নক্ষত্রপুঞ্জগুলো একই রকমের নয়, আকৃতি অনুসারে এগুলো তিন রকম : এক ধরনের নক্ষত্রপুঞ্জ কুণ্ডলপাকানো, এক ধরনের নক্ষত্রপুঞ্জ উপবৃত্তাকার, ও এক ধরনের নক্ষত্রপুঞ্জ এলোমেলো। আমরা যে-নক্ষত্রপুঞ্জের অন্তর্ভুক্ত তার নাম মিল্কি ওয়ে গ্যালাক্সি। এটি এক কুণ্ডলপাকানো নক্ষত্রপুঞ্জ, যার কুণ্ডল ধীরেধীরে নড়ছে। আমাদের নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে আট বিলিঅ’ন আলোকবর্ষ দূরে আছে আমাদের নিকটবতী নক্ষত্রপুঞ্জগুলো। এগুলো আমাদের প্রতিবেশি নক্ষত্রপুঞ্জ। এগুলো বিশটি নক্ষত্রপুঞ্জের সমষ্টি, আর ছড়িয়ে আছে কয়েক মিলিঅন আলোকবর্ষব্যাপী। এদের একটির নাম এম৩১। আমাদের নক্ষত্রপুঞ্জ কোটি কোটি তারায় তারায় খচিত। তারাগুলোর কোনো কোনোটি ছোটো, তবে কোনো কোনোটি কয়েক হাজার সূর্যের সমান। কোনো কোনোটি খুবই ছোটো, একটা শহরের মতো ছোটো, কিন্তু সেগুলো সীসার থেকেও শত ট্রিলিঅন গুণ ঘনীভূত। কোনো কোনো নক্ষত্ৰ একলা, যেমন আমাদের সূর্য, তবে অধিকাংশ নক্ষত্রই যুগলবন্দী-একটি নক্ষত্র ঘুরছে। আরেকটিকে ঘিরে। কোনো কোনো তারা, যেগুলোকে বলা হয়। সুপারনোভা, অত্যন্ত উজ্জ্বল; আবার কতকগুলো, যেগুলোকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বর, সেগুলো অন্ধকার + কোনো কোনো তারা জুলে একই উজ্জ্বলতা নিয়ে, কোনো কোনোটি ঝিকিমিকি করে; কোনো কোনোটি ঘোরে ধীরশান্তভাবে, কোনো কোনোটি ঘোরে পাগলের মতো। তারাদের রঙও আছে; নীল তারা তরুণ ও গরম; হলদে তারা মাঝবয়সী; লাল তারা বুড়ো ও মুমূর্ষ; আর ছোটো শাদা আর কালো তারাগুলো শিগগিরই মরবে। আমাদের নক্ষত্রপুঞ্জে ঘোরাঘুরি করছে নানা আকাশে দেখতে পায় দেবদেবী। তারা মেতে ওঠে ভুল কল্পনায়; দেবদেবীদের ওপর তারা অর্পণ করে একেক দায়িত্ব, এবং পুজো করতে থাকে অস্তিত্বহীন দেবদেবীদের। মানবিক প্রত্যেকটি ব্যাপারের জন্যে তারা কল্পনা করে একেকটি দেবদেবী, কোটি কোটি দেবদেবীতে ভ’রে ওঠে আকাশমণ্ডল। তাদের কল্পনায় দেবদেবীরা চাইলে নারীর গর্ভে আর মাঠে শস্য সোনা হয়ে ওঠে, না চাইলে নামে বন্যা, দেখা দেয় খরা, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, গর্জন ক’রে ওঠে অগ্নিগিরি। তারা কল্পনা র যে দেবতাদের তুষ্ট করার দরকার; তখন দেখা দেয় পুরোহিত, দৈববাণী, মন্দির, পুজো ইত্যাদির আধিপত্য ও ব্যবসাবাণিজ্য। তাদের কাছে সব কিছুই হয়ে ওঠে রহস্যপূর্ণ। দিকে দিকে দেবতা তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়; তারা মহাজগতের রহস্যকে পরিণত করে শক্তি ও সম্পদের সহজ আকর্ষণীয় উৎসে। আজো সেই ধারা চলছে।
কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষ উৎপীড়িত হয়ে আসছে নানা নামের কল্পিত অতিমানবিক সত্তাদের দ্বারা। এই পীড়নে অবশ্য ভূমিকা নেই কল্পিত সত্তাদের; তারা কাউকে পীড়ন করে না, তারা জানেও না যে তারা আছে, সৃষ্টি করা হয়েছে তাদের; কিন্তু তাদের নামে সুবিধাভোগী একদল মানুষ পীড়ন করে অন্য মানুষদের। তারা সবাইকে বাধ্য করে তাদের কল্পিত সত্তাদের মানতে, পুজো করতে। আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিসের কাছাকাছি আইওনিয়ার অ্যাজিয়ান সাগরের সামোস দ্বীপে দেখা দেয় ভিন্ন চিন্তা। সেখানকার মানুষেরা মনে করতে শুরু করে যে দেবতা নেই, সব কিছুই অণুতে গঠিত, মানুষও তাই; পৃথিবী একটি গ্রহ, যা ঘুরছে