মুক্তকেশী। তাই রাতদিন সেজবৌ গিরিবালার শরীর কাহিল দেখেন, আর খেটে খেটে আধমরা হতে দেখেন তাকে। আর তার গুণের তুলনা দেখতে পান না। সে যে বড়মানুষের মেয়ে হয়েও দেমাকী নয়, এটাই কি সোজা পাওয়া নাকি?
প্রকাশের বৌ বিন্দু বড়মানুযের মেয়ে নয়, নিতান্তই নিরুপায়ের ঘরের মেয়ে। মুক্তকেশী রাতদিন তাকে তার সেজ জার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে বলেন।
মুক্তকেশীর এই রাজনীতির লীলার উপর দিয়ে বয়ে চলেছে দিন, বিয়ে চলেছে প্রকৃতির লীলা। মেয়েতে বৌতে মিলে কোন না বছরের বারতিনেক আঁতুড়ের ঘটনা ঘটাচ্ছে!
সুবৰ্ণলতা?
তা সুবৰ্ণলতাও সে দলে আছে বৈকি। প্রকৃতি তো ছেড়ে কথা কইবার মেয়ে নয়। আর প্ৰবোধচন্দ্রও কিছু আর ছেড়ে কথা কইবার ছেলে নয়।
যে স্ত্রীলোক অতুিড়ে যেতে ভয় পায়, সে স্ত্রীলোককে অসতী ছাড়া আর কিছু বলতে রাজী নয় প্ৰবোধ। মা হতে অরাজী? তার মানে রূপ-যৌবন ঝরে যাবার ভয়? তার মানে পরপুরুষ আর ফিরে চাইবে না। এই আশঙ্কা, এই তো? বুঝি সব। ওসব বিবিয়ানা রাখা!
বিবিয়ানা রাখতে হয়। অতএব।
কত আর বুঝবে সুবৰ্ণলতা?
কত খণ্ড প্ৰলয় ঘটবে?
কত কেলেঙ্কারী করবে?
বাড়িতে তো আর এখন শুধু গুরুজনই নেই, লঘুজনও রয়েছে যে। লজ্জা তো তাদের সামনেই। তা ছাড়া সমপৰ্যায়রা?
তারা যদি টের পায় সম্পূর্ণ ইচ্ছার বিরুদ্ধে আতুড়ে ঢুকতে হচ্ছে সুবৰ্ণলতাকে, আর কি মানবে তাকে? হয়তো আহা! ই করে বসবে।
ওই আহার চাইতে অনেক ভাল ঈর্ষা।
তা ঈর্ষা তারা করে বৈকি।
এতকাল বিয়ে হয়েছে সুবৰ্ণলতার, তবু তার বর তাকে চক্ষে হারা হয়, তবু একদণ্ড ঘরে না দেখলেই রসাতল করে, রান্নাঘরে গেলেই বার বার ছেলেপুলেকে জিজ্ঞেস করে, এই, তোদের মা কই?
এর চাইতে ঈর্ষার বস্তু আর কি আছে?
আজীবন সবাই সুবৰ্ণকে ঈর্ষাই করেছে।
আর বাইরের লোক বলেছে, এমন মানুষ হয় না।
এ কথা মুক্তকেশীর সংসারের বাইরের সবাই চিরকাল বলেছে।
আর র সংসার বলেছে, এমনটি আর দেখলাম না! কোটি কোটি নমস্কার!
সেই দূর অতীতে সুবর্ণলতার যেদিন গলায় আঁচল পাকিয়ে মরতে বসে হারানো গহনার হদিস করে দিয়েছিল, সেইদিনই বোধ করি গলা খুলে বলার শুরু।
মুক্তকেশী মেয়ের গায়ে গহনা পরিয়ে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে পেরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন বৈকি? তবু বলেছিলেন, কোটি কোটি নমস্কার মা, কোটি কোটি নমস্কার!
উমাশশীও বলেছিল, নমস্কার করছি বাবা!
সুবৰ্ণলতার দেওররা বলেছিল, নমস্কার! কোটি কোটি নমস্কার!
শুধু সুশীলা বলেছিল, কেলেঙ্কারিটা তোরাই করলি! যতদূর নয় ততদূর লোক হাসালো তো পেবোটা, অথচ কেলেঙ্কারী ছড়ালো বৌয়ের!
