ওর মা মারা যাবার পরে কদিন গুম হয়ে থেকেছিল, তারপর হঠাৎ একদিন কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, সারাদিন কী এত কাজ করো? একটা কথা বলবার সুবিধে হয় না।
হেসে বললাম, হুকুম করলেই বাঁদি হাজির হতে পারে।
ও অসন্তুষ্ট স্বরে বলে, সব সময় ওভাবে কথা বলো কেন? আমি কি তোমার সঙ্গে দাসী বাঁদির মতো ব্যবহার করি?
আরও হাসলাম।
বললাম, তুমি করবে কেন? আমি তো জানি আমার পোজিশান।
পজিশানতুমি ইচ্ছে করে নাও না।
এবার হাসি থামিয়ে বলি, এই কথাটা বলার জন্যেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলে?
ও বসে পড়ল বিছানায়।
বলল, কথার গোড়াতেই কোপ মেরো না। বলছি–এবার খোকার বিয়ের কথা ভাবলে কী হয়?
খোকার বিয়ের কথা আমিও ইদানীং ভাবছিলাম বইকী! লেখাপড়া শেষ করেছে, ভাল একটা ব্যাঙ্কে কাজ পেয়েছে, বয়েসও হল, তবু নিজে থেকে পাড়িনি কথাটা। কেন পাড়ব? আমি তো ওর সত্যি মা নয়। যার ছেলে সে বুঝুক। যদি মনে পড়ে।
দেখলাম ওর মনও নিষ্ক্রিয় নয়।
তাই হেসে বললাম, শুধু ভাবলেই হবে?
আহা প্রথম সোপান তো ভাবা।
সেটা তো হয়েই গেছে। এবার দ্বিতীয় সোপানে ওঠো।
কিনে খুঁজব তা হলে বলছ?
জোরে হেসে উঠে বললাম, বলছি! কিন্তু কেউ শুনলে ভাববে লোকটা কী বাধ্য!
ও মুচকি একটু হেসে আমার একটা হাত চেপে ধরে ঈষৎ কাছে টেনে নিয়ে বলে উঠল, স্ত্রৈণ ভাববে, এই আর কী!
আমি আস্তে আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, তাও ভাবতে পারে।
যাক ভাবুক। এখন বলল, কেমন বউ চাই তোমার?
বললাম, ওটা খোকাকে জিজ্ঞেস করবার কথা।
সে জিজ্ঞেসটা তুমি করবে। তোমাকে জিজ্ঞেস করছি আমি।
বললাম, সুন্দরী বউ চাই।
কেন? খুব একটা সুন্দরীতে কী দরকার?
তা একটা মাত্তর ছেলের বউ, সুন্দরী করবে না?
লাভ কী? ছেলেটা তা হলে বউয়ের কেনা গোলাম হয়ে যাবে!
সুন্দরী না হলেও যাবে।
কে বললে?
কেউ বলেনি। ওর প্রকৃতিতে বশ্যতা। দেখোনা একদিনের জন্যে তোমার কোনও কথার প্রতিবাদ করে না।
আমি ওকে অন্যায়ও কিছু বলি না।
হেসে বললাম, সে কথা কি জোর করে বলা যায়? মানুষ কি নিজে বুঝতে পারে অন্যায় করছে কি ন্যায় করছে?
তা বটে! প্রিয়মাধব ম্লানভাবে বলল, অন্তত আমার মতো পশু তো বলতে পারেই না। ঠিক আছে, সুন্দরী মেয়েই দেখি।
আমি হাওয়া হালকা করতে হেসে উঠলাম, বললাম, আহা দেখলেই যেন ডানাকাটা পরী খুঁজে পাচ্ছ। ওর কপালে যেমন বউ লেখা আছে তাই হবে। তবে খোঁজাটা দরকার।
চলল খোঁজ।
মেয়ে জোগাড় হল।
নাম উত্তরা!
