’পরে মরবে মাথা কুটে ।
জোয়ার যখন মিশিয়ে যাবে কূলে ,
থম্থমিয়ে আসবে যখন জল ,
বাতাস যখন পড়বে ঢুলে ঢুলে ,
চন্দ্র যখন নামবে অস্তাচল ,
শিথিল তনু তোমার ছোঁওয়া ঘুমে
চরণতলে পড়বে লুটে তবে ।
বসে আছি শয়ন পাতি ভূমে—
তোমার এবার সময় হবে কবে ।
প্রভাতে
এক রজনীর বরষনে শুধু
কেমন করে
আমার ঘরের সরোবর আজি
উঠেছে ভরে ।
নয়ন মেলিয়া দেখিলাম ওই
ঘন নীল জল করে থইথই ,
কূল কোথা এর , তল মেলে কই ,
কহো গো মোরে—
এক বরষায় সরোবর দেখো
উঠেছে ভরে ।
কাল রজনীতে কে জানিত মনে
এমন হবে
ঝরঝর বারি তিমিরনিশীথে
ঝরিল যবে—
ভরা শ্রাবণের নিশি দু – পহরে
শুনেছিনু শুয়ে দীপহীন ঘরে
কেঁদে যায় বায়ু পথে প্রান্তরে
কাতর রবে—
তখন সে রাতে কে জানিত মনে
এমন হবে ।
হেরো হেরো মোর অকূল অশ্রু –
সলিলমাঝে
আজি এ অমল কমলকান্তি
কেমনে রাজে ।
একটিমাত্র শ্বেত শতদল
আলোকপুলকে করে ঢলঢল ,
কখন ফুটিল বল্ মোরে বল্
এমন সাজে
আমার অতল অশ্রুসাগর –
সলিলমাঝে!
আজি একা বসে ভাবিতেছি মনে
ইহারে দেখি ,
দুখযামিনীর বুক – চেরা ধন
হেরিনু এ কী ।
ইহারি লাগিয়া হৃদ্বিদারণ ,
এত ক্রন্দন , এত জাগরণ ,
ছুটেছিল ঝড় ইহারি বদন
বক্ষে লেখি ।
দুখযামিনীর বুক – চেরা ধন
হেরিনু এ কী ।
প্রার্থনা
আমি বিকাব না কিছুতে আর
আপনারে ।
আমি দাঁড়াতে চাই সভার তলে
সবার সাথে এক সারে ।
সকালবেলার আলোর মাঝে
মলিন যেন না হই লাজে ,
আলো যেন পশিতে পায়
মনের মধ্যে একবারে ।
বিকাব না , বিকাব না
আপনারে ।
আমি বিশ্ব – সাথে রব সহজ
বিশ্বাসে ।
আমি আকাশ হতে বাতাস নেব
প্রাণের মধ্যে নিশ্বাসে ।
পেয়ে ধরার মাটির স্নেহ
পুণ্য হবে সর্ব দেহ ,
গাছের শাখা উঠবে দুলে
আমার মনের উল্লাসে ।
বিশ্বে রব সহজ সুখে
বিশ্বাসে ।
আমি সবায় দেখে খুশি হব
অন্তরে ।
কিছু বেসুর যেন বাজে না আর
আমার বীণা – যন্তরে ।
যাহাই আছে নয়ন ভরি
সবই যেন গ্রহণ করি ,
চিত্তে নামে আকাশ – গলা
আনন্দিত মন্ত্র রে ।
সবায় দেখে তৃপ্ত রব
অন্তরে ।
ফুল ফোটানো
তোরা কেউ পারবি নে গো ,
পারবি নে ফুল ফোটাতে ।
যতই বলিস , যতই করিস ,
যতই তারে তুলে ধরিস ,
ব্যগ্র হয়ে রজনীদিন
আঘাত করিস বোঁটাতে—
তোরা কেউ পারবি নে গো ,
পারবি নে ফুল ফোটাতে ।
দৃষ্টি দিয়ে বারে বারে
ম্লান করতে পারিস তারে ,
ছিঁড়তে পারিস দলগুলি তার ,
ধুলায় পারিস লোটাতে—
তোদের বিষম গণ্ডগোলে
যদিই – বা সে মুখটি খোলে ,
ধরবে না রঙ , পারবে না তার
গন্ধটুকু ছোটাতে ।
তোরা কেউ পারবি নে গো ,
পারবি নে ফুল ফোটাতে ।
যে পারে সে আপনি পারে ,
পারে সে ফুল ফোটাতে ।
সে শুধু চায় নয়ন মেলে
দুটি চোখের কিরণ ফেলে ,
অমনি যেন পূর্ণপ্রাণের
মন্ত্র লাগে বোঁটাতে ।
যে পারে সে আপনি পারে ,
পারে সে ফুল ফোটাতে ।
নিশ্বাসে তার নিমেষেতে
ফুল যেন চায় উড়ে যেতে ,
পাতার পাখা মেলে দিয়ে
হাওয়ায় থাকে লোটাতে ।
রঙ যে ফুটে ওঠে কত
প্রাণের ব্যাকুলতার মতো ,
যেন কারে আনতে ডেকে
গন্ধ থাকে ছোটাতে ।
যে পারে সে আপনি পারে ,
পারে সে ফুল ফোটাতে ।
বন্দী
‘ বন্দী , তোরে কে বেঁধেছে
এত কঠিন ক’রে । ‘
প্রভু আমায় বেঁধেছে যে
বজ্রকঠিন ডোরে ।
মনে ছিল সবার চেয়ে
আমিই হব বড়ো ,
রাজার কড়ি করেছিলেম
নিজের ঘরে জড়ো ।
ঘুম লাগিতে শুয়েছিলেম
প্রভুর শয্যা পেতে ,
জেগে দেখি বাঁধা আছি
আপন ভাণ্ডারেতে ।
‘ বন্দী ওগো , কে গড়েছে
বজ্রবাঁধনখানি । ‘
আপনি আমি গড়েছিলেম
বহু যতন মানি ।
ভেবেছিলেম আমার প্রতাপ
করবে জগৎ গ্রাস ,
আমি রব একলা স্বাধীন ,
সবাই হবে দাস ।
তাই গড়েছি রজনীদিন
লোহার শিকলখানা—
কত আগুন কত আঘাত
নাইকো তার ঠিকানা ।
গড়া যখন শেষ হয়েছে
কঠিন সুকঠোর ,
দেখি আমায় বন্দী করে
আমারি এই ডোর ।
বিকাশ
আজ বুকের বসন ছিঁড়ে ফেলে
দাঁড়িয়েছে এই প্রভাতখানি ,
আকাশেতে সোনার আলোয়
ছড়িয়ে গেল তাহার বাণী ।
কুঁড়ির মতো ফেটে গিয়ে
ফুলের মতো উঠল কেঁদে
সুধাকোষের সুগন্ধ তার
পারলে না আর রাখতে বেঁধে ।
ওরে মন , খুলে দে মন ,
যা আছে তোর খুলে দে—
অন্তরে যা ডুবে আছে
আলোক – পানে তুলে দে ।
আনন্দে সব বাধা টুটে
সবার সাথে ওঠ্ রে ফুটে ,
চোখের’পরে আলসভরে
রাখিস নে আর আঁচল টানি ।
আজ বুকের বসন ছিঁড়ে ফেলে
দাঁড়িয়েছে এই প্রভাতখানি ।
