আমি তাকে আমার ঘরে নিয়ে গেলাম। কন্যা শামারোখ এক নজরে সমস্ত ঘরের চেহারাটা দেখে নিল, তারপর প্রথম বাক্য উচ্চারণ করল, জাহিদ, আমি যে আপনার ঘরে এসেছি সেজন্য আপনার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। আমি যেমনটা আকাঙ্ক্ষা করেছিলাম, কন্যা শামায়োখ অবিকল সে কথাই বলেছে। অনুভব করলাম, কন্যা শামারোখ সুন্দরী বটে, কিন্তু তার মনে কোনো দয়া নেই। দরিদ্রের অক্ষমতাকে কেউ যখন অবজ্ঞা করে, সেটা হাজার গুণ নিষ্ঠুর হয়ে বাজে।
আমি উঠে দাঁড়ালাম। আমার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেল। কন্যা শামায়োখকে বললাম, আপনি যে রিকশায় চেপে এসেছেন, সেটা এখানে দাঁড়িয়ে আছে। শামায়োখ বলল, রিকশা দাঁড়িয়ে থাকলে আমি কি করব? আমি বললাম, সেটাতে চড়ে ফেরত চলে যাবেন। আপনি নিজের ইচ্ছেয় আমার ঘরে এসেছেন। আমি গরিব বটে কিন্তু আমাকে অপমান করার কোনো স্পর্ধা থাকা আপনার উচিত নয়।
আমার কথা শুনে কন্যা শামারোখ খিলখিল করে হেসে উঠল। সে যখন হাসে যেন ঝরনার কলধ্বনি বেজে ওঠে। তারপর বলল, আপনি ভীষণ বদরাগী মানুষ। আপনার নাকটা ভয়ানক ছুঁচোলো। মানুষের ওই ধরনের নাক থাকলে ভয়ানক বদরাগী হয়। আর তাছাড়া…। আমি বললাম, তাছাড়া আবার কি? আপনার লেখাগুলোও রাগী। একটু একটু করে আশ্চর্য হচ্ছিলাম। আমি জানতে চাইলাম, আমার লেখা আপনি পড়েছেন? সে বলল, সব পড়ে উঠতে পারিনি। ইব্রাহিম সাহেবের কাছ থেকে দুটো বই ধার নিয়েছিলাম। বাকি লেখাগুলো আপনার কাছ থেকেই ধার করব।
তারপর সে তিন পেয়ে চেয়ারটা বসার জন্য টেনে নিল। আমি হা-হা করে। উঠলাম, ওটাতে বসবেন না। সে জিজ্ঞেস করল, ওটাতে বসলে কি হয়? আমি বললাম, পড়ে যাবেন যে, ওটার একটা পায়া নেই। কন্যা শামারোখ চেয়ারটা টেনে নিয়ে টেবিলের সঙ্গে ঠেস দিল। তারপর বসে পড়ল এবং বলল, এই বসলাম, আমার পড়ে যাওয়ার ভয় নেই। তারপর আমার চোখে চোখ রেখে বলল, আপনার ভেতরে যত রাগের কথা আছে একটা একটা করে বলতে থাকুন। আপনার বিষয়ে মানুষ আমার কাছে অনেক কথা বলেছে। তাই আপনার কথা শুনতে এসেছি। আমি বললাম, দেখছেন না কী এক হতশ্রী ঘরে আমাকে ছন্নছাড়ার মতো বাস করতে হয়। সে বলল, আপনি যে ছন্নছাড়া সে কথা নিজের মুখে বলতে হবে না। আমি দেখা মাত্রই বুঝে ফেলেছি। অন্য কথা বলুন। আমি বললাম, অন্য কি কথা বলব, শামারোখ জিজ্ঞেস করে বসল, আপনার বাবা বেঁচে আছেন? আমি বললাম, না, যে বছর আমি কলেজে ভর্তি হই, সে বছরই তিনি মারা যান। মৃত্যুর সময় বাবাকে আমি দেখতেও পাইনি, তখন জেলে ছিলাম কিনা। কন্যা শামারোখ আমার কথা শুনে আরো বেশি মনোযোগী হয়ে উঠল, বারে, আপনি জেলেও ছিলেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। কতদিন? বললাম, বেশি নয়। বছরখানেক। সে কথা বাড়ালো না জানতে চাইল, আপনার মা আছেন? আমি