আগেই বলা হয়েছে যে, নায়ার-পরিবার মাতৃকেন্দ্রিক। এ ধরনের পরিবার গঠিত হয় স্ত্রীলোক স্বয়ং ও তার ভ্রাতা, ভগিনী ও তাদের সন্তানদের নিয়ে। কোন বিবাহিতা স্ত্রীলোকের স্বামী বা বিবাহিত পুরুষের স্ত্রী এই পরিবারের মধ্যে বাস করে না। আগে আরও বলা হয়েছে যে সম্বন্ধম্ ব্যতীত নায়ারদের মধ্যে নিয়মানুগ সাধারণ বিবাহপ্রথাও প্রচলিত আছে। সেক্ষেত্রেও নায়ারস্বামী অন্যত্র বাস করে এবং নাম্বুস্ত্রী ব্রাহ্মণদের মত সেও সন্ধ্যার পর স্ত্রীর সঙ্গে যৌনমিলনের জন্ত স্ত্রীর গৃহে এসে উপস্থিত হয়।
হিন্দুদের মধ্যে বৃক্ষ বা জড়পদার্থের সঙ্গে বিকল্প বিবাহেরও প্রথা আছে। হিন্দুরা বিশ্বাস করে যে, বিবাহে অযুগ্ম সংখ্যা অত্যন্ত অশুভ । সেই কারণে কোন ব্যক্তি যখন তৃতীয়বার বিবাহ করতে প্রবৃত্ত হয় তখন সে অযুগ্ম তৃতীয় বারের অশুভতা খণ্ডন করবার জন্য কোন বৃক্ষ বা জড়পদার্থের সঙ্গে বিকল্প বিবাহের পর নির্বাচিত কন্যাকে বিবাহ করে । বিহারের কোন কোন জায়গায় অবিবাহিত ব্যক্তি যদি কোন বিধবাকে বিবাহ করতে .
.মনস্থ করে, তা হলে সে প্রথমে কোন শু্যাওড়া গাছের সঙ্গে বিকল্প বিবাহ সম্পন্ন করে এবং পরে ওই বিধবাকে বিবাহ করে। এরূপ ক্ষেত্রে কোন শাখোটক বৃক্ষের ( শু্যাওড়া গাছ ) শাখা নামিয়ে তা পুষ্পমাল্যদ্বারা বরের হাতের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয়। তারপর বিধবাকে সেখানে উপস্থিত করান হয়। বিধবা তখন বরের সঙ্গে মাল্যবিনিময় করে এবং বরের দেওয়া মালা হাতে পরে। এই ভাবে শাখোটক বৃক্ষ বরের প্রথম স্ত্রী হয় এবং ঐ বিধবা তার দ্বিতীয়া স্ত্রীরূপে পরিগণিত হয়।
কোল্টাজাতির মধ্যে এরূপ বিশ্বাস বদ্ধমূল আছে যে, যদি কোন অবিবাহিত পুরুষ কোন বিধবাকে বিবাহ করে তবে মৃত্যুর পর তাকে প্রেত হয়ে থাকতে হয়। সেই কারণে কোন বিধবাকে বিবাহ করার আগে কোটা অবিবাহিত যুবক কোন ফুলকে বিকল্প বিবাহ করে। হালওয়াইজাতির মধ্যে এরূপ বিকল্প বিবাহ সিন্দুর-লিপ্ত কোন তরবারী বা লৌহখণ্ডের সঙ্গে হয়। বঙ্গদেশে বাগদীজাতির মধ্যেও বিবাহ করবার আগে অবিবাহিত যুবক প্রথমে কোন মহুয়া গাছের সঙ্গে বিকল্প বিবাহ সম্পন্ন করে। খারওয়ারজাতির মধ্যে এরূপ বিকল্প বিবাহ যে শুধু পুরুষকেই করতে হয় তা নয়, বিধবাকেও করতে হয় । এক্ষেত্রে এরূপ বিবাহ আম্রবৃক্ষের সহিত নিম্পন্ন হয়। কিন্তু ছোটনাগপুরের কুর্মিদের মধ্যে পুরুষ ও বিধবাকে বিভিন্ন বৃক্ষকে বিবাহ করতে হয়। তাদের মধ্যে সাধারণতঃ বিধবার বিবাহ হয় মহুয়া গাছের সঙ্গে আর পুরুষদের বিবাহ হয় আম্রবৃক্ষের সহিত। কুর্মিদের মধ্যে এরূপ বিবাহে আনুষ্ঠানিক আড়ম্বরের আধিক্য লক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে বিধবা তার ডান হাতে মহুয়া পাতা দিয়ে তৈরী বালা পরে সাতবার মহুয়া গাছটিকে প্রদক্ষিণ করে। তার ডান হাত ও কান মহুয়া গাছের সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হয় ও তাকে মহুয়া গাছের পাতা চিবুতে দেওয়া হয়। পুরুষের ক্ষেত্রে আমগাছটিকে নয়বার প্রদক্ষিণ করতে হয়। মহিলিজাতির মধ্যেও অনুরূপ প্রথা ও অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে ।
