তা হয় না— সুবর্ণ বলে, কথা দিয়েছি। শরীর বরং পাহাড়ে-হাওয়ায় ভালই হবে।
ভাল হবে? বললেই হলো? প্ৰবোধ দুপাক ঘুরে হঠাৎ বলে ওঠে, যাব বলছো মানে? বড়বৌমার ছেলে।পুলে হবে না?
সুবৰ্ণ শ্রান্ত গলায় বলে, সে হবে, ওর মার কাছে হবে। ও নিয়ে তুমি পুরুষ মানুষ মাথা ঘামাচ্ছো কেন?
আমি মাথা ঘামাব না? আমি বাড়ির কেউ নাই? হঠাৎ জামার হাতটা একবার চোখে ঘষে প্ৰবোধ, তারপর ভাঙা গলায় বলে, বৌমা বাপের বাড়ি চলে যাবে, আর আমি আমার কাজকর্ম ফেলে তোমার ওই ধাড়ি আইবুড়ো মেয়েকে আগলাবো?
সুবৰ্ণর ইচ্ছে হয়। চাদরটা মুখ অবধি টেনে পাশ ফিরে শোয়, তবু সে ইচ্ছে দমন করে আস্তে বলে, আগালাবার কথা উঠছে কেন? ছোট বৌমা তো কোথাও যাচ্ছে না? দুজনে থাকবে—
থাকবে! হঠাৎ যেন গর্জন করে ওঠে প্ৰবোধ, থাকবে কি উড়বে তা ভগবানই জানে! তোমার রাগের ভয়ে বলি না কিছু, বোবোকালা সেজে বসে থাকি। কিন্তু এই বলে দিচ্ছি, তোমার এই ছোট মেয়েটির ভাবভঙ্গী ভাল নয়। পরিমলবাবুর ছেলেটার সঙ্গে তো যখন-তখন গুজগুজ! কেন? ওর সঙ্গে এত কিসের কথা? আমি বলে দিচ্ছি। মেজবৌ, তুমি যদি তীৰ্থ করতে উধাও হও, এসে মেয়েকে ঘরে দেখতে পাবে কিনা সন্দেহ! হয়তো—
সুবৰ্ণ উঠে বসে, সুবৰ্ণ প্ৰবোধের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকায় একটু, তারপর তেমনি স্থির গলায় বুলে, তা যদি দেখি, সে সাহস যদি দেখাতে পারে ও, বুঝবো আমার রক্তমাংস একেবারে বৃথা হয় নি। একটা সন্তানও মাতৃঋণ শোধ করেছে।
শুয়ে পড়ে আবার।
প্ৰবোধ সহসা একটা যেন চড় খেয়ে স্তব্ধ হয়ে যায়। তারপর ভাবে, বৃথা দোষ দিচ্ছি, মাথাটা খারাপই! ছটফটিয়ে বেড়ায় খানিক, তারপর আবার ঘুরে আসে। আর আবারও নির্লজের মত বলে ওঠে, রাগের মাথায় বলে তো দিলে একটা কথা, কিন্তু সব দিক বিবেচনা করে তবে তো পরের কথায় নাচা-
হয়তো ঠিক এমনভাবে কথা বলার ইচ্ছে তার ছিল না, তবু অভ্যাসের বশে এ ছাড়া আর কিছু আসে না মুখে।
সুবৰ্ণ এবার সত্যিই পাশ ফিরে শোয়।
শুধু তার আগে আরো একবার উঠে বসে। রুদ্ধ কণ্ঠে বলে, তোমার কাছে হাতজোড় করে কটা দিন ছুটি চাইছি, সেটুকু দাও তুমি আমাকে। সব চাকরিরই তো কিছু না কিছু ছুটি পাওনা হয়, তোমার সংসারে এই ছত্রিশ বছর দাসত্ব করছি আমি, দুটো মাসও কি ছুটি পাওনা হয় নি আমার!
