বৈজ্ঞানিক কল্পনা। তারা মহাজাগতিক সত্য বের করেন নি, বের করার চেষ্টা করেন নি, বরং বিচিত্র রকম দেবদেবী কল্পনা ক’রে সেগুলোকেই সত্য ব’লে প্রচার করেছেন; এবং চাপিয়ে দিয়ে গেছেন আমাদের ওপর।
পুরোনো মানুষেরা ছিলো শিশু; অন্ধকার পৃথিবী ও সংকীর্ণ মহাজগতের অধিবাসী। সব কিছুই ছিলো তাদের কাছে রহস্যময়; এবং তারা পৃথিবীকে ভ’রে দিয়ে গেছে রহস্যে। মহাজগত বলতে যা বুঝি আমরা, তারা তা বুঝতো না; তাদের মহাজগত ছিলো খুবই ক্ষুদ্ৰজগত। গত কয়েক শতকের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে মহাজগতের রূপ আমূল বদলে গেছে মানুষের চোখে। মহাজগত বলতেই আজ অনন্ত অসীমের ধারণা জাগে আমাদের মনে, পুরোনো মানুষদের মনে এমন ধারণা জাগতো না। তাদের চোখে মহাজগত ছিলো এক ছোটো সসীম বদ্ধ এলাকা। তারা মনে করতো মহাজগতের কেন্দ্ৰ পৃথিবী, যাকে ঘিরে আছে ছোটো ছোটো সূর্য নক্ষত্র চাঁদের আকাশ। তারা পৃথিবীকে বিশ্বের কেন্দ্র আর মানুষকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মনে করলেও পৃথিবীকে মনে করতো নোংরা; তারা বিশ্বাস করতো নক্ষত্রগুলো পবিত্র, আর নক্ষত্ৰলোক, বা তার একটু পরের এলাকা থেকে তাদের সব সময় শাসন করছে দেবতারা। আরো কিছুকাল পরে যখন কোনো কোনো দেশে দেবতাদের বাদ দেয়া হয়, তখন তারা কল্পনা করে এক শক্তিশালী নিঃসঙ্গ দেবতাকে, যাকে বলা হয় বিধাতা বা ঈশ্বর বা অন্য কিছু, যে ওপর থেকে শাসন করছে মানুষকে। এর সবই কল্পনা, যদিও মানুষ এসব সত্য মনে করে। মহাজগতকে যদি পাঁচ হাজার বহচর আগের মানুষ আমাদের মতো বুঝতে পারতো তাহলে থাকতো না আজকের বিশ্বাসগুলো। মানুষ এতো ভয় পেতো না নরকের, এতো লোভী হতো না স্বর্গের। আজ থেকে দুশো বা হাজার বা এক লক্ষ বছর পর মানুষ দেবতা বিধাতা স্বর্গ নরক প্রভৃতি সম্পর্কে ভাববে না। আমাদের বিশ্বাসগুলো তাদের মনে হবে আদিম; বিশ্বাস শব্দটিই তখন থাকবে না।
মহাজগত কতো বড়ো, কতো তার বয়স, কীভাবে উৎপত্তি হয়েছে তার, এসব অবশ্য কল্পনায় ধারণ করাও অত্যন্ত কঠিন। কিন্তু বিজ্ঞানীরা মহাজগতের উৎপত্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পেরেছেন, ভবিষ্যতে তাদের ব্যাখ্যা আরো সুষ্ঠ হবে। বিভিন্ন দেশের ধর্মের বইগুলোতে মহাজগতের উৎপত্তির যে-গল্প পাওয়া যায়, তা বিশ্বসৃষ্টি সম্বন্ধে আদিম মানুষের রূপকথা; তাতে বিশেষ বিস্ময় নেই, কেননা তাদের কল্পনারও সীমা ছিলো; কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান মহাজগতের উৎপত্তির যে-ব্যাখ্যা