পৃথিবীকেন্দ্ৰিক যে-সব বিশ্ব বা মহাজগত কল্পনা করেছিলেন ইউডোক্সাস, আরিস্তাতল, টলেমি, সেগুলো আজকের মহাজগতের তুলনায় ছিলো খুবই ছোটো। তবে এগুলোর মধ্যে টলেমির বিশ্বই সবচেয়ে বড়ো। তাদের বিশ্ব ছোটো ছিলো, এর মূলে রয়েছে তাদের দুটি বিশ্বাস : একটি হচ্ছে যে বিশ্বের কেন্দ্র হচ্ছে পৃথিবী, অন্যটি হচ্ছে পৃথিবী স্থির। তাদের ভাবনায় পৃথিবী ছিলো অচল, আর সচল ছিলো নক্ষত্রগুলো। ওই নক্ষত্রগুলোকে একদিনে ঘুরতে হতো পৃথিবীর চারদিকে। যদি বিশ্ব খুব বড়ো হতো, তাহলে তারাগুলোকে এতো তীব্ৰ গতিতে ঘুরতে হতো, যা বিশ্বাসযোগ্য মনে হতো না তাদের কাছে। কী ক’রে তারাগুলো এতো দ্রুত ঘুরতে পারে? তাই বিশ্বকে ছোটোরূপে কল্পনা করা ছাড়া কোনো উপায় ছিলো না। পৃথিবী যে ঘুরতে পারে এটা মনেই আসে নি কারো; আপাতদৃষ্টিতে কারোই মনে হয় না। যে পৃথিবী ঘোরে। পৃথিবী কি ঘুরতে পারে? গ্রিক জ্ঞানীরা কেউ কেউ ভেবে দেখেছেন ব্যাপারট, এটা তাদের মনে হয়েছে হাস্যকর; তাদের মনে হয়েছে পৃথিবী ঘুরলে সারাক্ষণ ঝড় বইতো পৃথিবীতে, আর অলিম্পিক খেলোয়াড়রা যেখান থেকে লাফ দিতো পড়তো তার থেকে অনেক সামনে বা অনেক পেছনে, কেননা এর মাঝে পৃথিবী অনেকখানি ঘুরতো। তাই তাঁরা সিদ্ধান্তে আসেন যে পৃথিবী ঘুরতে পারে না। কিন্তু পৃথিবী ঘোরে, মহাজগত অনন্ত; তবে আজো অনেকের বিশ্বাস পৃথিবী ঘোরে না। এর মূলে আছে পৃথিবীর ধর্মের বইগুলো; এগুলোতেই বেশি বিশ্বাস করে অন্ধরা। কোপারনিকাস, কেপলার, আর গ্যালিলিওর জন্মের পরেও সাহিত্য অন্ধ থেকে গেছে। মিল্টন দেখা করেছিলেন গ্যালিলিওর সাথে, তাই তাঁর বিশ্ব বেশ বড়ো; তবু তাঁর স্বৰ্গচ্যুতি মহাকাব্যে পৃথিবীই মহাজগতের কেন্দ্র। ওই কাব্যে এক দেবদূত আদমকে উপদেশ দিয়েছে :
যা কিছু গোপন সে-সব সম্পর্কে চিন্তা কোরো না,
সব ছেড়ে দাও বিধাতার হাতে, সেবা আর ভয় করো তাকে:
…সুখে থাকো
যা কিছু তোমাকে তিনি দিয়েছেন সেই সব, এই স্বর্গ
আর রূপবতী হাওয়াকে নিয়ে; স্বৰ্গ তোমার বোঝার জন্যে অতি উচ্চ
কী ঘটে সেখানে তুমি বুঝবে না; নতভাবে হও জ্ঞানী :
ভাবে শুধু সে-সব যা কিছু প্রাসঙ্গিক তোমার জন্যে;
অন্য জগতের স্বপ্ন দেখো না।
দেবদূতরা চিরকালই অন্ধতা ও আনুগত্যের পরামর্শ দিয়েছে; কিন্তু মানুষ, অন্তত কিছু মানুষ, ওই পরামর্শ শোনে নি। আমরা সারা বিশ্ব সম্পর্কেই ভাবি, সারা মহাজগতই আমাদের জন্যে প্রাসঙ্গিক; এবং আমরা জানি ওই দেবদূত ও তার বিধাতার থেকে অনেক বেশি।
মহাজগত অনন্ত; সবচেয়ে প্রতিভাবান চিন্তাও তার সবটা এখনো বুঝে ওঠে নি, তবে বুঝেছে অনেকখানি, ভবিষ্যতে আরো বুঝবে। মহাজগতের উৎপত্তি হলো কীভাবে? যেভাবেই হোক, বিভিন্ন পুরাণ আর ধর্মের বই যেভাবে হয়েছে ব’লে প্রচার করে, সেভাবে হয় নি। বাইবেল বিশ্বসৃষ্টির যে-গল্পটি বলে, তা এমন :
আদিতে ঈশ্বর আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সৃষ্টি করিলেন। পৃথিবী ঘোর ও শূন্য ছিলো, এবং অন্ধকার জলধির উপরে ছিল, আর ঈশ্বরের আত্মা জলের উপরে অবস্থিতি করিতেছিলেন। পরে ঈশ্বর কহিলেন, দীপ্তি হউক, তাহাতে দীপ্তি হইল। তখন ঈশ্বর দীপ্তি উত্তম দেখিলেন, এবং ঈশ্বর অন্ধকার হইতে দীপ্তি পৃথক করিলেন। আর ঈশ্বর দীপ্তির নাম দিবস ও অন্ধকারের নাম রাত্রি রাখিলেন। আর সন্ধ্যা ও প্রাতঃকাল হইলে প্রথম দিবস হইল [আদিপুস্তক : জগৎ- সৃষ্টির বিবরণ]।
