দশ বা বিশ বিলিঅ’ন বছর আগে ঘটে এক মহাবিস্ফোরণ,-বিগ ব্যাংমহাশব্দ; আর সূচনা হয় মহাজগতের। সময় সম্পর্কে অবশ্য হকিংয়ের ব্যাখ্যাটি মনে রাখা দরকার। হকিংয়ের মতে সময়ের সূচনা হয় বিগ ব্যাংয়ে, কেননা এর আগের সময়কে সংজ্ঞায়িত করার কোনো দরকার নেই। কেনো এটা ঘটে সেটা অবশ্য এক বিস্ময়; তবে ঘটেছিলো তাতে সন্দেহ নেই। এখন মহাজগতে যতো বস্তু ও শক্তি আছে তখন সে-সব ছিলো চরম ঘনীভূতরূপে, শূন্যরূপে, তা ছাড়া আর কিছু ছিলো না। এক সময় ঘটে ওই ঘনীভূত শক্তি ও বস্তুর বিস্ফোরণ। ওই বিস্ফোরণের ফলে প্রসারিত হ’তে থাকে মহাজগত, যা আজো চলছে। মহাজগত চিরসম্প্রসারণশীল। মহাজগতের, অর্থাৎ স্থানের বিস্তারের সাথে সাথে সব দিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে বস্তু ও শক্তি। বিস্ফোরণের কালে মহাজগতের সব এলাকা আলোকিত হয়ে উঠেছিলো; কিন্তু সময় বইতে থাকে, মহাজগত সম্প্রসারিত হ’তে থাকে, বিকিরণ শীতল হতে থাকে, আর মহাজগত অন্ধকার হতে থাকে। আদিমহাজগত পরিপূর্ণ ছিলো হাইড্রোজেন ও হেলিয়ামে, এবং বিকিরণে। তখনই সৃষ্টি হয় নক্ষত্রমণ্ডলি। মহাবিস্ফোরণের এক বিলিঅন বছরের মতো সময়ের পর দেখা যায় কোথাও বস্তু জড়ো হয়েছে, আবার কোথাও জড়ো হয় নি। তাদের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি চারপাশের গ্যাসকে আকর্ষণ করে, যার থেকে সৃষ্টি হয় নক্ষত্রমণ্ডলিপুঞ্জ। মহাজগতের সবখানে কাজ করে একই নিয়ম, তাই মহাজগতের সবখানে দেখা যায় একই রকম নক্ষত্রমণ্ডল । ওই মহাবিস্ফোরণ থেকেই দেখা দেয় নক্ষত্রমণ্ডলি, নক্ষত্র, গ্রহ, তারপর জীবন। এখন মহাজগতে রয়েছে অজস্র নক্ষত্রমণ্ডল ।
সূর্য একটি নক্ষত্র বা তারা; এটি আমাদের সবচেয়ে কাছের নক্ষত্র। সূর্য হাইড্রোজেন ও হেলিয়াম গ্যাসের এক বিশাল গোলক, প্রচণ্ড তাপে এটি জ্বলজ্বল করছে। এর ভেতরটি প্রচণ্ডভাবে জুলছে; এর ভেতরের তাপ চার কোটি ডিগ্রি, বাইরের তাপ ছ-হাজার ডিগ্রি । কীভাবে জন্ম নেয়। তারা ও গ্রহগুলো? মহাজাগতিক গ্যাস ও ধুলোর মহামেঘের বিপর্যয়ের ফলেই জন্ম নেয় নক্ষত্র ও গ্রহ। মেঘের ভেতরের গ্যাসের অণুরাশির সংঘর্ষের ফলে তাপ বাড়ে, হাইড্রোজেন হয়ে উঠতে থাকে হেলিয়াম, এবং কোটি কোটি বছরে একেকটি তারকার জন্ম হয়। তারাদের জন্ম হয় দলে দলে, এবং ছড়িয়ে পড়ে মহাজগতের দিকে দিকে। একই মেঘ থেকে জন্ম হয়েছিলো সূর্য ও আরো কয়েকটি নক্ষত্রের, মহাজগতের কোথাও এখন আছে সূর্যের সহোদর নক্ষত্রগুলো। সূর্যের ভেতরে সারাক্ষণ চলছে বিস্ফোরণ, তার ফলে হাইড্রোজেন রূপান্তরিত হচ্ছে হেলিয়ামে; এজন্যেই সূর্য