হিন্দুসমাজে উচ্চবর্ণের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ অসম্ভব ব্যাপার ছিল। তার কারণ, হিন্দুর দৃষ্টি-ভঙ্গীতে বিবাহ “চুক্তি” বিশেষ নয়। এটা হচ্ছে একটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান এবং বিশুদ্ধিকরণের জন্য দ্বিজাতির মধ্যে যে দশবিধ সংস্কার আছে, বিবাহ তার মধ্যে শেষ ও চরম সংস্কার। এই সংস্কার দ্বারা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক স্থাপিত হয়। ১৯৫৬ সালে হিন্দুবিবাহ আইন প্রণীত হবার পূর্ব পর্যন্ত স্বামী দ্বিতীয়বার দারপরিগ্রহ করতে পারতে। কিন্তু সে কারণে প্রথম স্ত্রীর সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হতো না। এক কথায় সনাতন হিন্দুসমাজে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক কখনও প্রত্যাহৃত হবার অবকাশ ছিল না, তবে স্ত্রী ব্যভিচারিণী হলে তাকে সমাজ থেকে বহিস্কৃত করে দেওয়া হতো এবং স্ত্রী হিসাবে সে তার পূর্বমর্যাদা হারাতো। কিন্তু উত্তর ভারতের নিম্নজাতির মধ্যে ও দক্ষিণ ভারতের কোন কোন উচ্চ ও নিমজাতির মধ্যে, বিশেষ করে যেখানে “সম্বন্ধম” প্রথার বিবাহ প্রচলিত আছে সেখানে বিবাহ-বিচ্ছেদ কঠিন ব্যাপার নয়। উত্তর ভারতের জৌনসর বাওয়ার অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রচলিত আছে। সেখানে একে “ছুট” বলা হয়। মুখের কথায় বা লিখিতভাবে যে কোন সময় যে কোন স্বামী স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করতে পারে, যে পরবর্তী পুরুষ তাকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করবে সে প্রথম স্বামীকে দ্বিগুণ “জিওধন” বা কন্যাপণ দিতে প্রস্তুত থাকে। দেরাদুনের চাকরত। তহশীলে পূর্বস্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন স্ত্রীলোককে বিবাহ করতে হলে পাত্র কর্তৃক কন্যার পিতাকে বিবাহের আনুষ্ঠানিক ব্যয় বাবদ “জিওধন” দেবার প্রথা প্রচলিত আছে। টেরি গাড়ওয়াল অঞ্চলের ডোম জাতির মধ্যেও বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে । সেখানে স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরের সম্মতি অনুসারে বিবাহ সম্পর্কের বিচ্ছেদ ঘটে। তবে কোন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ ব্যতিরেকে আজকাল বিবাহ-বিচ্ছেদ সচরাচর ঘটে না ।
অনেক জায়গায় আবার রিবাহ-বিচ্ছেদের ফলে স্ত্রীলোকের পদমর্যাদা বেড়ে যায়। দক্ষিণ ভারতের কুরুবদের মধ্যে যে স্ত্রীলোক সাতবার স্বামী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সে স্ত্রীলোকের পদমর্যাদা আচার অঙ্গুষ্ঠানের ব্যাপারে অনেক উচ্চ। বিবাহের আচার-অনুষ্ঠানের ব্যাপারে এরূপ স্ত্রীলোক সাধারণতঃ নেতৃস্থান অধিকার করে। মধ্য প্রদেশেও অনেক জাতির মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে । সেখানে প্রথম স্বামী কন্যাপণ ফেরত পেলেই স্ত্রীকে অনুমতি দেয় অপরের সঙ্গে চলে যেতে এবং তাকে বিবাহ করতে। তারপর পঞ্চায়েতকে ভোজন করিয়ে দিলেই বিবাহ-বিচ্ছেদ ও নূতন বিবাহ অনুমোদিত হয়। হোশঙ্গাবাদের রাজপুতবংশীয় যাদব নামে এক উচ্চ জাতির মধ্যে কোন কোন নারী তার সমগ্র জীবনকালের মধ্যে