মাঝারি সুন্দরী।
প্রিয়মাধব বলল, এই বেশ, এই ভাল।
চলল সমারোহের তোড়জোড়।
বাজার চষে ফেলা হচ্ছে তত্ত্বের জিনিস কিনতে। কলকাতার বাজার।
হ্যাঁ, তখন তো কলকাতায় চলে এসেছি আমরা।
কাজে অবসর নিয়েছে প্রিয়মাধব। একটা বাগানের কিছু শেয়ার কিনেছিল, তার উপস্বত্ব আসে বছরে দুবার করে। অরুণও রোজগার করছে। মোটামুটি সচ্ছলতায় চলছে। বাড়ি করবে করবে করছে প্রিয়মাধব।
বলছে, যতই হোক, লোকে বলবে শ্বশুরের একখানা পচা বাড়ি পেয়েছিল তাই মাথা গুঁজে কাটাল!
শ্বশুরেরই বাড়ি।
কলকাতায় এসে আমাদের সেই সিকদার বাগানের পচা বাড়িটাতেই ওঠা হয়েছিল। আইনত যে বাড়ির মালিক এখন অরুণমাধব। মেয়েতে সম্পত্তি পাওয়ার আইন তো তৈরি হয়নি তখন, ছেলে না থাকলে দৌহিত্র সন্তানই উত্তরাধিকারী হত।
তা বিয়ে সেই পচা বাড়িতেই হল।
জিনিসপত্তরে বোঝাই হয়ে উঠল ছোট্ট বাড়ি। নীচের তলার ভাড়াটেদের উঠিয়ে দেওয়া হল। বাজার করতে একাই যেত প্রিয়মাধব। কোনওদিন বলত না, তুমিও চলো না।
যেত তো তখন গিন্নিরা, মেয়েরা।
ওর হয়তো তখনও ভয় ছিল কেউ বুঝে ফেলবে, চিনে ফেলবে। বলে উঠবে, আচ্ছা ইনি আপনার শালি না?
তা নয় তো, কেন ডাকত না?
একটা জিনিস নিয়ে বারবার ঘোরাফেরাও তো করত আমার পছন্দ হচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করে করে।
সেই বাজার করতে করতেই হঠাৎ আমার জন্যে একখানা জমকালো শাড়ি এনে হাজির করল। চওড়া লাল পাড়ের কড়িয়াল শাড়ি, আঁচলায় জরির ঝলক।
অবাক হয়ে বললাম, এই কাপড় পরব আমি?
ও বলল, কেন পরবে না? দোকানি বলল, বয়স্কা মহিলাদেরই কাপড় এটা! দেখে খুব পছন্দ হল। ওখানের বাজারে কখনও তো ভাল কিছু পাওয়া যেত না, যা কেনা হয়েছে সবই নেহাত লজ্জা নিবারণের মতো–
হেসে উঠে বললাম, তা সেটাই তো দরকার। লজ্জা বর্ধন তো কাম্য নয়।
এ শাড়িতে লজ্জা কী! ছেলের বিয়েতে ঘুরে বেড়াবে, এমন নইলে মানাবে কেন? বউ এসে মানবেই বা কেন!
এত মানামানির দরকার কী?
আশ্চর্য! দরকার নেই? নিশ্চয় আছে। এই শাড়ি পরে বউ বরণ না কি সেই বলে তাই করবে?
ওর এই আবেগের মাথায় হাতুড়ি বসালাম আমি।
তীক্ষ্ণ গলায় বললাম, বউ বরণ করব আমি?
প্রিয়মাধব থতমত খেল।
প্রিয়মাধব ঢিলে গলায় বলল, করবে না কেন? তুমিই তো ওর সত্যিকার মা!
আমি গম্ভীর ভাবে বললাম, মনেপ্রাণে তা যদি ভেবে থাকো তো করব বরণ!
ও কেমন শুকনো শুকনো মুখে চলে গেল।
.
তারপর এল সেই দিন।
বিয়ের সকালে নান্দীমুখে বসতে যাচ্ছে প্রিয়মাধব, হঠাৎ আমার কাছে এসে বোকাটে গলায় বলে উঠল, ভেবে দেখলাম তোমার কথাই ঠিক।
চমকে উঠলাম আমি।
ওর গলায় এ সুর নতুন।
ও তো হয় ব্যঙ্গে তীক্ষ্ণ, নয় ক্রোধে তীব্র, আর নয়তো কখনও কখনও অনুতাপে ম্লান। এমন আলগা গলা কেন? আর আমার কোন কথাটাই বা হঠাৎ ঠিক লাগল ওর?
