এক সময় কন্যা শামায়োখের কানে এই সব রটনার কথা গিয়ে পৌঁছুলো। আমি একটা চিঠি পেলাম। চিঠিটা এসেছে হোস্টেলের ঠিকানায় এবং লিখেছে কন্যা শামায়োখ। লিখেছে, প্রিয় জাহিদ, বাংলা একাডেমীতে আপনার কথাবার্তা শুনে আমার মনে আপনার সম্পর্কে একটা খারাপ ধারণা জন্ম নিয়েছিল। পরে বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি, আপনি আমার ব্যাপারে সুপারিশ করতে গিয়ে শক্তিমান মানুষদের কোপদৃষ্টিতে পড়ে গেছেন। ব্যাপারটা আমাকে ভীষণ ব্যথিত করেছে। আপনার সঙ্গে আমার কোনো পরিচয় হয়নি। বাংলা একাডেমীতে এক ঝলক দেখেছিলাম বটে, কিন্তু তাকে পরিচয় বলা চলে না। সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মহিলার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আপনি যে স্বেচ্ছায় বিপদ ঘাড়ে নিলেন, আপনার এই মহানুভবতা আমাকে মুগ্ধ এবং বিস্মিত করেছে। আমি আগামী ৪ অক্টোবর শুক্রবার সকাল দশটায় আপনার হোস্টেলে এসে ব্যক্তিগতভাবে আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই। আমরা এক আজব সময়ে বসবাস করছি। নিজের স্বার্থের প্রশ্ন না থাকলে কেউ কারো জন্য সামান্য বাক্য ব্যয় করতেও কুণ্ঠিত হয়। সুতরাং অনুরোধ করছি শুক্রবার দশটায় আপনি হোস্টেলে থাকবেন। তখন আপনার সঙ্গে ভাল করে পরিচয় হবে।
কন্যা শামায়োখের হাতের লেখা খুবই সুন্দর। সচরাচর মেয়েলি হাতের লেখা যে রকম হয়, তার চাইতে একটু আলাদা। সুন্দর কাগজে সবুজ কালিতে চিঠিটা লিখেছে। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অনেকবার পড়লাম। মামুলি অর্থের বাইরে আরো কোনো অর্থ আছে কি না, বার বার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করতে চেষ্টা করলাম। কন্যা শামারোখের চিঠিটা পাওয়ার পর মনে হতে থাকল, আমার সমস্ত অপমান-লাঞ্ছনার পুরস্কার পেয়ে গেছি। এর বেশি আর কি চাইবার ছিল! কন্যা শামারোখ আগামী ৪ অক্টোবর শুক্রবার আমার সঙ্গে দেখা করতে আমার হোস্টেলে আসবে এর চাইতে বড় সংবাদ আমার জন্য আর কি হতে পারে! বিপদের আশঙ্কা, অসহায়তার ভাব এক ফুকারে কোথায় উধাও হয়ে গেল! বুকের ভেতর সাহসের বিজলি ঝিলিক দিতে থাকল। কন্যা শামারোখের জন্যে আমি সমস্ত বিপদআপদ তুচ্ছ করতে পারি।
১১-১৫. সেপ্টেম্বর মাসের সাতাশ
আজ সেপ্টেম্বর মাসের সাতাশ তারিখ। চার অক্টোবরের আর কত দিন বাকি? দিনগুলো অসম্ভব রকম মন্থর এবং ভারি। কিছুতেই পার হতে চায় না। আমার প্রতীক্ষার যন্ত্রণা তীব্র থেকে তীব্র হয়ে উঠছে। কন্যা শামারোখ অক্টোবরের চার তারিখে আসবে বলেছে। কিন্তু ঐ তারিখটাই তাকে আঁকড়ে থাকতে হবে এমন কোনো কারণ আছে? চলে আসুক না যে কোনোদিন এবং সুন্দর একটা কৈফিয়ৎ হাজির করুক। বলুক না কেন আমার দিন-তারিখের ভীষণ গোলমাল হয়ে যায়। দেখতেই পাচ্ছেন কি রকম একটা খারাপ পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছি। যেসব