ঘরের যা চেহারা হয়েছে দেখে আমি আঁতকে উঠলাম। আমার একটি মাত্র চেয়ার। সেটারও একটা পায়া বুড়ো মানুষের দাঁতের মতো অবিরাম নড়বড় করছে। সাবধানে না বসলে উপবিষ্ট ব্যক্তিকে প্রপাত ধরণীতল হতে হয়। দেয়ালগুলোতে অসংখ্য গর্ত। প্রত্যেক গর্তে টিকটিকি বাহাদুরেরা স্থায়ী নিবাস রচনা করেছে। সপরিবারে। মশারির রঙ উঠে গেছে এবং জায়গায় জায়গায় ছিঁড়ে গেছে। গিঁট দিয়ে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। বালিশ দুটো মোটামুটি মন্দ নয়। বিছানার ওটা নিয়ে আমি নিজে খানিকটে গর্ব করে থাকি। আমার এক বন্ধু সিঙ্গাপুর থেকে এই চাদরটা এনে দিয়েছিল। বহু ব্যবহারে রঙটা উঠে গেলেও চাঁদরের জমিনের ঠাস বুনুনি এখনো চোখে পড়ে। আমার ঘরের সবচাইতে দর্শনীয় জিনিস হলো একটা হিটার। প্রথম স্কলারশিপের টাকা উঠিয়ে নিউমার্কেটের দোকান থেকে ওটা কিনেছিলাম। অনেকদিনের ব্যবহারে টিনের শরীরটাতে মরচে ধরেছে। নাড়াচাড়া করলে হিটার সাহেবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো ঝরে পড়তে থাকে। একদিন চা বানাতে গিয়ে প্রচণ্ড একটা ধাক্কা খেলাম। আমি ছিটকে পড়ে গেলাম। স্পৃষ্ট হওয়া আঙুল দুটো ঢাকের কাঠির মতো নেচে নেচে উঠছিল। হিটার সাহেব ধাক্কা দিয়ে পেছনে ঠেলে দিয়েছিল। যদি সামনের দিকে টেনে নিয়ে যেত, তাহলে সেদিনটাই হতো আমার হোস্টেলবাসের অন্তিম দিন। বুঝলাম এই জিনিসটা দিয়ে আর চলবে না, একে বিদেয় করতে হবে। কিন্তু হিটার ছাড়া আমার চলবে কেমন করে! আমি যে পরিমাণ চা খাই, বাইরে থেকে কিনে খেতে হলে ভাত খাওয়া বন্ধ করতে হবে। মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল। বাইরে একেবারে দেয়ালের গোড়ায় দেখি একটা ভাঙা টব পড়ে আছে। আমার কেমন কৌতূহল জন্মে গেল। সেটা নিয়ে এলাম এবং তার মধ্যে হিটারের প্লেটটা বসিয়ে দিলাম। তারপর একপাশের দেয়ালে একটা ফুটো করে হিটারের তারটা বাইরে নিয়ে এসে প্ল্যাকের সঙ্গে জুড়ে দিলাম। সুইচ অন করে দেখি বেশ কাজ করে। আমার মাথা থেকে একটা দুর্ভাবনা চলে গেল। শক লাগার কোনো সম্ভাবনা নেই। মাটি বিদ্যুৎ পরিবাহী নয়। একটা বিকল্প হিটার তৈরি করতে পেরে গর্বে আমার বুকটা ফুলে উঠল। বন্ধু-বান্ধব সবাইকে নিজের উদ্ভাবিত জিনিসটা দেখিয়ে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি। ভাবখানা এমন, আমি নতুন একটা জিনিস বুদ্ধি খাঁটিয়ে আবিষ্কার করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে আমার ওই নতুন আবিষ্কার বিখ্যাত হয়ে উঠেছিল। ভেবে দেখলাম, কন্যা শামারোখকে আমার এই অপূর্ব আবিষ্কারটা ছাড়া দেখাবার কিছু নেই। সে হয়তো আমার উদ্ভাবনী প্রতিভার তারিফ করবে। অবাক হওয়ার ভঙ্গি করে বলবে, ওমা তলে তলে আপনার এত বুদ্ধি! আপনাকে তো শুধু লেখক হিসেবেই জানতাম। এখন দেখতে পাচ্ছি, আপনি একজন পুরোদস্তুর বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। কল্পনা করে সুখ। আমিও কল্পনা করলাম আমার অভাবনীয় কীর্তি দেখে তার সুন্দর দ্বিতীয়ার চাঁদের মতো ললাটে কুঞ্চিত রেখা জেগে উঠবে। মুখের ভাবে আসবে পরিবর্তন।
নিজের অবস্থার কথা যখন বিবেচনা করলাম, চারপাশ থেকে একটা শূন্যতা বোধ আমাকে আক্রমণ করে বসল। ওই অনিন্দ্য সুন্দরী যখন দেখবে আমি কত গরিব, তার মুখমণ্ডলে যে একটা তাচ্ছিল্যের ভাব জেগে উঠবে, সে কথা আগাম কল্পনা করে আমি শিউরে উঠলাম। কন্যা শামারোখ সারা ঘরে একবার দৃষ্টি বুলিয়ে হয়তো ফেরত চলে যাবে এবং বলবে, না ভাই আমি ভুল করে ভুল ঠিকানায় চলে এসেছি। এখন চলোম, আমার কাজ আছে। আমার ভীষণ আফসোস হতে থাকল, তাকে চিঠি লিখে আসতে নিষেধ করি নি কেন? আমার মনে ভিন্নরকম একটা চিন্তা ঢেউ দিয়ে গেল। আমার