দেয়, তা এতো বিস্ময় ও চাঞ্চল্যকর যে তা অনেকের পক্ষে বুঝে ওঠা কঠিন। কিন্তু বৈজ্ঞানিকদের ব্যাখ্যায়ই পাই মহাজগতের অনন্ততা ও বিস্ময়করতার ঠিক পরিচয়। যদি বিধাতা সত্যিই থাকেন,-থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই-এবং কোনো দিন যদি তিনি মহাজগত সম্পর্কে ধর্মের বইগুলোর ও বৈজ্ঞানিকদের ব্যাখ্যা পড়ে ওঠেন, তাহলে বৈজ্ঞানিকদের ব্যাখ্যাই তিনি গ্ৰহণ করবেন। ধর্মের বইগুলো পড়ে তিনি হাসবেন।
মহাজগতে পৃথিবী একটি ছোট্ট সুন্দর চারের মতো, কিন্তু এখানেই উৎপত্তি ঘটেছে মহাজগতের সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপারের, যা খুবই ক্ষুদ্র, কিন্তু অনেক বড়ো নক্ষত্রমণ্ডলির থেকেও। তার নাম মানুষ। মহাজাগতিক প্রক্রিয়ারই এক রূপ মানুষ; তাকে কেউ তৈরি ক’রে পাঠিয়ে দেয় নি। পৃথিবীতে, বলে নি যাও পৃথিবীতে, গিয়ে রাজনীতি করো ধর্ম করো প্রতারণা করো গান গাও; মানুষ বিকশিত হয়েছে কোটি কোটি বছর ধ’রে। মহাজগতের একটি ছোটো চরের প্রতিভাবান চাষী মানুষ, যার থেকে আর কেউ বেশি জানে না মহাজগত সম্পর্কে। এই ছোট্ট চরের পাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে মহাজাগতিক সমুদ্রের ঢেউ। মানুষ এই মহাসমুদ্রকে ভয় পেয়েছে হাজার হাজার বছর, মাত্র কয়েক শো বছর আগে মানুষ বেরিয়েছে নিজের তীর ছেড়ে মহাসমুদ্রের দিকে। অনন্ত মহাসমুদ্র ডাকছে মানুষকে; মানুষ তীর থেকে আরো দূরে যাবে, ঢুকবে মহাসমুদ্রের ভেতরে, খুঁজে দেখবে কী আছে সেখানে। মহাজগত কতো বড়ো? আজো আমরা তা জানি না; কিন্তু এটুকু জানতে পেরেছি মহাজগত এতো বিশাল যে আমাদের প্রতিদিনের মানদণ্ডে, মাইল বা কিলোমিটারে, তার আয়তন মাপা সম্ভব নয়। মহাজগতকে পরিমাপ করা হয় আলোর গতির মানদণ্ডে। এক সেকেন্ডে আলো যায় ১৮৬,০০০ মাইল, বা মোটামুটি ৩০০,০০০ কিলোমিটার; এ—মানদণ্ডই ব্যবহার করা হয় মহাজগতের এক এলাকা থেকে আরেক এলাকার দূরত্ব মাপার জন্যে। সূর্য থেকে পৃথিবীতে আলো আসতে লাগে আট মিনিট সময়; তাই সূর্য থেকে পৃথিবীর দূরত্ব আট আলোক-মিনিট। এক বছরে আলো যায় ১X৬০X৬০X২৪X৩৬৫X১৮৬,০০০ মাইল বা ছয় ট্ৰিলি অন মাইল। ট্রিলিঅনা হচ্ছে এক লক্ষ কোটি: আলো বছরে যায় ছয় লক্ষ কোটি মাইল। এটা একটি ছোটো সংখ্যা, তবে এটা হিশেবে করতেও মগজ বিবশ হয়। আলো এক বছরে যে-দূরত্ব ভ্ৰমণ করে, সে-একককে বলা হয় আলোকবর্ষ। আলোকবর্ষের সাহায্যে, সময় নয়, মাপা হয় দূরত্ব। এই দূরত্বের কথা পুরোনো কালের মানুষ ভাবতে পারে নি। আজ আমরা জানি মহাজগত কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি কোটি আলোকবর্ষ ব্যাপী বিস্তৃত, যা পুরোনো মানুষ কল্পনাও করতে পারে নি।