বললাম, মাও নেই। মারা গেছেন এই তিন মাস হয়। মাকেও আমি দেখতে পাইনি। মা যখন মারা গেছেন তখন রাজশাহীতে একটা রাজনৈতিক সভায় বক্তৃতা দিতে গিয়েছিলাম। কন্যা শামায়োখ চুকচুক করে আফসোস করল। তারপর বলল, আপনার ভাইটাই কেউ নেই? জবাব দিলাম, ভাইটিও পাঁচ বছর আগে গত হয়েছেন। তার একপাল নাবালক ছেলেমেয়ে আছে। আমাকে তাদের দেখভাল করতে হয়। বোন নেই? আমি বললাম, চারজন। একজনের বর মোলই ডিসেম্বরের দিনেই পাকিস্তানি সৈন্যের হাতে গুলি খেয়ে মারা গেছে। সৈন্যরা কক্সবাজারের দিক থেকে জিপে করে আত্মসমর্পণ করতে ছুটে আসছিল। আমার দুলাভাই মজা দেখতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। একজন পাকিস্তানি সৈন্য গুলি করে তাকে চিরদিনের জন্য নীরব করে দেয়। অন্য বোনেরাও গরিব। ওদের সবার খবরা-খবর আমাকেই রাখতে হয়। আমি এক নিশ্বাসে আমার সমস্ত কথা বলে গেলাম। কন্যা শামারোখ তার আয়ত চোখ দুটো আমার চোখের ওপর স্থাপন করল। মনে হলো, অশ্রু চিকচিক করছে। তার চোখ দুটো যেন চোখ নয়, থরোথরো কম্পিত হৃদয়। তারপর সে বলল, আপনার এখানে খাওয়ার কিছু নেই? আমি বললাম, মুড়ি ছিল। গতকাল শেষ হয়ে গিয়েছে। যদি খালি চা খেতে চান তো বানিয়ে দিতে পারি। তবে আমার এখানে দুধ নেই। সে বলল, আপনার লাল চা-ই বানান দেখি। আমার চায়ের তেষ্টা লেগেছে। আমি চা করার জন্য যেই অভিনব হিটারের গোড়ায় গিয়েছি, শামারোখ কথা বলে উঠল, দেখি দেখি আপনার হিটারটা। তখন আমাকে তার কাছে হিটারের জন্ম বৃত্তান্তটা বলতে হলো। চা বানিয়ে তার সামনে টেবিলে রাখলে সে পেয়ালাটা তুলে নিয়ে একটা চুমুক দিয়েই বলে ফেলল, আপনি চমৎকার চা তৈরি করেন। আর ভীষণ মজার মানুষ। আমি ঠিক করেছি, আপনাকে আমার লেখা কবিতাগুলো পড়তে দেব। আমি বললাম, আপনি কবিতা লেখেন না কি? হ্যাঁ, একটা পাণ্ডুলিপি তৈরি করেছি। আপনার সেই প্রবীণ বটের অনুসরণ করে আমি একটা কবিতার গোটা একটা বই লিখে ফেলেছি। নাম রেখেছি ‘কালো মানুষেরা কসিদা’। একটা মজার জিনিস দেখবেন? আমি বললাম, দেখান। কন্যা শামারোখ মোটা মলাটের খাতাটা খুলে দেখালেন, প্রবীণ বটের কবি জনাব জাহিদ হাসানের নামে উৎসর্গ করা হলো। আমি মনে করলাম, আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে তোলার দেবতা মারা যান নি, এখনো বহাল তবিয়তে তিনি বেঁচে রয়েছেন। আমার এমন আনন্দ হলো, হঠাৎ করে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেললাম। এই বিস্ময়বোধ কাটিয়ে ওঠার জন্য কন্যা শামারোখকে বললাম, প্রথমদিকের লেখা পড়ন। কন্যা শামারোখ ঘাড়টা সুন্দরভাবে দুলিয়ে বলল, না, সেটি হচ্ছে না। আমি আপনার কাছে গোটা খাতাটা রেখে যাব। আগামী শুক্রবার বিকেলবেলা এসে আপনার মতামত শুনব। সে আস্ত খাতাটা আমার হাতে তুলে দিল। তার হাতে আমার হাত লেগে গেল।