আগেকার দিনে রজদর্শনের পূর্বে কন্যার বিবাহ না দিলে তার পিতামাতাকে সামাজিক কলঙ্ক বহন করতে হতো। এরূপ কলঙ্কের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য বিহারের খগুজাতির অন্তভুক্ত গোনর-উপশাখার লোকেরা তরবারীর সঙ্গে কন্যার বিকল্প বিবাহ দিত । কন্যার কোনরূপ বিকলাঙ্গতার জন্য বিবাহ হবে না এরূপ মনে হলেও কন্যার বিকল্প বিবাহ দেওয়া হতো। প্রথম রজদর্শনের অব্যবহিত পূর্বে ওড়িাতেও কন্যার বিবাহ দেওয়া হয় কোন পুষ্প, বৃক্ষ বা তীরের সঙ্গে। ওড়িষ্যার চাষাজাতির মধ্যে এরূপ বিবাহে পুরোহিত ওই পুষ্প, বৃক্ষ বা তীর কুশরজ্জ্বর সাহায্যে কন্যার হাতের সঙ্গে বেঁধে দেয়। প্রকৃত স্বামীর ন্যায় কন্যা সারাজীবন সেই পুষ্প, বৃক্ষ বা তীরকে গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে ও তার নাম উচ্চারণ করে না। পরে যখন কোন লোকের সঙ্গে ওই কন্যার বিবাহ হয় তখন সেই বিবাহকে “দ্বিতীয়া” বিবাহ বলা হয়। ওদের মধ্যে বিধবার পুনরায় বিবাহকেও “দ্বিতীয়া” বিবাহ বলা হয়। দ্বিতীয় বিবাহের এক বিচিত্র আনুষ্ঠানিক উপসঙ্গের কথা এখানে উল্লেখযোগ্য। দ্বিতীয় বিবাহ বরের উপস্থিতিতে না হয়ে তার অনুপস্থিতিতে সম্পন্ন হয়। এরূপ বিবাহে সাধারণতঃ বরের ছোট ভাই এসে কনের হাতে বালা পরিয়ে দেয় ।
বঙ্গদেশে গণিকাদের মধ্যেও বিবাহ প্রচলিত আছে । এক্ষেত্রে হিন্দু গণিকাদের মধ্যে বিবাহ সাধারণত কোন জড়বুদ্ধি সম্পন্ন ব্যক্তি বা ভাড়া করা বৈষ্ণব বা কোন গাছের সঙ্গে দেওয়া হয়। মুসলমান গণিকা্রা এরূপ বিবাহ তরবারী বা ছুরিকার সঙ্গে করে। হিন্দু গণিকাদের ক্ষেত্রে ওই বৃক্ষকে যত্নসহকারে জল দিয়ে পালন করা হয় আর মুসলমান গণিকারা ওই তরবারী বা ছুরিকা সযত্ন্রে কোন পেটিকার মধ্যে রক্ষা করে। তাদের বিশ্বাস যে, কোনক্রমে এগুলি বিনষ্ট হলে কন্যা বিধবা হবে।
০৬. আদিবাসীর সমাজ সংগঠন ও বিবাহ
আদিবাসীসমাজ সংগঠিত হয় উপজাতি বা ট্রাইবের ভিত্তিতে। প্রত্যেক ট্রাইবেরই স্বকীয় ভাষা ও কৃষ্টি আছে। প্রায়ই ট্রাইবগুলি বহু শাখায় বিভক্ত হয়। ট্রাইব ও তার শাখাগুলি সাধারণত অন্তর্বিবাহের গোষ্ঠী। যদি কেউ ট্রাইব বা তার শাখার বাইরে বিবাহ করে তা হলে তাকে ট্রাইব থেকে বহিস্কৃত করে দেওয়া হয়। ট্রাইব বা তার শাখাগুলি আবার কতকগুলি উপশাখা বা দলে বিভক্ত হয়। এই সকল উপশাখা বা দলগুলি হচ্ছে বহির্বিবাহের গোষ্ঠী। আদিবাসীর মধ্যে বহির্বিবাহেব এই গোষ্ঠীগুলি সাধাবণত টটেমভিত্তিক। তাব মানে প্রত্যেক গোষ্ঠীরই এক একটি নিজস্ব টটেম আছে। একই টটেমবিশিষ্ট গোষ্ঠীর স্ত্রী-পুরুষ পৰস্পরকে বিবাহ করতে পাবে না। তাদেব বিয়ে কবতে হয় অন্য টটেম গোষ্ঠীতে। তবে, বহির্বিবাহের এই গোষ্ঠীগুলি যে সব ক্ষেত্রেই টটেমভিত্তিক হয়, তা নয়। অনেক সময় এগুলি গ্রামভিত্তিক হয়। সেরূপ ক্ষেত্রে একই গ্রামের ছেলেমেয়েরা পরস্পবকে বিবাহ করতে পারে না। কেননা, তাদের বিশ্বাস এই যে, একই গ্রামের সকল অধিবাসীব মধ্যে একই রক্ত প্রবাহিত হচ্ছে এবং সেই কারণে তাদের মধ্যে রক্তের ঐক্যতা আছে। এই রক্তের ঐক্যতাহেতু তাদের মধ্যে কখনও বিবাহ হতে পারে না। তাদের অন্ত গ্রামে বিবাহ করতে হয়। প্রায়ই দেখা যায় যে, একই টটেমের লোকেরা একই গ্রামে বাস করে। এরূপ ক্ষেত্রে টটেমনিষিদ্ধ বিবাহবিধান স্বয়ংচল হয়ে গ্রামনিষিদ্ধ বিবাহবিধানে পরিণত হয়।
