নমস্কার মেজদা, কিছু মনে করবেন না, আমি একটু বেশি কথা বলি। এই যে এই বৌদিটি, আমার নামকরণ করেছেন বাক্যবাগীশ! ওঁকে রাতদিন গঞ্জনা দিই। আমি, ছেলেমেয়েগুলোর হাড়সার চেহারার জন্যে—
হঠাৎ আরো ভয়ানক আরো অসমসাহসিক এক কাণ্ড করে বসে সুবর্ণ।
শুধুই কি অসমসাহসিক?
কুশ্ৰীতা নয়? অসভ্যতা নয়? শাস্ত্রসমাজের বিরোধী নয়? কেন? কেন এই বদমাইশি?
ফট করে বলে বসলো। কিনা, আর আপনার নিজের কী?
আচ্ছা সুবালা তো গায়ের বৌ, সুবালাই বা ভাজকে এই নির্লজ্জতার জন্যে কিছু বলল না কেন? তার মানে বুদ্ধি-সুদ্ধির বালাই নেই। বালাই থাকলে কখনো এর পরও হাসে? হেসে উঠে বলে, ওর কথা বাদ দাও। ও যে দেশোদ্ধার করছে! ওর কি নাইবার-খাবার অবকাশ আছে? অযত্নে অযত্নে অমন পোড়াকাঠের মত দশা—
বৌদি, আমি আপত্তি করছি—, ইয়ারটা বলে ওঠে, একজন ভদ্রমহিলার সামনে কিনা পোড়াকাঁঠ বিশেষণ দেওয়া! মেজদা, দেখুন। আপনার বোনের কাণ্ড!
মেজদা তাঁর বোনের কোণ্ডর দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ চেঁচিয়ে ওঠেন, এই চন্নন, হচ্ছে কি? এত মুড়ি ছড়াচ্ছিস যে?
বাকি সবাই চমকে ওঠে, থমকে যায়।
তবু চলে যেতে হয়।
প্ৰাণপাখীকে পিঞ্জর ছাড়া করে বনে-জঙ্গলে উড়িয়ে দিয়ে।
উপায় কি?
সত্যি তো পাগল নয় যে বলবে, নিয়ে চলে যাই ওকে!
তবে একটা খবরে একটু ভরসা এসেছে, ছোঁড়া অমূল্যর নিজের ভাই নয়, জ্ঞাতিভাই। অন্য বাড়িতে থাকে। আবার বেশি ভরসাও নেই, —শূন্য একটা বাড়িতে থাকে বলে এ বাড়িতে খায়। সুবালাই ধরে-করে এই ব্যবস্থা করেছে, ওর একমাত্র দেখবার লোক পিসি মরে পর্যন্ত।
বাউণ্ডলে যাকে বলে!
কেউ কোথাও নেই, শূন্য একখানা বাড়িতে একা থাকা!
প্ৰবোধ বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করেছিল, তা বিয়ে করেন নি কেন দয়াময়?
সুবালা দাদার রাগে হেসেই খুন।
হিরোকেষ্ট। ও বিয়ে করবে তো দেশ স্বাধীন করবে। কে?
ফাজলামি। বলি আজ না হয় তুই ওর ভাত রাধছিস। চিরকাল পরের ঘাড় দিয়ে চলবে?
সুবালা আহত হয়।
সুবালা গম্ভীর হয়।
বলে, পর বললে পর, আপনি বললে আপনি, তবে কদিন ভাত রাঁধতে পাবো। ওর, তাই বা কে জানে! কোন দিন যে জেলের ভাত খেতে হয়, এই ভয়ে কাটা হয়ে আছি।
প্ৰবোধের নিজের বোনকেও আদিখ্যেতার জাহাজ মনে হয়। জ্ঞাতি দ্যাওরকে নিয়ে এত আদিখ্যেতা! আরও বিরক্তস্বরে বলে, আর সেই লোককে বাড়িতে আসতে দিচ্ছিস?
সুবালা অবাক হয়।
আসতে দেব না? কাকে? অম্বিকা ঠাকুরপোকে; কী যে বল মেজদা!
তা তোর না হয় আদর কর্তব্য উথলে উঠল, বলি অমূল্যর হাতে দড়ি পড়লে?