আর সুশীলার বর কেদারনাথ বলেছিলেন–। তা তাদের কথার মূল্য কি? তারা তো মুক্তকেশীর সংসারের বাইরের লোকই। যাদের শুনিয়ে শুনিয়ে মুক্তকেশী বলতেন।–
যার সঙ্গে ঘর করি নি,
সে-ই বড় ঘরাণী,
যার হাতে খাইনি,
সে-ই বড় রাধুনী।
তা সেই কেদারনাথ শুধু সেদিনই নয়, অনেক সময় অনেক দিনই বলতেন, মানুষটাকে তোমরা চিনলে না! বলতেন, এমন মেয়ে সচরাচর হয় না গো! তবে আমার শাশুড়ী ঠাকরুণ আর তাঁর সুযোগ্য পুত্র শিব গড়ার মাটিতে বাঁেদর গড়বার পণ করে বসেছেন এই দুঃখ!
কেদারনাথের সঙ্গে কথা কইবার অনুমতি ছিল সুবৰ্ণলতার। অর্থাৎ সুবৰ্ণলতাই ওটা চালু করে নিয়েছিল। উমাশশী কখনো ননদাইয়ের সঙ্গে কথা বলবার প্রয়োজন অনুভব করে নি। ঘোমটা দিয়ে ভাত জল এগিয়ে দিয়েছে এই পর্যন্ত।
সুবৰ্ণলতাই প্রথম বলেছিল, বড় ঠাকুরজামাইয়ের সঙ্গে কথা কইলে দোষ কি মা? আমি তো ওঁর মেয়ের বয়েসী!
কথাটা মিথ্যা নয়।
কেদারনাথের বয়েস হয়েছে।
সুশীলা তার দ্বিতীয় পক্ষ।
আগের পক্ষের যে মেয়েটি আছে, বয়সে সে সুবৰ্ণলতার চাইতে বড় বৈ ছোট হবে না। সুশীলা যখন বেশি দিনের জন্যে বাপের বাড়ি আসতো, সতীনঝিকে নিয়ে আসতো।
এখন আর আসে না। শ্বশুরবাড়ি চলে গেছে মেয়ে।
সে যাক, সুবৰ্ণলতা যে কেদারনাথের মেয়ের বয়সী তাতে ভুল নেই।
তাই এত সাহস সুবৰ্ণলতার।
তবু মুক্তকেশী প্ৰস্তাবটা প্ৰসন্ন-চিত্তে গ্ৰহণ করবেন। এমন আশা করা যায় না। বললেন। হঠাৎ কথা কইবার দরকারই বা কি এত পড়লো?
উনি সর্বদা ডাক দেন, কই গো বড় গিনি, কই গো মেজ গিন্নী বলে, পান-তামাক চান, বোবার মত শুধু এগিয়ে দিই, লজ্জা করে!
মুক্তকেশী বোজার মুখে বলেন, কি জানি মা, তোমাদের যুগের লজ্জার রীতি-নীতি কি! যাতে লজ্জা, তাতে তোমাদের লজ্জা নেই, যেটা সভ্যতা-ভাব্যতা তাতেই হল লজ্জা! গুরুজনের সঙ্গে কথা কি কইলেই হয়? মান রাখতে না পারলে?
সুবৰ্ণ হেসে ফেলে বলে, মানই বা রাখতে না পারবো কেন মা? মান্যের মানুষ—
মুক্তকেশী একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলেন, সে শাস্তর যে তোমার পাঠশালায় আছে, তা তো জানি না মা! গুরুজনকে হেঁট করাই তো তোমার প্রিকিতি!
সুবৰ্ণলতা বলেছিল, বড় ঠাকুরজামাইকে হেঁট করতে চাইবে, এমন খারাপ কেউ আছে নাকি জগতে?
সেই বড় ঠাকুরজামাইটি মুক্তকেশীর নিজের জামাই, তাকে প্রাধান্য না দিলে চলে না। তাই অনেক তর্কাতর্কির পর নিমরাজী হয়েছিলেন মুক্তকেশী।
নিজেও তো তিনি কতকাল জামাইয়ের সঙ্গে কথা কইতেন না, ঘোমটা দিতেন। কিন্তু জামাইয়ের প্রাণ-জুড়ানো ব্যবহারে ধীরে ধীরে সেটা ত্যাগ করেছেন।
তাই বলে বৌ?
আর ওই দজাল বৌ?
এমনিতেই যে স্বামীর মাথায় পা দিয়ে হাঁটে! এর ওপর আবার পরপুরুষের সঙ্গে মুখ তুলে কথা
