তারপর ঘুরঘুটে অন্ধকারে দীর্ঘ একটা ছায়া ফিরে এসেছিল, পাগলের মতো আছড়ে পড়ে বলেছিল, নিশ্চয় ও খাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছে নমিতা! আমি বুঝতে পেরেছিলাম, ওর মন ভেঙে গেছে।
.
সুমিতার মন ভেঙে গিয়েছে বুঝতে পেরেছিল প্রিয়মাধব, সুমিতার প্রাণের স্বামী, তবু সে সেই ভাঙা মনকে টেনে তুলে দাঁড় করাবার চেষ্টা করেনি। নমিতার তবে কীসের এত অপরাধবোধ?নমিতাও কেন তবে খাদের গভীরত্বর কথাই জপ করছে?
না, নমিতা দিশেহারা হবে না, নমিতা প্রিয়মাধবের মতো ছুটোছুটি করবে না, নমিতা শুধু দাঁতে দাঁত চেপে খোকাকে আগলে বসে থাকবে।
সন্ধের সময় আয়াকে যে ছুটি দিয়েছিল সুমিতা, সে কথা জানা গেল পরে। সুমিতা তাকে নাকি বলেছিল, কাল সকালবেলাই তো সাহেব বদলি হয়ে অন্য বাগানে চলে যাবেন, তুমি আর কী করবে? আজই তোমার বাসায় চলে যাও।বকশিশ দিয়েছিল অনেক।
আর সেইটাই তো সুমিতাকে খোঁজ পড়ার কারণ। বসবার ঘরে বসে অফিসের কাগজপত্র দেখছিল তখন প্রিয়মাধব, ওকে বলল, আচ্ছা। মেমসাহেব যখন ছুটি দিয়ে দিয়েছেন–
কিন্তু খানিক পরে কাগজপত্র তুলে রেখে ঘরের দরজায় এসে বলল, আজ থেকেই আয়াকে ছুটি দিলে কেন সুমিতা? আজ রাত কাল সকাল
ঘরে মশারি ফেলা ছিল, আর ঘরটা অন্ধকার ছিল, সাড়া না পেয়ে আলোটা জ্বালাল প্রিয়মাধব, দেখল শূন্য বিছানাটাকে ঘিরে মশারির ঝালরগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে।
নমিতার ঘরে?
না, নমিতার ঘরে নমিতার দিদির কোনও চিহ্ন নেই।
অথবা আছে।
সুমিতার জ্বলন্ত আর জীবন্ত চিহ্ন।
দোলা-খাটের বিছানায়, মশারির মধ্যে নিরুদ্বেগে ঘুমোচ্ছ।
প্রিয়মাধব উদ্বিগ্নচিত্তে এঘর ওঘর ভাঁড়ার ঘর রান্নাঘর সব দেখেছিল, দুই বোনের কাউকেই দেখতে পায়নি। ভেবেছিল, শেষলগ্নে দুই বোন তবে নির্ঘাত বাগানে বেড়াতে গেছে। রাগ হয়েছিল, ভেবেছিল এত কবিত্বর কোনও মানে হয় না। সাপখোপের দেশ–
তখন বাগানে এসেছিল।
হ্যাঁ, এসব পরে জেনেছিল নমিতা।
আরে, কী আশ্চর্য! নমিতা আবার কোথায় তখন? সুমিতা, সুমিতা। সুমিতা নামটাকে কর্পূরের মতো উবে যেতে দিলে চলবে কেন? সুমিতাই তো ম্যানেজার সাহেবের মেমসাহেব। মেমসাহেব হঠাৎ রাতারাতি উবে গেলে সাহেবের মান সম্ভ্রম থাকবে কোথায়?
অথচ নমিতা, যেনাকি শুধু মাসি মেমসাহেব, সে যদি সেই রাত্রেই তার শাশুড়ির জবর অসুখ শুনে উড়ে কলকাতায় চলে যায়, কোথাও কোনও লোকসান নেই।
আর যদি সেই উড়োজাহাজখানা হঠাৎ মাঝরাস্তায় হারিয়ে যায়, যদি কলকাতায় তার শ্বশুরবাড়িতে তাকে নামিয়ে না দেয়, কী উপায় আছে সেখানে টেলিগ্রাম করা ছাড়া?