বাইবেলের বিধাতা প্রথম দিনে এ-কাজটুকু করেন, আরো ছ-দিনে আরো কিছু কাজ ক’রে ক্লান্ত হয়ে সপ্তম দিনে বিশ্রাম নেন। বিধাতাও ক্লান্ত হন! এ-সৃষ্টিতত্ত্বে, কিছুটা সংশোধন ক’রে, বিশ্বাস করে অন্তত তিনটি ধর্মের লোকেরা। এটা প্যালেস্টাইন অঞ্চলের পুরাণ, লৌকিক গাথা। মহাজগতের উৎপত্তির প্রক্রিয়া এর থেকে অনেক চাঞ্চল্যকর ও মহাজাগতিক।
বিশ্ব বা মহাজগত কখন সৃষ্টি হয়েছিলো? ইহুদি, খ্রিস্টান, ও ইসলাম ধর্মে বিশ্বসৃষ্টির যে-বিবরণ পাওয়া যায়, তাতে বোঝা যায় তাদের বিশ্বাসে মহাজগত সৃষ্টি হয়েছিলো অতীতের এক নির্দিষ্ট সময়ে; আর সে-অতীত বেশি অতীত নয়। তাদের ভাবনায় ওই সময়টা অবশ্য অত্যন্ত দীর্ঘ, কেননা হাজার বছর তাদের চিন্তায় ছিলো মহাকালের মতো। সন্ত অগাস্টিন বাইবেলের ‘জগৎ-সৃষ্টির বিবরণ অনুসারে সিদ্ধান্তে পৌঁচেছিলেন খ্রিপূ ৫০০০ অব্দের দিকে বিধাতা সৃষ্টি করেছিলেন। বিশ্ব। সতেরোশতকে জেমস আশার হিশেব ক’রে দেখান যে বাইবেল অনুসারে বিধাতা বিশ্ব সৃষ্টি করেছিলেন ৪০০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে; আর লাইটফুট আরো নিপুণভাবে হিশেবে ক’রে দেখান যে বিধাতা মানুষ সৃষ্টি করেছিলেন। ২৩ অক্টোবর ৪০০৪ খ্রিপূ, সকাল ৯:০০টায়! বাইবেলপ্রণেতাদের জন্যে চার হাজার বছর অত্যন্ত দীর্ঘ, কিন্তু আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত তুচ্ছ সময়। আরিস্ততাল, ও অন্যান্য গ্রিক দার্শনিক, মনে করতেন বিশ্ব আর মানুষ চিরকাল ধ’রেই আছে। বিশ্ব কি সৃষ্টি হয়েছিলো এক বিশেষ সময়ে এবং বিশ্বের কি রয়েছে বিশেষ স্থানিক সীমা, এটা ভাবিয়েছিলো আঠারোশতকের দার্শনিক ইমানুয়েল কান্টকে। তিনি এ-প্ৰশ্নকে মনে করেন বিশুদ্ধ যুক্তির বিরোধী; কেননা তাঁর মতে বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিলো এক বিশেষ সময়ে, অর্থাৎ বিশ্বের রয়েছে আরম্ভ, এটা যেমন যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করা যায়, তেমনিই যুক্তিসঙ্গতভাবে বিশ্বাস করা যায় যে বিশ্ব চিরকাল ধ’রে আছে। তার যক্তি হচ্ছে যদি বিশ্বের কোনো আরম্ভ না থাকে, তাহলে যে-কোনো ঘটনার আগে আছে অনন্তকাল, যা তার কাছে অযৌক্তিক; আবার যদি বিশ্বের থাকে আরম্ভ, তাহলে তারও আগে থাকে অনন্তকাল; তাহলে বিশ্ব কেনো আরম্ভ হবে এক বিশেষ সময়ে? কান্ট গোলমালে পড়েছিলেন সময় ধারণাটি নিয়ে। হকিং মনে করেন বিশ্ব সৃষ্টির আগে সময় ধারণার কোনো অর্থ নেই; সময়ের সৃষ্টি হয়েছে বিশ্ব সৃষ্টির সাথে। যদি বিশ্বসৃষ্টির আগেও সময় ছিলো মনে করি, যেমন আমাদের মনে হয়, আর মনে করি যে বিধাতা সৃষ্টি করেছেন বিশ্ব, তাহলে প্রশ্ন উঠবে বিশ্ব সৃষ্টির আগে বিধাতা কী করছিলেন? এতোকাল ধ’রে মানুষ বিশ্বকে স্থির ও অপরিবর্তনীয় ব’লেই মনে করেছে; কিন্তু ১৯২৯-এ এডউইন হাবেল দেখতে পান এক অভাবিত ব্যাপার। তিনি দেখেন দূরবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জ দ্রুত স’রে যাচ্ছে আমাদের থেকে; অর্থাৎ মহাজগত সম্প্রসারিত হচ্ছে। তাই মনে করতে পারি এমন একটা সময় ছিলো যখন মহাজগতের সব কিছু ছিলো কাছাকাছি। বিজ্ঞানীরা মনে করেন আজ থেকে দশ বা বিশ হাজার মিলিঅ’ন বছর আগে মহাজগতের সব কিছু ছিলো একীভূত; তাই মহাজগতের ঘনত্ব ছিলো অসীম। হাবেল যা দেখতে পান, তাতে মনে হয় এমন একটা সময় ছিলো, যখন মহাজগত ছিলো অন্তহীন রূপে ক্ষুদ্র আর সীমাহীন রূপে ঘন। ওই অবস্থায়ই ঘটে Big Bang—মহাবিস্ফোরণ।