সুবালা বিচলিত হয় না।
সুবালা বলে, নিয়তি ছাড়া পথ নেই মেজদা, সে নিয়তি থাকলে–
আগুনে হাত ড়ুবিয়ে যদি বলি, নিয়তি থাকলে পুড়বে, তবে আর বলবার কিছু নেই— প্ৰবোধ প্ৰায় খিঁচিয়ে ওঠে, তবে কাজটা ভাল হচ্ছে না। এ বাড়িতে ওর যাতায়াত কমাও! খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা অন্যত্র করতে বলতে হবে—
সুবালা হেসে ওঠে।
সুবালা ওর পূজনীয় মেজদার কথা অমৃতং বালভাষিতং হিসেবে গণ্য করে। তাই সুবালা আর তর্ক না করে বলে, পাগল হয়েছ? ওকে খাওয়াতে হয় ধরেবেধে, তিনবেলা না খেলেও ওর খেয়াল থাকে না।
তবে আর কি? কৃতাৰ্থ—, প্ৰবোধ বলে, তোমরা নিজের কপালেও তেঁতুল গুলিছো, ছেলেপুলেদেরও ক্ষতি করছে।… ওইরকম একটা ব্যাড় এগজাম্পল চোখের সামনে—
সুবৰ্ণ এতক্ষণ ভাইবোনের ওই তর্ক-বিতর্ক, স্নেহ-আলাপের মাঝখানে কথা বলে নি। এইবার বলে উঠল, বলল, চোখের সামনে এটা কুদৃষ্টান্ত নয়, বরং মহৎ আদর্শ! মেজঠাকুরঝির ছেলেদের ভাগ্য ভাল যে এমন একটা আদর্শ চোখের সামনে পাচ্ছে।
চমৎকার! যখন পুলিস এসে ঠেঙাতে ঠেঙাতে ধরে নিয়ে যাবে, তখন মহৎ আদৰ্শর লীলা বুঝবে। এমন জানলে আনতাম না তোমাদের!
সুবৰ্ণ তীব্ৰকণ্ঠে বলে, তোমাদের সহোদর বোন যেখানে রয়েছে, সেখানে তোমার বৌ-ছেলে থাকতে পারবে না?
থাকতে পারবে না কেন? বিপদের আশঙ্কা, সেই কথাই হচ্ছে।
সে আশঙ্কা তোমার বোন-ভগ্নীপতিরও আছে–
চুলোয় যাক ওরা—, প্ৰবোধ বলে ওঠে, মাথার মধ্যে আগুন জ্বলছে আমার!
তা সেই মাথার মধ্যে জ্বলন্ত আগুন নিয়েই বিদায় নিতে হলো প্ৰবোধকে। উপায় কি? আর সমস্ত রাগটাই শেষ পর্যন্ত সুবর্ণর ওপর পড়ল। সুবৰ্ণই বা আসতে রাজী হল কেন?
এদিকে তো এত জেদ, পাহাড় নড়ে তো জেদ নড়ে না, অথচ ভাসুর একবার অনুরোধ করলেন তো গলে গেলেন! চিরকাল দেখছি, এই আমি হতভাগ্য কেউ নয়, ভাসুরের কথা শিরোধার্য! বদ মেয়েমানুষদের স্বধৰ্মই এই। কেদারবাবুকে নিয়ে কত আদিখ্যেতা। সে বুড়ো আর আসে না। তাই বাঁচা গেছে।
গুরুজন বলে যদি ছেদ্দা করতো তো মাকে আগে করতো। তার বেলায় নয়। তার বেলায় রাতদিন শাশুড়ীর মুখে মুখে চোপা! আসল কথা বেটা ছেলে! সেটা হলেই হলো! যা বুঝছি, সুবালাটা মুখ্যুর ধাড়ি, ওই ঘোড়েল অম্বিকাটা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে খাচ্ছে—দাচ্ছে। অতএব সুবালার ওপর ভরসা নেই। ওর চোখের সামনেই অনেক কিছু ঘটে যাবে, টেরও পাবে না।
সুবালার শাশুড়ীটি যে কোথায় থাকেন দেখতেও পাওয়া গেল না। তবু একটা বুড়ো মানুষ ছিল
নাঃ, ওসব বুড়ো-ফুড়োর কর্ম নয়, অমূল্যকেই বলে এলে হতো, তোমার শালাজের বাপু একটু পুরুষ-ঘেষা স্বভাব আছে, চোখে চোখে রেখো।
বলে এলে হতো।
বলা হয় নি।
এ কথা যত ভাবতে থাকে প্ৰবোধ, ততই তার মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে থাকে।
কী উপায়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসা যায় সুবৰ্ণকে?