এতো উজ্জ্বল। হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ চিরকাল চলবে না, এক সময় তা ফুরিয়ে আসবেই। সূর্য ও অন্যান্য তারা কতোকাল বাঁচবে, তা নির্ভর করে সেগুলোর উদ্ভবের সময়ের ভর বা বস্তুপরিমাণের ওপর। সূর্যের কী নিয়তি? আজ থেকে পাঁচ বা ছয় বিলিঅন বছরের মধ্যে সূর্যের ভেতরের সব হাইড্রোজেন রূপান্তরিত হবে হেলিয়ামে, থাকবে না কোনো হাইড্রোজেন; তখন সূর্যের মাধ্যাকর্ষণে সূর্যের ভেতর ভাগের হেলিয়ামপূর্ণ এলাকাটি আরো ঘনীভূত হবে, সূর্যের ভেতরের তাপ বেড়ে যাবে বহুগুণে, সূর্যে দেখা দেবে তীব্র বিকিরণ। এর ফলে সূর্য আরো কিছু কাল, কয়েক লক্ষ বছর, ধ’রে জ্বলবে।
তখন একটি বড়ো পরিবর্তন ঘটবে সূর্যের। তার বাইরের দিকটা প্রসারিত হয়ে শীতল হয়ে আসতে থাকবে। সূর্য তখন হয়ে উঠবে এক বিশাল লাল দানব নক্ষত্র। তার বাইরের এলাকাটি ভেতরের এলাকা থেকে এতো দূরবর্তী হবে যে বাইরের দিকে মাধ্যাকর্ষণ অত্যন্ত ক’মে যাবে। এর ফলে বাইরের অংশটি দিকে দিকে প্লাবনের মতো বয়ে চলবে। তখন সূর্যের প্লাবনের ভেতরে হারিয়ে যাবে মারকিউরি ও ভেনাস; হয়তো পৃথিবীও। তখন সৌরজগতের শুরুর এলাকাটি ঢুকে যাবে। সূর্যের ভেতরে। আজ থেকে কয়েক বিলিঅ’ন বছর পর পৃথিবীতে দেখা দেবে শেষ বিশুদ্ধ দিন। সেদিনের পর সূর্য লাল হবে ধীরেধীরে, ফেপে কাছাকাছি এসে যাবে পৃথিবীর। মেরুর বরফ গলে পৃথিবী জুড়ে বয়ে যাবে প্রবল বন্যা। প্রচণ্ড তাপে ওই জলরাশি পরিণত হবে বাষ্পে, পৃথিবী ঘিরে দেখা দেবে ঘন মেঘমণ্ডল, যাতে বাধা পাবে সূর্যের রশ্মি। একটু বিলম্বিত হবে পৃথিবীর ধ্বংস। তবে তাপে সব জল বাম্পে পরিণত হবে এক সময়, পৃথিবীর জলবায়ু নিঃশেষিত হয়ে মিশে যাবে মহাশূন্যে, মহাপ্ৰলয় শুরু হবে পৃথিবী জুড়ে। সূর্য ও পৃথিবী ধ্বংস হবে, তবে মানুষ হয়তো ধ্বংস হবে না। তখন মানুষেরও এতো বিবর্তন ঘটবে, এতো বিকশিত হবে তাদের বৈজ্ঞানিক প্রতিভা যে তারা পৃথিবী ধ্বংসের অনেক আগেই হয়তো পাড়ি জমাবে অন্য কোনো গ্রহে, বা নিজেদের জন্যে তৈরি করে নেবে কোনো মহাজাগতিক বাসভূমি। তখনো সূর্যের ভেতরে ও বাইরে ঘটে চলবে নানা বদল; থেমে যাবে তার ভেতরের পারমাণবিক বিক্রিয়া, এবং বাড়বে সূর্যের আয়তন। সূর্য তারপর কয়েক হাজার বছর বেঁচে থাকবে মুমূর্ষু অবস্থায়; আমাদের সূর্য পরিণত হবে সূর্যের প্ৰেতাত্মায়। সূর্য তখন হয়ে উঠবে একটি ছোটো তারা, চরমরূপে ঘনীভূত হয়ে হবে। এক হোয়াইট ডোআফ বা শাদা বামন। তবে এ-ই। তার শেষ পরিণতি নয়। সূর্য শীতল হ’তে থাকবে, ঠাণ্ডা হ’তে থাকবে, এবং শেষে পরিণত হবে এক মৃত কালো বামনে ।
