বড় মিস্ত্রি কানে পেনসিল গুঁজে সেই প্রায়—অন্ধকার রসদঘরে কাজ করতেন। তক্তাগুলোকে পালিশ করে উজ্জ্বল করে তুলতেন মাঝে মাঝে। কিছু পাথর কফিনে সাজিয়ে চট বিছিয়ে মর্লিনের বিছানা, তারপর ওরা গান করত নিচে। দুঃখ এবং বেদনায় সেই গান সমুজ্জ্বল। মাঝে মাঝে ওরা নিজেদের ঘর অথবা স্ত্রী পুত্রদের কথা বলত। ওরা বলত, আমরা যথার্থই মানুষ, ঈশ্বর!
বড় মিস্ত্রি বলতেন, আমার বড় ছেলেটা জলে ডুবে মারা গেল! দুঃখ আমার অনেক স্টুয়ার্ড। স্টুয়ার্ড বলত, কী আশ্চর্য স্যার, আমরা মর্লিনকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি দেখুন। সুখানী এসব কথায় থাকত না; সে চুপচাপ একটু ফাঁক পেলেই রসদ ঘর অতিক্রম করে বরফ ঘরে ঢুকে যেত। মাঝে মাঝে বলত, দেখছেন স্যার, মর্লিন অবিকৃতই আছে। মনে হয় মেয়েটা ঘুমিয়ে গেছে।
বড় মিস্ত্রি বললেন, কফিনে কিছু কারুকার্য করলে ভালো হত।
স্টুয়ার্ড বলল, স্যার ধর্মযাজকের কাজটুকু কে করবে?
সুখানী বলল, কেন আমরাই করব। পৃথিবীতে আমরা তিনজন বাদে মর্লিনকে আর কে এত ভালোবেসেছে। এই জাহাজে কাজের ফাঁকে একটু অবসর পেলেই আমরা এখানে আশ্রয় নিয়েছি। মর্লিনকে জীবনের সুখদুঃখের ভাগ দিয়েছি। ধর্মযাজকের কাজ আমরাই করব। আমরা তিনজন ওর শববাহক হব। আমরা তিনজন ওর পরম আত্মীয় এবং আমরা তিনজনই ওর ধর্মযাজক। সুখানী কিছুটা দৃঢ়তার সঙ্গেই কথাগুলি উচ্চারণ করল। তারপর গজকাঠি দিয়ে কফিনের মাপ দেখে বলল, ইচ্ছে হচ্ছে এই কফিনের পাশে একটু জায়গা নিয়ে শুয়ে থাকি। আর উঠব না। সব সুখ দুঃখ প্রিয় মর্লিনের সঙ্গে নিঃশেষ হয়ে যাক।
রাতে বড় মিস্ত্রি বললেন, আমার কাজ শেষ। এসো, এখন আমরা ওকে কফিনের ভিতর পুরে দি।
সুখানী কাতর গলায় বলল, স্যার, আজ থাক। আসুন, আজও আমরা গোল হয়ে বসি। মর্লিনকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজে আমরা বড় একা হয়ে যাব। জাহাজটা বড় অসহায় লাগবে। এইসব কথার সঙ্গে এক দ্রুত কান্নার আবেগ উথলে ওঠে সুখানীর গলাতে। ঘরে আমার স্যার কেউ নেই। এলবিকে পরিত্যাগ করে আর কোথাও নোঙর ফেলতে পারিনি। প্রিয় মর্লিন আমাকে একটু আশ্রয় দিয়েছিল যেন। স্যার, ওকে সমুদ্রের জলে ভাসিয়ে দেব!
বড় মিস্ত্রি বললেন, আমারও ভালো লাগছে না হে।
স্টুয়ার্ড বলল, আজকে থাক। কালই ওকে গভীর সমুদ্রে নিক্ষেপ করব।
পরদিন ওরা তিনজন যখন রাত গভীর, জাহাজিরা কোথাও কেউ জেগে নেই, শুধু ওয়াচের জাহাজিরা এনজিন রুমে এবং ব্রিজে পাহারা দিচ্ছে, যখন সমুদ্র শান্ত, যখন আকাশে অজস্র তারা জ্বলছিল এবং দূরে কোথাও কোনো তিমি মাছের দল ভেসে যাচ্ছে অথবা ডলফিনের ঝাঁক এবং এক কাক—জ্যোৎস্না নীল জলের উপর, জাহাজটা রাজহাঁসের মতো সাঁতার কাটছে তখন শববাহী দলটি গ্যাঙওয়েতে কফিন রেখে সব বাসি ফুলগুলি প্রথমে সমুদ্রে ফেলে দিল। ফুলগুলি দূরে দূরে ভেসে যাচ্ছে, ওরা ফুলগুলি দেখতে পাচ্ছে না। ওরা মর্লিনের জুতো এবং গাউন নিক্ষেপ করল, তারপর হাতের দস্তানা। ওরা এসব ফেলে দেবার সময়ই কাঁদছিল। ওরা কাঁদছিল। তিনজন নাবিকের চোখ থেকে জল কফিনের উপর পড়ছিল। সমুদ্র এবং বন্দর যাদের ঘর এবং এইসব বেশ্যামেয়েরা যাদের ঘরণি সেইসব রমণীদের উদ্দেশ্যে তিনজন নাবিক যেন চোখের জল ফেলছিল। ওরা পরস্পর দুঃখে এতই কাতর, ওরা এতই ব্যথিত….. ওরা কান্নার আবেগ সামলানোর জন্য রুমাল ঠেসে দিচ্ছিল মুখে। ওরা প্রিয় মর্লিনের কফিন কাঁধে তুলে ধীরে ধীরে সমুদ্রের জলে ফেলে, দেখল, আস্তে আস্তে প্রিয় মর্লিন জলের নিচে ডুবে যাচ্ছে। ওরা পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কান্নার আবেগে এলবির উচ্চারিত সেই কবিতাটি আবৃত্তি করল—
‘‘When the warriors came out first from
their Master’s hall, where had they hid
their power? Where were their armour
and their arms?
They looked poor and helpless, and
the arrows were showered upon them
on the day they came out from their
Master’s hall.
When the warriors marched back
again to their Master’s hall where did
they hide their power?
They had dropped the sword and
dropped the bow and the arrow; peace
was on their foreheads; and they had
left the fruits of their life behind them
on the day they marched back again to their Master’s hall.’’