নয়-দশবার পর্যন্ত বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন করে। বিহারের নিম্ন জাতিসমূহের মধ্যেও বিবাহ-বিচ্ছেদ প্রথা প্রচলিত আছে। এক কথায়, সমগ্র ভারতেই নিম্নশ্রেণীর কৃষক ও শ্রমিক শ্রেণীর অস্ত্যজ জাতিসমূহের মধ্যে বিবাহের সম্পর্ক খুব সহজভাবেই বিচ্ছিন্ন করা যায়। ১৯৫৬ সালে প্রণীত হিন্দুবিবাহ আইন দ্বারা হিন্দুদের মধ্যে আদালতের সাহায্যে ক্ষেত্রবিশেষে বিবাহ-বিচ্ছেদ সহজ হয়ে গেছে ।
কেরালার মাতৃকেন্দ্রিক ক্ষত্রিয় নায়ারজাতির মেয়েদের সঙ্গে পিতৃকেন্দ্রিক নাম্বুদ্র ব্রাহ্মণদের এক বিচিত্র দাম্পত্যবন্ধন দেখা যায়। নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণদের সহিত উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণদের এক বৈশিষ্ট্যমূলক পার্থক্য এই যে,সামাজিক প্রথানুযায়ী নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণদের মধ্যে প্রথম ও দ্বিতীয় পুত্রদ্বয়ই নিজ জাতির মধ্যে বিবাহ করতে পারে, অপর পুত্রেরা তা পারে না। তারা মাতৃকেন্দ্রিক ক্ষত্রিয় নায়ার জাতির স্ত্রীলোকদের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্ক স্থাপন করে। এরূপ সম্পর্ককে “সম্বন্ধম” বলা হয়। নায়ারদের মধ্যে গোষ্ঠীকে “তারবার” বলা হয়। কোন এক বিশেষ তারবারভুক্ত নায়ার-রমণীর সহিত কোন নাম্বুদ্র ব্রাহ্মণপুত্রের যে “সম্বন্ধম” সম্পর্ক স্থাপিত হয় সেই সম্পর্কবলে সেই নায়ার-রমণীকে গর্ভবতী করবার অধিকার তার থাকে। তবে নায়ারদের মধ্যে যে সাধারণ নিয়মানুগ বিবাহ প্রচলিত নেই, এমন নয়। সাধারণ নিয়মানুগ বিবাহপ্রথাও তাদের মধ্যে প্রচলিত আছে। তবে এরূপ বিবাহ সাময়িক ও বিকল্প বিৰাহ মাত্র। যৌবনারম্ভের সঙ্গে সঙ্গে নায়ার-কুমারীদের নিজ জাতিভুক্ত কোন নির্দিষ্ট গোষ্ঠীভুক্ত পুরুষের সঙ্গে বিবাহ হয়। পরে এই বিবাহের বিচ্ছেদ ঘটিয়ে, নায়ার-রমণী যে কোন নাম্বুদ্র ব্রাহ্মণের সঙ্গে দাম্পত্যসম্পর্ক স্থাপন করতে পারে । “সম্বন্ধম” সম্পর্ক অবিনশ্বর নয়। অনেক সময় কোন কোন নায়ার-রমণীকে পরপর ১০১২ জন নাম্বুদ্র ব্রাহ্মণের সঙ্গে “সম্বন্ধম” স্থাপন করতে দেখা যায়। নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণ কখনও তার নায়ার স্ত্রীর গৃহে গিয়ে বাস করে না। নায়ার স্ত্রীও কখনও তার নাম্বুদ্র স্বামীর ঘরে যায় না। নায়াররা মাতৃকেন্দ্রিক জাতি, সুতরাং বিবাহের পর কখনও স্বামীগৃহে যায় না। সাধারণতঃ নাম্বুদ্র স্বামী সন্ধ্যার পর যৌনমিলনের জন্য নায়ার-স্ত্রীর গৃহে আসে এবং মিলনাস্তে পুনরায় নিজ পিতৃকেন্দ্রিক পরিবারের মধ্যে ফিরে যায়। অনেক সময় নায়ার-রমণী একইকালে একাধিক নাম্বুদ্রী ব্রাহ্মণের সঙ্গে “সম্বন্ধম” সম্পর্ক স্থাপন করে। এরূপ ক্ষেত্রে এরূপ আচরণ বহুপতিক বিবাহের রূপ ধারণ করে। যে ক্ষেত্রে এই সম্পর্ক এইভাবে বহুপতিক বিবাহের রূপ ধারণ করে সে ক্ষেত্রে সকল স্বামীরই ওই নায়ার-রমণীর উপর সমান যৌনাধিকার থাকে। একজন স্বামী এসে দ্বারদেশে যদি অপর স্বামীর ঢাল বা বর্শা দেখতে পায় তা হলে সে প্রত্যাগমন করে ও পরবর্তী সন্ধ্যায় পুনরায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করতে আসে।