সূর্যের চারদিকে; আর নক্ষত্রেরা আছে বহু দূরে। আদিগ্রিকরা বিশ্বাস করতে যে আদিকালে ছিলো বিশৃঙ্খলা’ বা ‘গোলমাল’ নামে একটি প্রাণী, এবং সেটি মিলিত হয়েছিলো রাত্রি দেবীর সাথে। তাদের মিলনে জন্মে দেবতারা ও মানুষেরা। তাদের চোখে বিশ্ব গোলমাল থেকে উৎপন্ন ব’লে পৃথিবীর সব কিছুই পরিপূর্ণ গোলমালে; আর ওই গোলমালকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে শুধু খামখেয়ালি দেবদেবীরা। খ্রিপূ ষষ্ঠ শতকে সামোস দ্বীপে এ-চিন্তার উদ্ভব ঘটে যে বিশ্বজগত বিশৃঙ্খল নয়, এবং বিশ্বকে জানাও সম্ভব। এই চিন্তা দেখা দেয় নি ভারত, মিশর, ব্যাবিলোনিয়া, ও চিনে; কারণ এসব দেশে দেবতাদের নিয়ে এর আগেই রাজনীতির খেলা শুরু হয়ে গেছে। আইওনিয়ার প্রথম বৈজ্ঞানিক থেলেস বাদ দেন দেবতাদের; দেবতা ছাড়াই বুঝতে চেষ্টা করেন বিশ্বকে। তবে কয়েক শো বছরের মধ্যেই সমাজপ্রভুরা ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে বিজ্ঞানের বিরুদ্ধে; কেননা তারা দেখতে পায় কুসংস্কারে তাদের লাভ অনেক, বিজ্ঞানে ক্ষতি প্রচুর।
প্লাতো-আরিস্ততল, যারা খুব জ্ঞানী ব’লে বিখ্যাত, কাজ করেন বিজ্ঞানের ও মানুষের বিরুদ্ধে। প্লাতো বলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা নক্ষত্রমণ্ডল সম্পর্কে ভাববেন, তবে নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ ক’রে সময় নষ্ট করবেন না। ঘরে বা গুহায় ব’সে ভেবে ভেবে দেবতা বা বিধাতা সৃষ্টি সম্ভব, তাদের স্বরও শোনা যেতে পারে, আদর্শ রাষ্ট্রও পরিকল্পনা করা যায় স্পার্টার অনুকরণে, কিন্তু নক্ষত্রমণ্ডলের কার্যকলাপ বোঝা যায় না। আরিস্ততল মনে করতেন নিম্নশ্রেনীর মানুষ দাসস্বাভাবের, তাদের কোনো প্রভুর অধীনে থাকাই মঙ্গল। গ্রিসে বিজ্ঞানের মৃত্যুর এক কারণ দাসপ্রথার উদ্ভব। প্লাতো ও আরিস্ততলের কালে দাসপ্রথা বেশ শক্ত প্রথায় পরিণত হয়। ওই দার্শনিকেরা ও আরো অনেকে গণতন্ত্রের কথা বলতেন, তবে ওই গণতন্ত্ৰ সকলের জন্যে গণতন্ত্র ছিলো না, ছিলো সমাজের সুবিধাভোগী অভিজাতদের জন্যে। দাসরা করতে শারীরিক শ্রম, আর বৈজ্ঞানিক নিরীক্ষাও ছিলো শারীরিক শ্রমের কাজ। প্লাতো আর আরিস্তাতল বেশ আরামে ছিলেন দাসপ্রথাভিত্তিক সমাজে; তারা স্বৈরাচারীদের সেবক ছিলেন, এবং দাসপ্রথার পক্ষে দাঁড় করিয়েছিলেন তাদের দর্শন। দাসপ্রথা যাতে ভালোভাবে চলে, তার জন্যে তারা ভাগ করেন শরীর ও আত্মাকে, পার্থক্য করেন বস্তু ও চিন্তার মধ্যে, আকাশমণ্ডল থেকে পৃথক করেন। পৃথিবীকে, যে-সমস্ত বিভাজন আজো অনেকে আঁকড়ে আছে প্ৰাণপণে। প্লাতোর বিশ্বাস ছিলো সবখানেই দেবতারা আছে, এবং তিনি নিজের রাজনীতিক বিশ্বাসকে বিশ্বজগতের সাথে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানবিরোধী; এবং তার পর দেখা দেয় প্লাতোনীয়রা, ও খ্রিস্টানরা, যারা বিশ্বাস করতো পৃথিবী একটি নোংরা জায়গা, আকাশমণ্ডল হচ্ছে বিশুদ্ধ ও স্বর্গীয়। এর ফলে পৃথিবী যে একটি গ্রহ, আমরা যে মহাজগতের অধিবাসী, একথাটিই ভুলে যাওয়া হয়। প্লাতোর জন্মের আগেই আইওনিয়ার আরিস্তারকাস বলেছিলেন পৃথিবী নয় সূর্যই গ্রহমণ্ডলির কেন্দ্র, গ্রহগুলো ঘুরছে সূর্যকে ঘিরে; কিন্তু তার কথা। আপত্তিকর মনে হয় সকলের। প্লাতোর প্রভাবে তাঁর লেখা ভুলে যাওয়া হয়। তাঁর আঠারোশিতক পর একই কথা বলেন কোপারনিকাস; আমরা এখন মানি কোপারনিকাসকেই।