বন্ধুর বোনের বাড়িতে গিয়ে যদি সুন্দর চাদর, বালিশ, মশারি একদিনের জন্য ধার করে নিয়ে আসি! আমার ভেতরে পরক্ষণেই একটা বিদ্রোহের ঢেউ খেলে গেল। আমি গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। আমার ঘরের অবস্থা যত করুণই হোক না কেন আমি ছদ্মবেশ ধারণ করতে পারব না। যা আমার নয়, আমার বলে প্রদর্শন করতে পারব না। কন্যা শামারোখ যদি ওয়াক থু বলে একদলা থুথু আমার মুখে ছুঁড়ে দিয়ে অনুতাপ করতে করতে চলে যায়, তাই সই। শামারোখ ঘরে বসুক অথবা চলে যাক, কিছু যায় আসে না, আমি আমিই।
অবশেষে আকাঙ্ক্ষিত অক্টোবরের চার তারিখটি এসে গেল। আমি সূর্য ওঠার অনেক আগে উঠে ঘরের মেঝেটা পরিষ্কার করলাম, দেয়াল এবং ছাদের স্কুল ঝাড়লাম। যতই ভদ্রস্থ করার চেষ্টা করিনে কেন বিশ্রী চেহারাটা আরো বেশি করে ধরা পড়ে। এক সময় গৃহ সংস্কার-কর্মে ক্ষান্তি দিয়ে বারান্দার রেলিংয়ের গোড়ায় এসে দাঁড়ালাম। আমার মনে হচ্ছিল আজ সকালে সূর্য নতুন কিরণধারা বিতরণ করছে। পাখি সম্পূর্ণ নতুন সুরে গাইছে। তরুলতার পত্রমর্মরে একটা অঞতরাগিণী বেজে যাচ্ছে। আমার মনের তারে তার সূক্ষ্ম সুর অনুভব করছি। আমার জীবনে এমন সকাল কোনোদিন আসেনি।
ক্যান্টিনে গিয়ে নাস্তা করে রেলিংয়ের গোড়ায় বসে রইলাম। প্রতিটি রিকশা, বেবিট্যাক্সি হোস্টেলের দিকে আসতে দেখলে আমি চমকে উঠতে থাকি। আমি বসে আছি। একে একে রিকশা-ট্যাক্সি চলে যাচ্ছে, কন্যা শামারোখের টিকিটিরও দেখা নেই। ঘন ঘন ঘড়ি দেখছি। দশটা বাজার মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি আছে। আমার ভেতর থেকে ফোঁস করে একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে এল। কন্যা শামারোখ কেন আমার ঘরে আসবে? তার কি অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই? দশটা বেজে যখন পাঁচ মিনিটে দূর থেকে রিকশায় শাড়ির আভাস লক্ষ্য করে মনে করলাম, আমার দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে কন্যা শামায়োখের আবির্ভাব ঘটল। কিন্তু রিকশাটা যখন কাছে এল, লক্ষ্য করলাম, আলাউদ্দিনের বেগম নিউমার্কেটের কাঁচাবাজার থেকে তরিতরকারি নিয়ে ফিরছেন। ধরে নিলাম, আজ আর কন্যা শামারোখের আগমন ঘটবে না। এমন করে বসে থেকে রাস্তা জরিপ করে কী লাভ! নিজের ওপরেই আমার ভীষণ রাগ হচ্ছিল। আমি একজন রাম বোকা। সবাই আমাকে ঠকায়। কন্যা শামারেখও আমাকে ধোঁকা দিয়ে গেল। তার ব্যাপারে জড়িয়ে যাওয়ার জন্য আমি নিজেকে ধিক্কার দিতে থাকি। সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে একরকম আনমনাই হয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ করে আমার দৃষ্টি একটা রিকশার দিকে আকৃষ্ট হলো। প্রথমে দেখলাম শাড়ির আঁচল। তারপর ঢেউ খেলানো চুলের রাশি। আমার শরীরের অণু-পরমাণু হঠাৎ গুঞ্জন করে উঠল। এ কন্যা শামারোখ ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে না। নিশ্চয়ই অন্য কেউ নয়। রিকশাটা হোস্টেলের গেটে এল এবং নামল। আমার বুকের ভেতরে রক্ত ছলকাতে আরম্ভ করেছে। ইচ্ছে হলো কন্যা শামারোখ যেখানে চরণ রেখেছে, সেখানে আমার বুকটা বিছিয়ে দিই না কেন? কিন্তু বাস্তবে আমি সেই তিন ঠেঙে চেয়ারে স্থাণুর মতো বসে রইলাম। আমার পা দুটো যেন দেবে গেছে। কন্যা শামারোখ একতলার সিঁড়ি ভেঙে দোতলায় উঠে আমার ঘরের দিকে এগিয়ে আসছে। যেখানেই পদতল রাখছে, যেন গোলাপ ফুটে উঠছে। আমার কাছাকাছি যখন এল, আপনা থেকেই একটা সুন্দর হাসি তার ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠল। তার সাদা সুন্দর দাঁতগুলো ঝিলিক দিয়ে জেগে উঠল। আমার মনে হলো আমাদের হোস্টেলের ব্যালকনিতে সুমেরুরেখার ওপর সূর্য শিখা ঝলক দিয়ে জাগল।
