দোতলায় উঠে এসে ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে গলা তুলে বলতে থাকে, বুঝলাম মন খারাপ, তবু সবেরই একটা সামঞ্জস্য থাকা দরকার। মা-বাপ তো তোমার জ্যান্তে মরা, এখন যে অসুখ বলে খবর পাঠিয়েছে সেটাই আশ্চর্য!
ঘরের মধ্যে থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায় না, দেখাও যায় না কোণের দিকে কোথায় বসে আছে।
নিজেরই তো ঘর, তবু কেন কে জানে। হঠাৎ ঢুকে পড়বারও সাহস হয় না। বাইরে থেকেই আরো কিছুক্ষণ স্বগতোক্তি করে আস্তে আস্তে নীচের তলায় নেমে গিয়ে বৈঠকখানা ঘরে বসে থাকে।
বাবা-
অনেকক্ষণ পরে বকুল এসে ঘরে ঢোকে।
যেন খুব একটা বিচলিত দেখায় তাকে।
বলে ওঠে, বাবা, মা কোথায়?
মা কোথায়!
এ আবার কেমন ভাষা!
প্ৰবোধ কাছা সামলাতে সামলাতে উঠে পড়ে, তার মানে?
বকুল শুকনো গলায় বলে, কোথাও দেখতে পাচ্ছি না।
পা থেকে মাথা পর্যন্ত হিমপ্রবাহ বয়ে যায়, তবু মেয়ের সামনে অবিচলিত ভাব দেখাতে চেষ্টা করে প্রবোধ, ছাতে উঠে বসে আছে বোধ হয়।
না। ছাতে দেখে এসেছি।
হ্যাঁ, সর্বত্রই দেখেছে ওরা।
ছাতে, স্নানের ঘরে, ঘুঁটে-কয়লার ঘরে, এমন কি ঝিয়ের বাসনামাজার গলিতে পর্যন্ত।
কোথাও নেই সুবৰ্ণলতা।
২.০৬ নবকুমার বিছানার সঙ্গে মিশিয়ে আছেন
নবকুমার বিছানার সঙ্গে মিশিয়ে আছেন।
নবকুমার হয়তো আশা ছেড়েই পড়ে আছেন।
ওদের বাড়িতে খবর দেবার পর থেকেই প্রতি মুহূর্তে অপেক্ষা করছেন, আশা করছেন, দরজাটা বাতাসে নড়লেও চমকাচ্ছেন, আবার বারেবারেই হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলছেন, সে আর এসেছে!… আসবে না। কক্ষনো। আসবে না।
এমনি অনেক যন্ত্রণাময় মুহূর্ত পার করে, অনেক হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে যখন নবকুমার প্রায় শেষ নিঃশ্বাসের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন, তখন সহসা শুনতে পেলেন, এসেছে!
এসেছে সুবর্ণ!
নবকুমারের মেয়ে!
নবকুমারের জীবন থাকতে সে কোনোদিন এল না।
নবকুমারের চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো, নবকুমার ক্ষীণকণ্ঠে কি যে বললেন, বোঝা গেল না।
তারপর নবকুমার আর একটু সচেষ্ট হলেন, আস্তে আস্তে ভেঙে ভেঙে কথা বললেন, বোঝা গেল না।
নবকুমার বললেন, সেই এলে শুধু সব যখন শেষ হয়ে গেল!
সুবৰ্ণ ড়ুকরে কেন্দে উঠতে পারতো, কিন্তু সুবৰ্ণ তা করল না।
সুবৰ্ণ শুধু মাথাটা নিচু করলো।
সুবৰ্ণ কাঁপা কাঁপা ঠোঁটটাকে কামড়ে ধরলো।
নবকুমার বললেন, আমি আর বেশিদিন নেই সুবর্ণ, বুঝতে পারছি ডাক এসেছে।
সুবৰ্ণ মাথা তুলে একবার তাকালো, আবার মাথাটা নিচু করলো।
নবকুমার আস্তে থেমে থেমে বললেন, জানি ক্ষমা চাওয়ার কথা আমার মুখে আনা উচিত নয়, তবু এই শেষকালে তোর কাছে একবার ক্ষমা না চেয়ে মরতেও তো পারছি না!
বাবা! সুবর্ণ রুদ্ধকণ্ঠে বলে, ও কথা বলে আমায় শাস্তি দেবেন না বাবা!
