গ্রহগুলো একে অন্যের থেকে বহু দূরে; পৃথিবী থেকে ভিনাসের দূরত্ব চার কোটি কিলোমিটার, পুটোর দূরত্ব ছয় বিলিঅ’ন কিলোমিটার, মহাজগত ছড়িয়ে আছে কোটি কোটি আলোকবর্ষব্যাপী; এসব আজ জানি আমরা, কিন্তু এতো দূরত্বের কথা পুরোনো কালের কেউ ভাবতেও পারতো না। স্থান ও কালের অনন্ততা অসীমতা সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই ছিলো না। গ্রিকরা মনে করতো সূর্য একটা ছোটো ভূখণ্ডের সমান, বিশ্বকেও তারা বেশি বড়ো মনে করতো না। শিশুরা আকাশের দিকে তাকিয়ে যেমন মনে করে একটু দূরেই আকাশ নীল হয়ে ঘিরে আছে পৃথিবীকে, আর সূর্য চাঁদ তারাও বেশি দূরে নয়, তেমনিই মনে করতো। পুরোনো কালের মানুষ। পুরোনো মিশরিরা মনে করতো আকাশ হচ্ছে একটি তাবুর চন্দ্ৰাতপ, যেটি খাটানো হয়েছে চারটি পাহাড়ের ওপর। গ্রিকদের চোখে সূর্য ছিলো মাত্র কয়েক হাজার ফুট দূরে; এর পরিচয় পাই গ্রিক পুরাণের ইকারুসের গল্পে। ইকারুস তার বানানো ডানা দিয়ে উড়ে উড়ে ঢুকে গিয়েছিলো সূর্যে, সূর্য খুব দূরে হ’লে এটা সম্ভব হতো না। তাদের চোখে তারাগুলোও বেশি দূরে ছিলো না। পুরোনো মানুষেরা মহাজগতের আয়তন ও নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব সম্পর্কে খুবই ভুল ধারণা পোষণ করতো, তবে তারা বেশ পরিচিত ছিলো বিভিন্ন গ্রহনক্ষত্রের গতির সাথে। এসব তাদের জানতে হতো কৃষি ও অন্যান্য কাজের জন্যে। পৃথিবী আর গ্রহনক্ষত্র কী, মহাবিশ্বের রূপ কী, তারা বোঝে নি; ভাই তারা এসব সম্পর্কে করতো নানা কল্পনা, বানাতো গল্প। মহাজগত পুরাণের পর শুরু হয় মহাজগতকে বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা। খ্রিপূ চতুর্থ শতকে মহাজগতকে বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছিলেন এশিয়া মাইনরের ইউডোক্সাস। তিনি একটি কাঠামো তৈরি করেন সৌরজগতের, যাতে পৃথিবী একটি গোলক, যাকে ঘিরে আছে একটির পর একটি সমকেন্দ্ৰিক গোলক। তারও আগে পারমেনিদেস গোলকের পর গোলক রূপে বিশ্বের রূপ প্ৰস্তাব করেছিলেন। তার কাঠামোতে গোলকের সংখ্যা ছিলো কম। ইউডোক্সাস গোলকের সংখ্যা বাড়িয়ে করেন সাতাশ। তিনি যে-বিশ্বজগতের রূপ প্রস্তাব করেন, তা খুবই জটিল; তবে তার সাহায্যেও ব্যাখ্যা করা যাচ্ছিলো না দৃশ্যমান আকাশ।
এর পর দেখা দেন সর্বজ্ঞ, বিধাতার থেকে জ্ঞানী, আরিস্ততাল। তিনি বিধাতার মতোই জ্ঞানের নামে দু-হাজার বছরের জন্যে তৈরি ক’রে যান অসংখ্য বিভ্রান্তি। বলা হয়ে থাকে তিনি সব কিছু দেখে সিদ্ধান্ত নিতেন;—তিনি ছিলেন পর্যবেক্ষণ বা উপাত্তবাদী, আসলে তিনি পর্যবেক্ষণ পছন্দ করতেন না। তিনি তার স্ত্রীদের দাঁতগুলোও গুণে দেখার আগ্রহ বোধ করেন নি, না দেখেই ব’লে গেছেন। পুরুষের থেকে নারীর দাতের সংখ্যা কম, আর দু-হাজার বছর ধ’রে অন্যরাও না দেখেই বিশ্বাস করেছে যে নারীদের দাতের সংখ্যা কম। মহাপুরুষেরা যেমন মহাউপকারী, তেমনি অনেক সময় মহাক্ষতিকরও। জানি না বলার অভ্যাস ছিলো না তার; তিনি মনে করতেন। তিনি সব জানেন। আরিস্তাতল বিশ্বের গঠন বর্ণনার জন্যে তৈরি করেন একটি কাঠামো, এতে তিনি সঙ্গে নেন কালিঙ্গুসকে। তারা