পৃথিবী একটি জায়গা বা স্থান; এমন স্থানের অভাব নেই মহাজগতে। ওই স্থানগুলো ঠিক পৃথিবীর মতো নয়, তবে স্থান। মহাজগতের অধিকাংশ এলাকা জুড়েই রয়েছে। শূন্যতা। মহাজগত এক বিশাল শীতল অনন্ত মহাশূন্যতা, যার এক নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে আরেক নক্ষত্রপুঞ্জের মধ্যবর্তী স্থানে বিরাজ করছে চিরআমারাত্রি, ওই শূন্যস্থলে অন্ধকার শূন্যতা ছাড়া আর কিছু নেই। মহাজগত এমন অনন্ত শূন্যতা যে তাতে গ্রহ, নক্ষত্র, আর নক্ষত্রপুঞ্জকে দুর্লভ বস্তু ব’লেই মনে হয়। নক্ষত্রপুঞ্জ গঠিত গ্যাস, ধুলো, আর নক্ষত্র বা তারকায়। প্রতিটি নক্ষত্রপুঞ্জে রয়েছে কোটি কোটি তারকা। সূর্য একটি তারকা বা তারা বা নক্ষত্র। নক্ষত্রপুঞ্জের কোটি কোটি তারার প্রত্যেকটির থাকতে পারে গ্রহ; ওই গ্রহের কাছে প্রতিটি তারাই সূর্য। সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে কয়েকটি গ্রহ, গড়ে উঠেছে সৌরলোক; প্রতিটি নক্ষত্ৰকে বা সূর্যকে ঘিরেই গড়ে উঠতে পারে এমন সৌরলোক। কতগুলো নক্ষত্রপুঞ্জ রয়েছে মহাজগতে? মহাজগতে নক্ষত্রপুঞ্জ সংখ্যা কয়েক শো বিলিঅ’ন বা ১০^১১ বিলিঅন অর্থ হচ্ছে ১-এর পর ১১টি শূন্য, অর্থাৎ ১০০,০০০,০০০,০০০); আ র প্রত্যেক নক্ষত্রপুঞ্জে আছে গড়ে ১০০ বিলিঅন নক্ষত্র। প্রত্যেক নক্ষত্রপুঞ্জে যতোগুলো তারা আছে, অন্তত ততোগুলো গ্ৰহ থাকার কথা। মহাজগতে থাকার কথা ১০^১১X১০^১১=১০^২২, অর্থাৎ ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ বা ১০ বিলিঅন ট্রিলিঅন গ্ৰহ। সংখ্যাটি আমি গুণতে পারছি না। এমন অসংখ্য সৌরলোকের একটি সৌরলোকের একটি গ্রহেই শুধু রয়েছে মানুষ। আর কোথাও নেই। কেনো থাকবে না? থাকার সম্ভাবনা খুবই বেশি; কিন্তু যদি থাকে, তারা মানুষ হবে না, তারা হবে বুদ্ধিমান প্রাণী। মানুষ একান্তভাবেই পৃথিবীর প্রাণী। অন্য কোনো গ্রহে বুদ্ধিমান প্রাণী থাকতে পারে, কিন্তু দেখতে তারা মানুষের মতো আকার। আমরা আছি মহাজগতের এক কোণে, সূর্য একটি ছোটো তারা, পৃথিবীও একটি ছোটো চার; কিন্তু এখানেই উৎপত্তি হয়েছে এক বুদ্ধিমান প্রাণীর, মানুষের। এটাও কোনো রহস্য নয়, এখানে ঘটেছে এমন কিছু মহাজাগতিক ঘটনা, যার। ফলে এখানেই উদ্ভূত হ’তে পেরেছে মানুষ, পশু, সরীসৃপ, গাছ। আমাদের গ্রহটির নাম পৃথিবী না হয়ে হ’তে পারতো ‘প্ৰাণ’।