শাস্তি নয় রে সুবৰ্ণ, এ একেবারে সত্যিকার অপরাধীর কথা! যে অপরাধ আমি তোর কাছে করেছি—
সুবৰ্ণ আরো কাছে সরে আসে, আরো রুদ্ধকণ্ঠে বলে, তাই যদি হয়, তার শাস্তিও কম পান নি বাবা!
তা বটে! নবকুমারের নিষ্প্রভ দুটি চোখ দিয়ে আর এক ঝলক জল গড়িয়ে পড়ে, সে কথা। মিথ্যে নয়! এক-এক সময় মনে হতো, বুঝি বা লঘু পাপে গুরু দণ্ডই হয়েছে আমার! আবার যখন তোর জীবনটা দেখেছি, তখন মনে হয়েছে, নাঃ, এ দণ্ড আমার ন্যায্য পাওনা! তবে একটা কথা বলে যাই রে, যা করেছি, না বুঝে করেছি। বুঝে জেনে অত্যাচার করতে করি নি! কিন্তু সেই একজন তা বুঝল না কোনোদিন-
নবকুমার থামলেন, জলের গ্রাসের দিকে তাকালেন।
সুবৰ্ণ জল দিতে গেল, দিতে পেল না, সাধনের বৌ এগিয়ে এসে তাড়াতাড়ি মুখের কাছে গেলাসটা ধরে বলে উঠলো, এই যে বাবা, জল খান।
নবকুমার মুখটা কোঁচকালেন।
নবকুমার আধ ঢোক জল খেয়ে সরিয়ে দিলেন, তারপর বললেন, ক্ষমা করতে যদি পারিস তো—
বাবা, আপনি চুপ করুন। আমি সব বুঝতে পারছি। আপনার কষ্ট, আপনার দুঃখ, সব বুঝেছি।
নবকুমার একটা নিঃশ্বাস ফেললেন, তারপর বললেন, ক্ষমা চাইলাম, সারা জীবনে তো পারি নি, এখন এই মরণকালে—তবু আমার নিজের জন্যে তোকে ডাকি নি সুবৰ্ণ, ডেকেছিলাম। এইটা দিতে! হাতটা তোশকের তলায় ঢুকিয়ে একটু বুলিয়ে নিয়ে টেনে বার করলেন একটা ভারী খাম। বললেন, এইটা আগলে নিয়ে বসে আছি, তোকে দেব বলে!
সুবৰ্ণ হাত বাড়ায় না।
সুবৰ্ণ কি এক সন্দেহে আরক্ত হয়ে ওঠে।
সুবৰ্ণ অস্ফুটে বলে, কী এ?
নবকুমার বোধ করি বুঝতে পারেন। তাই তার সন্দেহভাজন করেন। সামান্য একটু হাসির গলায় রূঢ় ভয় নেই, দলিল নয়, দানপত্র নয়। শুধু চিঠি।
চিঠি।
হ্যাঁ– নবকুমার কাঁপা গলায় বলেন, তোর মার চিঠি!
মার চিঠি!
সুবৰ্ণর মার চিঠি!
কাকে লেখা?
সুবৰ্ণকে নয় তো!
হুঁ, তাই আবার হয়? হতে পার? সুবর্ণর এত ভাগ্য?
কি জানি কি!
সুবৰ্ণ তাই নিষ্পলকে তাকিয়ে থাকে। নবকুমার হাতের উল্টোপিঠে চোখটা মুছে নিয়ে বলেন, চিরদিনের একবৰ্গগা মানুষ, কি ভেবে কি করে কেউ বোঝে না। কখনো কোনো বার্তা করে না। তোর ছোড়দা যাই। ওদিকে কাজ নিয়েছে, তাই জানতে পারি বেঁচে আছে। হঠাৎ একবার তার হাত দিয়েই দুটো চিঠি পাঠালো, একটা আমাকে লেখা, একটা তোকে লেখা—
বাবা, আপনার কষ্ট হচ্ছে, একসঙ্গে বেশি কথা বলবেন না।
না রে সুবর্ণ, আর আমার কোনো কষ্ট নেই, তুই ক্ষমা করিস আর নাই করিস, আমি যে তোর কাছে ক্ষমা চাইতে পারলাম, এতেই মনটা বড় হালকা লাগছে। এবার শান্তিতে মরতে পারবো।… হ্যাঁ সেই চিঠি-