দুজনে ইউডোক্সাসের বিশ্বকাঠামো ভিত্তি ক’রে তৈরি করেন এক নতুন বিশ্বকাঠামো, যা পাওয়া যায় আরিস্ততলের আকাশমণ্ডল গ্রন্থে। কাঠামোটি তার দর্শনের মতোই চমৎকার, ও শোচনীয়রূপে ভুল; আরো শোচনীয় হচ্ছে যে এ-কাঠামো দু-হাজার বছর ধ’রে বিভ্রান্ত করেছে, এবং প্যালেস্টাইন অঞ্চলের ধর্মবইগুলোর মধ্যে ঢুকে আজো বিভ্রান্ত করছে মানুষকে। এটিও গোলকের সমষ্টি; এতেও বিশ্ব হচ্ছে গোলকের পর পর গোলক, মোট পঞ্চান্নটি গোলকের সমষ্টি। আরিস্তলের মতে শেষ গোলকটির পর আর কিছুই নেই, কিছুই থাকতে পারে না। এই গোলকরাশির কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবী। তাদের সকলেরই বিশ্বাস ছিলো যে জগতের কেন্দ্র হচ্ছে পৃথিবী; তাই পৃথিবীকে কেন্দ্ৰ ক’রে বিশ্বের রূপ গঠন করতে গিয়ে জটিল ও জটিলতর রূপে তারা প্ৰস্তাব ক’রে চলেছিলেন গোলকের পর গোলক। গোলকের পর গোলকের বিন্যাসের মধ্যে তারা দেখেছিলেন স্বর্গীয় সুষমা। তাঁরা কল্পনা করতেন যে নক্ষত্ররাশির চলার ফলে বেজে ওঠে। স্বর্গীয় ঐকতান: তারা শুনতে পান। স্বর্গীয় গোলকের সঙ্গীত। বহু কবি গোলকের স্বৰ্গীয় সঙ্গীত নিয়ে লিখেছেন বহু কবিতা। এটা কাব্যিক কল্পনা হিশেবে সুন্দর, কিন্তু সম্পূর্ণ ভুল।
গোলকবিন্যাস চূড়ান্তরূপ পায় দ্বিতীয় শতকের মিশরের নীল নদীর তীরের জ্যোতির্বিজ্ঞানী ক্লদিউস টলেমির বিশ্বকাঠামোতে। আরিস্ততলের মতো আকাশের দিকে না তাকিয়ে তিনি তার কাঠামো তৈরি করেন নি, নক্ষত্রদের চলাচল তিনি যত্বের সাথেই দেখেন, এবং একটি বই লেখেন গাণিতিক রচনা নামে। বইটি আরবিতে অনুদিত হয় আলমাজেস্ত বা ‘সর্বশ্রেষ্ঠ’ নামে। এটি সূর্য, নক্ষত্র, ও গ্রহগুলোর চলাচল আগের কাঠামোগুলোর থেকে ভালোভাবে নির্দেশ করে। তিনিও তার কাঠামােতে পৃথিবীকে রাখেন কেন্দ্রে, এবং রাখেন গোলকের পর গোলক, আর রাখেন এপিসাইকেল ও এক্সেট্রিক। এপিসাইকেল হচ্ছে এমন বৃত্তাকার কক্ষপথ, যা ঘোরে কোনো বিন্দুকে কেন্দ্ৰ ক’রে, যে-বিন্দু ঘোরে অন্য কোনো বিন্দুকে কেন্দ্ৰ ক’রে। এক্সেট্রিক হচ্ছে এমন গোলক, যেটি স’রে যায় বিশ্বের কেন্দ্র থেকে। এর সাথে তিনি যুক্ত আরেক ধরনের বৃত্তাকার গতি। তাঁর বিশ্বকাঠামো বেশ অসুন্দর আরিস্ততলের কাঠামোর তুলনায়, তবে এটা হয়ে ওঠে বেশ গ্রহণযোগ্য; কেননা জোড়াতালি দিয়ে এটা অনেক কিছু ঠিকঠাক মতো নির্দেশ করতে পারে। ইউরোপে রেনেসাস পর্যন্ত এটা নিজের মহিমা গৌরবের সাথেই রক্ষা করে। তবে তার বিশ্বতত্ত্ব বা বিশ্বকাঠামো বাস্তব বিশ্ব ব্যাখ্যা করে না, তিনি আকাশে যে চাকার পর চাকা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন, সে-সব চাকা আকাশে নেই। টলেমির বৃত্তের পর বৃত্ত সে-সব বস্তুর প্রাকৃতিক গতি নির্দেশ করে, যেগুলো প্রকৃতিতে নেই। কিন্তু তিনি প্রভাব বিস্তার করেছিলেন ব্যাপক, ধর্মপ্রবর্তকেরা তাঁর কাঠামো বিধাতার কাঠামো হিশেবে ঢুকিয়ে দেন বিধাতার বইতে, এবং উপাসনালয়গুলো আর ধাৰ্মিকেরা সাত আকাশ দশ আকাশ ব’লে কীর্তন করে তারই বিশ্বকাঠামো। সাত আসমান দশ আসমান ব’লে কিছু নেই, ধর্মের বইগুলো বিধাতা লিখলে এমন ভুল করতেন না।