মানুষের সঙ্গে আমার কোনোদিন চাক্ষুষ পরিচয় পর্যন্ত ঘটে নি, তারা একজোট হয়ে আমার শত্রুতা করছে। আমি বেচারি দিন-তারিখ কেমন করে মনে রাখি? আমি আসলে ভেবেছিলাম, সাতাশ তারিখেই আসব। ভুল করে অক্টোবরের চার তারিখ লেখা হয়ে গেছে। সেপ্টেম্বরের সাতাশ তারিখে চলে এসেছি বলে আমি কি আপনাকে অসুবিধায় ফেলে দিলাম? দয়া করে মাফ করে দেবেন, আমি কি করতে গিয়ে কি করে বসি নিজেও বলতে পারিনে। ভীষণ ভুলো মনের মহিলা আমি।
শিশুর মতো নিজেকেই প্রশ্ন করি । জগতে তো এখনো অনেক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে থাকে। আশ্চর্য কাণ্ড ঘটানোর দেবতা অন্তত আরেকটিবার প্রমাণ করুন এখনো তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়ে তুলতে পারেন, মানুষের বুদ্ধি-বিবেচনা যার কোনো তল পায় না। তিনি তার অঘটনঘটনপটীয়সী ক্ষমতা বলে পঞ্জিকার সেপ্টেম্বর মাসের সাতাশ তারিখকে অক্টোবরের চার তারিখে রূপান্তরিত করুন। উৎকণ্ঠাটা বেশি হলো, তার একটা কারণ আছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কারো জানতে বাকি নেই কন্যা শামায়োখের চাকরির বিষয় নিয়ে ঝুনো সব শিক্ষককে আমি ক্ষেপিয়ে তুলেছি। আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় বলে দিচ্ছিল, কন্যা শামায়োখ আমার কাছে আসছে, এই সংবাদটা অন্য কাউকে জানালে ফল ভাল হবে না। তাই তার আগমন-সংবাদ আমি কাক-পক্ষিকেও জানাইনি। কাউকে জানাইনি সেটা যেমন আমার গহন আনন্দের ব্যাপার, তেমনি তার বেদনাও অপরিসীম।
অক্টোবর মাসের চার তারিখে আমার কাছে কন্যা শামারোখ আসছে। এই সম্ভাব্য ঘটনা আমার মনে একটা তোলপাড় লাগিয়ে দিয়েছিল। আমি যখন একা একা রাস্তায় চলাফেরা করি, আমার হৃৎস্পন্দনের মধ্যে তার নামটি বেজে উঠতে থাকে। নিজের ভেতরে এতটা ডুবে থাকি যে, কেউ কিছু জানতে চাইলে, হঠাৎ করে জবাব দিতে পারিনে। আমি প্রশ্নকর্তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরির তিনতলায় আমার একটা রুম আছে। একেবারেই নির্জন। মাঝে-মধ্যে কার্নিশে দুটো চড়াই এবং কয়েকটা শালিক উড়ে এসে নিজেদের মধ্যে আলাপ সালাপ করে। আমি সারাদিন সেই নির্জন রুমেই কাটাই। শুধু দুপুরের খাবার সময় একবার হোস্টেলে আসি। রাত নটায় লাইব্রেরী বন্ধ হলে ঘরে এসে খেয়ে একেবারে সরাসরি বিছানায় গা এলিয়ে দিই। কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। শান্ত সরোবরে ফুটে থাকা নিটোল পদ্মের মতো কন্যা শামারোখের সুন্দর আনন আমার মানসদৃষ্টির সামনে ফুটে থাকে। ভাল ঘুম হয় না। আধো ঘুম, আধো জাগরণের মধ্যে সারারাত কাটাতে হয়। সকালবেলা অসম্ভব ক্লান্তি নিয়ে জেগে উঠি। কিছুই ভাল লাগে না। আকুল চোখে ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাই। এখনো দুদিন বাকি। আজ দুতারিখ। মাত্র দুদিন পর কন্যা শামারোখ এই ঘরে আসছে।