বিষ পোকার কামড়ে মারা যাওয়া তো আসামের এই চা বাগানে অভূতপূর্ব ঘটনা নয়।
চট করে যে কোনও অবস্থাকে ম্যানেজ করে ফেলতে পারে বলেই তো এখানকার ম্যানেজার সাহেবকে বেকায়দায় জায়গায় চালান করা হচ্ছে চব্বিশ ঘণ্টার নোটিশে।
.
তবু প্রথমটায় ভয়ংকরভাবে এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল বইকী ম্যানেজার সাহেব। টর্চের ব্যাটারিটা জবাব না দেওয়া পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়ে আর আলো ফেলে ফেলে, শেষ অবধি অন্ধকারে ফিরে এসেছিল। আছড়ে পড়ে বলেছিল, নিশ্চয় ও খাদে ঝাঁপিয়ে পড়েছেনমিতা! দিনের আলো হলে দেখতে পেতাম।
নমিতা শুকনো গলায় বলেছিল, খাদে ঝাঁপিয়ে পড়েনি।
পড়েনি? তুমি জানো? তোমায় বলে গেছে?
নমিতার হাত জড়িয়ে ধরেছিল প্রিয়মাধব। আকুল আবেগে আত্মবিস্মৃতের মতো।
নমিতা হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল।
বলেছিল, বলে যায়নি, লিখে রেখে গেছে।
লিখে রেখে গেছে? লিখে রেখে গেছে? উদভ্রান্ত প্রিয়মাধব ছটফটিয়ে উঠেছিল, কই বলছ না এতক্ষণ?
দেখিনি। এতক্ষণ দেখিনি। এই মাত্র দেখলাম। আমার থান কাপড় আর সাদা ব্লাউজের ব্যাগটা খুলে চুরি করেছে একটা কাপড় আর ব্লাউজ, তার মধ্যে রেখে গেছে চিঠি আর তার শাড়ি গয়না।
নমিতার থান কাপড় পরে চলে গেছে সে! তার মানে হারিয়ে গেল নমিতা নামের পরিচয়টা!
তবে?
প্রিয়মাধব ছুটে গেল, দেখল সেই শাড়ি, গয়না, দেখল চিঠি, যাতে লেখা ছিল–আমায় খুঁজো না, আমি হারিয়ে গেলাম।
প্রিয়মাধব বলল, নমিতা, আমায় বাঁচাও! আমার মান-সম্ভ্রম, চাকরি, সন্তান, সব কিছু বাঁচাতে পারো একমাত্র তুমিই!
নমিতার অনেক বুদ্ধি, তবু নমিতা অবাক হয়ে বললে, তার মানে?
তার মানে তুমি ভুলে যাও তুমি নমিতা। তুমি সুমিতা হয়ে যাও। সুমিতা তোমার কাপড় চুরি করে পরে চলে গেছে। তুমিও তার শোধ নাও। তুমি তার নাম চুরি করো। নমিতা হারিয়ে যাক। নমিতা মুছে যাক।
আমি,
হ্যাঁ, তখনও আমি নমিতা ছিলাম।
আমি চমকে উঠলাম। আমি শিউরে উঠলাম। আমি ছিটকে উঠে বললাম, বলছেন কী আপনি?
প্রিয়মাধব আমায় জড়িয়ে ধরল। অভিনেতা প্রিয়মাধব হাহাকার করে বলল, এ ছাড়া আমার বাঁচবার কোনও উপায় নেই নমিতা! আজ সারাদিন পর্যন্ত এখানে আমার স্ত্রী ছিল, সন্তান ছিল, হঠাৎ কাল সকালে আমি একটা ছমাসের শিশু, আর বিধবা শালিকে নিয়ে নতুন একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াব কী করে?
দাঁড়াতে হবে। আমাকেও বিদায় দিন।
বললাম আমি, নিজেকে রূঢ়ভাবে ছাড়িয়ে নিয়ে।
প্রিয়মাধব আবার হাহাকার করে উঠল। তা হলে খোকা? খোকাকেও তো তা হলে বাঁচানো যাবে না নমিতা? কেউ বুঝতে পারবে না নমিতা। অবিকল একরকম দেখতে তোমরা, শুধু সাজে তফাত দেখাত। সুমিতার সাজের খোলসে ঢুকে পড়লে কেউ ধরতে পারবে না। এ ছাড়া আমার বাঁচবার আর কোনও উপায় নেই নমিতা! আমাকেও তা হলে খাদে ঝাঁপ দিতে হবে।