২.২২ অভিমানী পারুল
অভিমানী পারুল স্বেচ্ছায় স্বর্গের টিকিট ত্যাগ করেছিল। একদা তার আর বকুলের স্কুলে ভর্তি হওয়া নিয়ে যখন সংসারে ঝড় উঠেছিল, তখন পারুল বেঁকে বসেছিল, বলেছিল, এত অপমানের দানে রুচি নেই আমার।
অথচ ওই স্কুল নামক জায়গাটা সত্যিই তার আজনের স্বপ্ন-স্বৰ্গ ছিল। সামনে-পিছনে আশেপাশে যে বাড়িগুলো দৃষ্টিগোচর হতো, সকালের দিকে সেই বাড়িগুলোর দিকে লক্ষ্য রাখা একটা কাজই ছিল পারুলের।
সেই সব বাড়ির যে সব মেয়েরা স্বৰ্গরাজ্যের প্রবেশপত্ৰ পেয়েছে তারা কেমন করে বেণী ঝুলিয়ে বইখানা বুকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ে, তাদের দেখবার জন্যে চেষ্টার আর অন্ত ছিল না। তার।
আর যাদের যাদের বাড়ির দরজায় সেই একটি খড়খড়ি আটা টানা লম্বা গাড়ি এসে দাঁড়াতো, পোশাকপরা চালক বিশেষ একটি সুরে হাঁক দিত, এবং একটু বড় বয়সের মেয়েরা খোঁপাবাঁধা ঘাড়টা একটু হেট করে তাড়াতাড়ি বেরিয়েই গাড়িতে গিয়ে উঠতো!
তাদের দিকে ছিল বুঝি বুভুক্ষার দৃষ্টি, ঈর্ষার দৃষ্টি!
জগতের আনন্দ যজ্ঞে সবার নিমন্ত্রণ।
নিমন্ত্রণ নেই শুধু পারুলদের!
যেহেতু তারা ভারি একটা পুণ্যময় সনাতন বাড়ির মেয়ে। তাই পারুল শুধু তাদের জানলার খড়খড়ি তুলে সেই নিমন্ত্ৰণ-যাত্রার দৃশ্য দেখবে।
বড় হওয়া অবধি বারান্দায় দাঁড়ানোয় শাসনদৃষ্টি পড়েছিল, তাই ভরসা ওই পাখী দেওয়া জানলা! পারুল বকুলের মা চেয়েছিল ওই টিকিট তাদের জন্যে যোগাড় করে দিতে। সম্পূর্ণ কৃতকার্য হয় নি।
ঝড় উঠেছিল, সেই ঝড়ের ধুলোয় অন্ধ হয়ে গিয়েছিল অভিমানিনী পারুল। পারুল বলেছিল, আমার দরকার নেই।
বকুলের অভিমান অত দুৰ্জয় নয়।
বকুল অবজ্ঞা আর অবহেলায় ছুঁড়ে দেওয়া টিকিটখানা পেয়েই ধন্যবোধ করেছিল।
তা হয়তো ওইটুকুও জুটতো না, যদি বকুলের সামনের লাইনে তার দিদি না থাকতো।
সেজদি!
দুজনের দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সুবর্ণ, সুবর্ণর যুদ্ধ-ভীত স্বামী মাঝামাঝি রফা করতে চেয়েছিল, বলেছিল, বকুল যায় যাক, পারুল আবার যাবে কি?
আর তার বিদ্বান বিজ্ঞ ছেলেরা বলেছিল, বিদুষী হয়ে হবেটা কি? কলাপাতে না এগোতেই তো লিখছে!
গ্ৰন্থ অতএব পারুল সেই রণক্ষেত্র থেকে বিদায় নিয়েছিল। আর এক কড়া স্কুলে ভর্তি হয়ে চলে গিয়েছিল। সেখানের বোর্ডিঙে!
নিঃশব্দচারিণী নিঃসঙ্গ বকুল তার স্বর্গে যাওয়া-আসা করছিল।
কিন্তু সেই আসা-যাওয়ার পথের দিকে যদি কেউ চোখ ফেলে দাঁড়িয়ে থাকে, যদি চোখোচোখি হওয়া মাত্র আনন্দে ভাস্বর হয়ে ওঠে সেই চোখ, বকুল কি করবে?
বকুল বড় জোর বলতে পারে, রোজ রোজ এখানে দাঁড়িয়ে থাক যে? কলেজ নেই তোমার?
সে তো সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবে, স্কুল বসবার পরে কলেজের টাইম, এই একটা মস্ত সুবিধে!
বকুল যদি লাল-লাল মুখে বলে, বাঃ, তাই বলে তুমি রোজ রোজ—
সে সপ্রতিভ গলায় বলে ওঠে, থাকি তা কি? তোর কি ধারণা তোকে দেখবার জন্যে দাঁড়িয়ে থাকি?
আর কি বলতে পাবে বকুল?
আর কিভাবে প্ৰতিকার করতে চেষ্টা করবে?
ওর সঙ্গে কথা কইতে যাওয়াতেও যে ভয়! ওর চোখের তারায় যেন অজস্র কথার জোনাকি, ওর কথার ভঙ্গীতে যেন অসীম রহস্যলোকের ইশারা!
